পুরোনো ডায়েরি
রাজু রায়
চারিদিকের ফাঁকা মাঠে রবিশস্যের নরম কোমল সবুজ গালিচা বিছিয়ে আছে। দিকচক্রবালরেখা এখন আর দেখা যায় না। একটা পাণ্ডুর সাদা রঙে আকাশপাতাল মিলিয়ে আছে। নদীর বুকে ফুটে উঠেছে আঘাতের ক্ষতচিহ্ন। শুকিয়ে যাওয়া খানাখন্দ থেকে শাপলার কন্দমূল উপড়ে ছিঁড়ে পাগলিবুড়ি খোরাকির আয়োজনে ব্যস্ত। ঝোপঝাড়ে কিছু ঢোল কলমি, ভুরভুসি ফুলের ঝাড় চোখে পড়ে। তবে গাছপালার ধূসর চেহারা ও মরা পাতার মাঝে সেসব ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে।
ছেলেটি গায়ে সোয়েটারের ওপর সুতোর কারুকাজ করা শাল জড়িয়ে বারান্দায় ইজিচেয়ার পেতে রোদের অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ কী মনে হতে ঘরে ঢুকে পুরোনো তোরঙ্গ বের করে জংধরা পাল্লাটা মেলে ধরল। ঘেঁটেঘুঁটে টেনে বের করল সুতোয় বাঁধা একটা পুরোনো ডায়েরি। মলাট ছিঁড়লেও বাকিটা অক্ষত। ডায়েরি নিয়ে দেশলাই হাতে ঘরের পিছনের শিউলি গাছের তলায় বসল। প্রথম পাঁচ পাতায় ছিল আঁকাবাঁকা বানান ভুলে ভরা অক্ষরে জ্যাঠতুতো দাদার লজেনচুস দিয়ে চোখের ইঙ্গিতের কথা। টেনে ছিঁড়ে দেশলাই জ্বালিয়ে দিল।
পরের পাঁচ পাতায় ছিল রান্নাবাটি, বরবৌ, কনেসাজা, চুল বাঁধা ইত্যাদি। পাতা ছিঁড়ে আগুন ধরিয়ে দিল। তারপর ছিল চোদ্দো বছরের স্কুলজীবন। স্যরের ব্যাড টাচ। একবার, না বহুবার সুইসাইড অ্যাটেম্পট। বন্ধুহীন একা নির্বাক চলতে শেখা। আগুনে আহুতি দিল। এর পরের একশো পাতা ছিল যৌবনের। গল্পের পরিসর বেড়েছে খানিক। তবে ওঁদের দেওয়া-নেওয়া হয়েছিল বকুলতলায়, ছাঁদনাতলায় নয়! তাই কেউ মনে রাখেনি। ছেলেটিই বা একা মনে রেখে দুঃখ পুষে রাখবে কেন! জ্বলে যাক সব। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে, ‘উফ! যা কনকনে শীত, একটু হাত গরম করে নিই এবার।’
উপসংহার
উৎপল সরকার
আলিপুরদুয়ারের এডওয়ার্ড লাইব্রেরিতে বসে অবিনাশবাবু তাঁর জীবনের শেষ লেখা গল্পের পাণ্ডুলিপির নীচে মোটা অক্ষরে লিখলেন— ‘ইতি’। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের লেখক জীবনে আজই প্রথম তার মনে হল, সবটুকুই তো বলা সাঙ্গ হল। শেষ দশ বছর ধরে একাকিত্বের এই বিষণ্ণ পৃথিবীতে চলতে চলতে বৃদ্ধের মনে হচ্ছিল, জীবনের সব সার্থকতা বোধহয় এখানেই থমকে গেল।
লাইব্রেরি থেকে বেরোনোর সময় ফুটপাথে কাল্টুকে দেখতে পেলেন। এই পৃথিবীতে কাল্টু একদম একা। অনাথ এই ছেলেটিকে বেশ কয়েকবছর আগে অবিনাশবাবু একটি সরকারি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। ছেলেটি ছেঁড়া কাগজে আপনমনে কলম দিয়ে আঁকিবুকি করার চেষ্টা করছিল। অবিনাশবাবুকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘দাদু, আমার খাতাটা শেষ, তুমি কি শেষ পাতায় কিছু লিখে দেবে?’
অবিনাশবাবুও হেসে ফেললেন। সাইড ব্যাগ থেকে একটা নতুন ডায়েরি বের করলেন। কাল্টুর হাতে দেওয়ার আগে নতুন ডায়েরিতে লিখে দিলেন, ‘স্বপ্ন দেখার নতুন শুরু।’ হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করলেন, একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি মানেই সব সমাপ্ত নয়, বরং অন্য কোনও সম্ভাবনার উন্মোচন। তিনি বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে খুব হালকা ভলিউমে একটা রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে বসলেন। ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপিটা পরম মমতায় বের করলেন। সদ্যোজাতকে বাবা ঠিক যেমনভাবে প্রথম কোলে নেয়, ঠিক সেভাবেই ওটা টেবিলে রাখলেন। নিজের পাণ্ডুলিপি থেকে ‘ইতি’ শব্দটি মুছে দিয়ে নতুন করে কলম ধরলেন। লিখলেন, ‘আবারও হোক শুরু।’

