অযোগ্য
সুদীপ্তা বন্দ্যোপাধ্যায়
হেডস্যর ফোন করে জানালেন, কোর্টের নিদানে অযোগ্যের তালিকায় নাম রয়েছে সৌম্যর।
ফিজিক্সে মাস্টার্স মেধাবী সৌম্য, মেধার জোরেই চাকরিটা পেয়েছিল। পেশায় সিকিউরিটি-গার্ড ওর বাবার পক্ষে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটানোই মুশকিল সেখানে ঘুষ দেওয়া! অসম্ভব।
তবুও আশপাশের মানুষজনের সন্দেহের দৃষ্টি প্রচ্ছন্ন থেকে ক্রমশ প্রকট। সবচেয়ে অসহায় লাগে, যখন ছোট ছোট ছাত্র প্রশ্ন করে, স্যর তুমি কি অযোগ্য? মিডিয়ার কল্যাণে এখন সব খবরই সর্বজনবিদিত।
সৌম্যর এখন অনেকগুলো জরুরি কাজ বাকি।
কুহেলিকে বলতে হবে, ওর জন্য অপেক্ষা না করে এনআরআই সম্বন্ধটায় যেন হ্যাঁ বলে দেয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে বিড়ম্বনায় ফেলবে না ওকে।
গত মাসে অকালবৃদ্ধ বাবাকে বলেছিল কাজটা ছেড়ে দিতে। কথাটা ফিরিয়ে নিয়ে বলতে হবে, ‘তুমি অন্তত চাকরিটা ছেড়ো না। যত কষ্টই হোক না কেন। নইলে যে খাওয়া জুটবে না।
বাতের ব্যথায় ক্লিষ্ট মায়ের সেলাই মেশিন আবার সচল হোক। সংসারের সুরাহা হবে কিছু। বোনের বিয়েটা আপাতত পিছিয়ে দেওয়াই ভালো। বোন যেমন টিউশন করছিল করুক।
বাইরে কালবৈশাখীর তাণ্ডব চলছে, ঝড়ের দাপটে বড় গাছটি আছড়ে পড়ল, অথচ ওর তো শ্রান্ত পথিককে আশ্রয় দেওয়ার কথা ছিল।
ভূলুণ্ঠিত গাছটির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে সর্বহারা সৌম্য।
কবি সম্মেলন
সুকুমার সরকার
অনেকদিন পর কবি সম্মেলনে এসেছি। যৌবনের কিছু কবিতা পকেটে উঁকিঝুঁকি মারছে। শ্যামলকান্তি চেহারার একজন সম্পাদক-কবি বললেন, এতদিন পরে কেন?
আমি বললাম, আমাদের ওখানে নদীগুলো সব দূষণে মরে যাচ্ছে!
তিনি ব্যঙ্গ করে বললেন, আপনি কি দূষণের নদীগুলোকে পকেটে করে এনেছেন?
আমি বললাম না, সম্মেলনে দু’-একটি কবিতা পড়তাম।
খাতায় কিছু একটা লিখছিলেন তিনি। মুখ না তুলেই বললেন, আমন্ত্রিত, না এমনি এসেছেন?
আমি বললাম, না, আমন্ত্রিত না। এমনি এসেছি।
তিনি বললেন, ঠিক আছে, পনেরোশো টাকা দিন। আর এখানে নাম, ঠিকানা লিখুন। পাঁচশো টাকা এন্ট্রি ফি। হাজার টাকা টিফিন, লাঞ্চ ও অন্যান্য। বুঝলেন? আর হ্যাঁ, কবিতা কিন্তু একটিই পড়তে পারবেন। আপনার মতো অনেক কবি আছেন। মঞ্চে উঠে বলবেন না আরেকটা কবিতা পড়ি।
তাঁর কথা শুনে আমার ভেতরের কবিসত্তার অবস্থাও তখন আমার গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দূষণের নদীর মতো। কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। রাগে, অপমানে কানদুটো গরম হয়ে উঠেছে। পকেটে থাকা দূষণের কবিতাগুলি ঘামের নদী হয়ে শরীর বেয়ে নীচের দিকে নামছে। আমি দ্রুত সম্মেলনের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে আসতেই শুনতে পেলাম কাকের কর্কশ আওয়াজ। কবিতার কোনও ললিত বাণী কানে এল না!



