অনুপ সাহা, ওদলাবাড়ি: বন দপ্তরের তারঘেরা চেকপোস্ট থেকে পূর্বদিকে ঘন জঙ্গলের বুক চিরে চলে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনায় নির্মিত পিচঢালা রাস্তাটি। ওদলাবাড়ি থেকে ক্রান্তিগামী পূর্ত সড়ক ছেড়ে বাঁ দিকের সেই রাস্তা ধরে, জঙ্গলের মাঝবরাবর গা ছমছমে ও প্রায় জনহীন আরেকটি রাস্তা ধরে, পাঁচ কিলোমিটার এগোতেই চারদিকে জঙ্গলঘেরা একটি ছোট জনপদ ‘মেচবস্তি’ যাওয়া যাবে (Mechbasti)।
একটা সময় শুধুমাত্র মেচ জনজাতির মানুষ এই গ্রামে বাস করতেন বলে নাম হয় মেচবস্তি। এখন অবশ্য মেচদের পাশাপাশি আদিবাসী ও নেপালিরাও এখানে বসবাস করতে শুরু করেছেন।


ওদলাবাড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের এই বনগ্রামে এখনও তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে। রাতের অন্ধকার যেন পেরোতেই চায় না! মেচবস্তির একটি ছোট মুদি দোকানে বসে কথাগুলো বলছিলেন উত্তম শৈব। উত্তমের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে গ্রামে আগন্তুককে দেখে একে একে আলোচনায় যোগ দিতে শুরু করলেন সুমিতা শৈব, রাধিকা শৈব, অনিল শৈব প্রমুখ। তাঁরা নিজেদের মধ্যে মেচ ভাষায় কথা বলছিলেন।
কথা হচ্ছে মেচবস্তি নিয়ে। উত্তম শৈবর কথায়, ‘এখানে কাছাকাছি লোকালয় বলতে একদিকে ওদলাবাড়ি, অন্যদিকে রাজাডাঙ্গা। দুটোর মধ্যে একটু কাছে ১২ কিলোমিটার দূরত্বের ওদলাবাড়ি। তারঘেরা চেকপোস্টে নেমে সাইকেল, টোটো অথবা বাইক চালিয়ে নির্জন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। পথে সবসময়ই বিপদের হাতছানি রয়েছে।’
তবে হাতি, চিতাবাঘের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা এখনও হয়নি রাধিকার। কিন্তু বাবা-মা’র মুখে শুনেছে যে, কাছের জঙ্গলে হাতি, চিতাবাঘ রয়েছে। তা সত্ত্বেও দিব্যি হাসতে হাসতেই ওদলাবাড়ির সুনীল দত্ত স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ট শ্রেণির ছাত্রী রাধিকা শৈব বলে ওঠে, ‘দূরত্ব ও বিপদের আশঙ্কায় প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া হয় না। যেদিন যাই, স্কুল শেষে কত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরব সেই চিন্তাই মাথায় ঘুরতে থাকে।’
প্রায় ১৫০টি পরিবারের বসবাস মেচবস্তিতে। রয়েছে একটিমাত্র প্রাথমিক স্কুল। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয় এখানে। মোট ভোটার রয়েছেন ৭৫০ জন। গ্রাম পঞ্চায়েত আসন তৃণমূলের দখলে। পঞ্চায়েত সদস্য সুমন শৈব’র চেষ্টায় গ্রামে বেশ কিছু সোলার লাইট লাগানো হয়েছে। বাড়ি বাড়ি বিদ্যুৎ পরিষেবাও রয়েছে। শুধু বিক্ষিপ্ত কিছু জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তবে পানীয় জলের জন্য এখনও গভীর নলকূপের ওপর ভরসা করতে হয় গ্রামবাসীকে। স্বাভাবিকভাবেই গ্রামে জলছত্র প্রকল্পের এটিএম বসানোর দাবির কথা শোনালেন স্থানীয় বধূ সুমিতা শৈব।
গ্রামের মানুষের জীবিকা মূলত কৃষিকাজ। এর পাশাপাশি বন দপ্তরের বিভিন্ন ঠিকাকাজ এবং ইদানীং গড়ে ওঠা ছোট চা বাগানে কাজ করেও সংসার প্রতিপালন করেন স্থানীয়রা। কাজের শেষে সন্ধ্যার পর জরুরি কাজ ছাড়া বাড়ির বাইরে খুব একটা বেরোন না কেউ। ওদলাবাড়ি যাতায়াত করতে হলে বন দপ্তরের মেচবস্তি বিট অফিসের সহযোগিতা জরুরি হয়ে পড়ে।
কথা বলতে বলতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। এরপর বিকেল হতেই স্কুল ছাত্রী রাধিকা শৈবর কথা মাথায় এল। অতএব, আপাতত মেচবস্তিকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফেরার পালা।

