শিবশংকর সূত্রধর ও বিশ্বজিৎ সাহা, মাথাভাঙ্গা: কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‘নদীর এ-কূল ভাঙ্গে ও-কূল গড়ে’। মাথাভাঙ্গায় (Mathabhanga) ভাঙা গড়ার গল্পটি অবশ্য অন্যরকম। মানসাই, ডুডুয়া, মুজনাইয়ের তীরের বাসিন্দাদের বড় আক্ষেপ। তাঁদের কাছে শুধুই ভাঙার খেলা। গড়ার খেলা আর কই? বড় শৌলমারির এক বৃদ্ধ মুজনাইয়ের তীরে বসে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘কৃষিজমি, বাড়িঘর সবই নদীগর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। নেতারা এসেছেন। বারবার বাঁধ তৈরির আশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন। নদী ভেঙেছে, কিন্তু বাঁধ আর গড়া হয়নি।’
ভোট আসছে। মাথাভাঙ্গার বাতাসে কুয়াশার উপর ভর করে এখন ভোটের গন্ধ ঘুরে বেরাচ্ছে। দেওয়াল লিখনে পদ্মের অবয়ব স্পষ্ট। খুলি বৈঠকে ঘাসফুল শিবির মানুষের মন বুঝতে চাইছে। নেতারা কোমর বেঁধে নেমেছেন দলীয় কাজে। শাসক-বিরোধীদের ভোটের গেরোয় চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের দাবির কথা।
মাথাভাঙ্গা শহর, মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের হাজরাহাট-১, হাজরাহাট-২, পচাগড় ও মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা নিয়ে মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্রটি গঠিত। শাসকদলের দখলে থাকা এই কেন্দ্রটি গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির সুশীল বর্মন ছিনিয়ে নেন। ২০১১ সাল থেকে পরপর দু’বার এই কেন্দ্র থেকে ভোটে জিতেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিনয়কৃষ্ণ বর্মন। ২০১৩ সালে থেকে তিনি বনমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলিয়েছেন। এলাকায় তাঁর ভালো প্রভাব থাকলেও ২০২১ সালের নির্বাচনে দলের একাংশের ‘কলকাঠিতে’ তাঁকে মাথাভাঙ্গার পরিবর্তে কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের টিকিট দেওয়া হয়। ফলে যা হওয়ার তাই-ই হয়। মাথাভাঙ্গা ও কোচবিহার উত্তর, দুটি কেন্দ্রেই ভরাডুবি হয় ঘাসফুলের। আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে নতুন করে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন বিনয়রা। তিনি মাথাভাঙ্গা থেকে টিকিট পাওয়ার দাবিদারের মধ্যে অন্যতম। আবার তৃণমূলের জেলার চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন গত নির্বাচনে মাথাভাঙ্গা থেকে লড়েছিলেন। এছাড়াও মাথাভাঙ্গায় সাবলু বর্মন, কমলেশ বর্মন, স্বপন বর্মন, বিশ্বজিৎ রায়দের অনেকেই নিজেদের মতো করে ঘুঁটি সাজাচ্ছেন। তৃণমূলের অন্দরে একটি কথা বেশ শোনা যায়। ‘এই দলে সবাই নেতা।’ মাথাভাঙ্গা ঘুরলে প্রবাদটি সত্যতা পাওয়া যায়। বিধানসভা এলাকাজুড়ে তৃণমূলের নেতার অভাব নেই। স্বাভাবিকভাবেই গোষ্ঠীকোন্দলের চোরাস্রোত থেকেই যায়। যা তৃণমূলের কাছে বড্ড অস্বস্তির।
কোচবিহার (Cooch Behar) জেলায় যে এলাকাগুলিতে বিজেপির ঘাঁটি শক্ত বলে পরিচিত সেগুলির মধ্যে অন্যতম মাথাভাঙ্গা। এখানে ২৭৬টি বুথ রয়েছে। প্রতিটিতেই বুথ কমিটি সক্রিয় বলে পদ্মশিবিরের দাবি। গত বিধানসভা ভোটে মাথাভাঙ্গা-২ ব্লকের ১০টির মধ্যে ছয়টি গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নেয় বিজেপি। যদিও শেষ পর্যন্ত বড় শৌলমারি বাদ দিয়ে বাকিগুলি ধরে রাখতে পারেনি। সেগুলি তৃণমূলের দখলে যায়। পঞ্চায়েত সমিতির ৩০টি আসনের মধ্যে ১৩টি বিজেপির দখলে গিয়েছিল। ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটে জেলাজুড়ে পদ্ম চাষ বেহাল হলেও মাথাভাঙ্গায় তারা একচেটিয়াভাবে ভালো ফল করেছিল।
এলাকায় ঘুরলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়, বিজেপির বড় অংশের ভোট ব্যাংক থাকলেও সাংগঠনিক দুর্বলতাই এখানে বড় সমস্যা। বিজেপির বড় কোনও আন্দোলন নেই। বিধায়ক সুশীল বর্মনও উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ করতে পারেননি। ফলে নির্বাচনের আগে ভোট ব্যাংককে চাঙ্গা করতে হিমসিম খেতে হতে পারে পদ্মশিবিরকে।
গত পাঁচ বছরের মধ্যে নিশিগঞ্জ-২ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় শালটিয়া নদীর উপর ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে জয়েস্ট ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। প্রেমেরডাঙ্গার ঝাউগুড়িতে বগা মইশালের ঘাটে জয়েস্ট ব্রিজ হয়েছে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে। ঘোকসাডাঙ্গা কলেজে এক কোটি টাকা ব্যয়ে অডিটোরিয়াম তৈরি করা হয়।
নিশিগঞ্জ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে ৩০ বেডের গ্রামীণ হাসপাতালে উন্নীত করা হয়েছে। তবুও মাথাভাঙ্গায় অনুন্নয়নের ছোঁয়া স্পষ্ট। ফুলবাড়ি ও গিলাডাঙ্গার মাঝে মানসাই নদীতে তপসিতলা ঘাটে সেতু তৈরির দাবি বহুদিনের। মাথাভাঙ্গা শহরের সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার সংযোগকারী এই জায়গায় এখনও সেতু তৈরি করতে পারল না কেউ। শাসকদলের নেতা-মন্ত্রী, পদ্মশিবিরের বিধায়কও ব্যর্থ। মধুপুর ও প্রেমেরডাঙ্গার মাঝে তোর্ষায় সেতু তৈরি হলে মাথাভাঙ্গার সঙ্গে কোচবিহার শহরের দূরত্ব অন্তত ১৩ কিলোমিটার কমে যাবে। মাথাভাঙ্গা থেকে ফুলবাড়িতে যাওয়ার পথে ডুডুয়া নদীর উপরেও সেতুর দাবি রয়েছে। মাথাভাঙ্গা বাজারের অবস্থাও শোচনীয়। এগুলি নিয়ে মাথাব্যথা নেই নেতাদের। নিশিগঞ্জ কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়া এলাকার একটি বড় ইস্যু। যা ব্যাকফুটে ফেলেছে শাসকদলকে। এই এলাকায় প্রচুর বড় নদী থাকায় ভাঙনের সমস্যায় ভুগতে হয় বাসিন্দাদের। কিন্তু পর্যাপ্ত বাঁধের দেখা নেই।
কোচবিহারের মাটিতে বিমান নামা প্রায় বন্ধই। তবে নির্বাচনের আগে হেলিকপ্টারের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। হেলিকপ্টারের পাখার ঝাপটায় অনেক খড়-কুটো উড়ে যেতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে ভেসে যায় নিশিগঞ্জ কলেজ, মুজনাইয়ের বাঁধ, ডুডুয়ার সেতু তৈরির দাবিও। ভোট আসছে। আবার হয়তো নেতাদের কাছ থেকে ভূরিভূরি আশ্বাস মিলবে। কিন্তু সেই আশ্বাসের সমাধান কোথায় তা কে জানে!

