আয়ুষ্মান চক্রবর্তী ও সানি সরকার, আলিপুরদুয়ার ও শিলিগুড়ি: আপনি হা লং বে চেনেন? বা হ্যানয়? সিঙ্গাপুরে গিয়েছেন? কিংবা সুইৎজারল্যান্ড? আচ্ছা আপনি কি শিলিগুড়ির বাসিন্দা তাপস দাসকে চেনেন? বা আলিপুরদুয়ার শহরের রিম্পা সরকারকে? এই তাপস আর রিম্পারাই এবার পুজোয় ঘুরতে যাচ্ছেন সিঙ্গাপুর, সুইৎজারল্যান্ড, হ্যানয়ের মতো জায়গায় (Foreign Trip)। দি-পু-দা। পুজোর ছুটি মানেই দিঘা, পুরী আর দার্জিলিংয়ের বাঁধাধরা গন্তব্য এখন অতীত। টুক করে একবার ট্যাঁকের জোর পরখ করে নিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি এখন ভ্রমণেও গ্লোবাল।
দক্ষিণবঙ্গের লোকজন যে উত্তরবঙ্গে বেড়াতে আসতে পছন্দ করেন, তা তো পুজোর সময় উত্তরবঙ্গগামী টিকিটের হাহাকার দেখলেই স্পষ্ট। আর উত্তরবঙ্গের লোকজন তাহলে কোথায় ঘুরতে যান? আলিপুরদুয়ার, শিলিগুড়ি সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার ট্যুর অপারেটরদের থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কেউ যাচ্ছেন ইউরোপ ট্যুরে, কেউ বা অস্ট্রেলিয়ায়। আর মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ব্যাংকক তো এখন নাকি জলভাত।


শিলিগুড়ির তাপস স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে এবার পুজোয় বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। সাত রাত আটদিনের সফরের প্রথম চারদিন থাকবেন সিঙ্গাপুর। পরবর্তী দিনগুলিতে মালয়েশিয়া। তাঁর বক্তব্য, ‘একসময় বিদেশে যাওয়া ছিল কল্পনাতীত। ভিসা, পাসপোর্টের সমস্যাও ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন সংস্থার প্যাকেজ ট্যুরের জন্য বিদেশও ঘরের কাছে মনে হচ্ছে।’
এই কথাই বলছেন ট্যুর অপারেটররাও। তাঁরা বলছেন, মূলত দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে তেমন বেশি খরচও হচ্ছে না। আলিপুরদুয়ারের ট্যুর অপারেটর দেবজ্যোতি সরকার থেকে শুরু করে চিরঞ্জিত মজুমদার, সকলেরই এক কথা। এখন মধ্যবিত্ত বাঙালির মধ্যেও বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহ অনেক বেড়েছে। চিরঞ্জিত বললেন, ‘আলিপুরদুয়ার তো বটেই, আমাদের কাছে আশপাশের জেলা থেকেও অনেকেই এসেছেন বিদেশযাত্রার ইচ্ছা নিয়ে।’
পুজো আসার বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই তাই প্লেনের টিকিট, পাসপোর্ট, ভিসা সংক্রান্ত নানা কথা লোকজন জানতে ভিড় করেছেন ট্যুর অপারেটরদের কাছে। আর পর্যটন ব্যবসায়ীরাও বলছেন, এবছর যেন বিদেশ যাত্রার ঝোঁকটা অন্যান্যবারের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে চাহিদা বেশি ইউরোপ ভ্রমণের। ইতালি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি থেকে শুরু করে আরও অনেক দেশ থাকছে সেই প্যাকেজ ট্যুরে। কোনও ট্রিপ ১৭ দিনের। আবার কোনও ট্রিপ ৬ থেকে ৯ দিনের। পাসপোর্ট-ভিসার ব্যয় বাদ দিয়ে এমন ভ্রমণের খরচ লাখ তিনেকের মধ্যেই।
আলিপুরদুয়ার শহরের বাসিন্দা রিম্পার যেমন দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল সুইৎজারল্যান্ড যাওয়ার। সেই স্বপ্নপূরণ হচ্ছে এবার পুজোয়। বললেন, ‘ঘুরতে খুবই ভালোবাসি। দেশের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। এবার বিদেশ পাড়ি।’ জয়ন্ত বিশ্বাস যেমন ইতিমধ্যেই মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দুবাই ঘুরে ফেলেছেন। এবার গন্তব্য ইউরোপ। আবার জয়ন্ত সুযোগ পেলেও আলিপুরদুয়ারের গোপাল গোস্বামীর দুবাই ঘোরা হয়নি। এবার তাই সেখানকার ট্যুর প্ল্যান হয়ে গিয়েছে।
মধ্যবিত্ত বাঙালি না হয় ভ্রমণের নেশায় খরচের পরোয়া করছে না। তবে এধরনের বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ায় আদৌ দেশের পর্যটনশিল্পের কি লাভ কিছু হচ্ছে?
উত্তরের পরিচিত পর্যটন ব্যবসায়ী, হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলছিলেন, ‘ইনবাউন্ড ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে রাজস্বের পুরো অংশে সংশ্লিষ্ট জায়গায় থেকে যায়। কিন্তু আউটবাউন্ড ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে তা ঘটে না।’ তবে তিনি এটা মানছেন যে পর্যটনের স্বার্থে বিদেশ সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্যে দিয়েই ক্রস বর্ডার ট্যুরিজমের প্রসার ঘটে।

