অণুগল্প

শেষ আপডেট:

উপহার

শংকর সাহা

সেদিন বিকেলে বইয়ের শেলফ পরিষ্কার করতে করতে হঠাৎ নীলাম্ভরীর নজরে পড়ল সুন্দর করে মলাটে মোড়ানো একটি বই। বইটি হাতে নিয়ে মলাট খুলে দেখল এ তো সেই রবি ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’ যা একসময় তাঁর বাবা উপহার দিয়েছিলেন। বহুদিন বাদে হাতে বইটি পেয়ে যেন নীলাম্ভরীর পুরোনো সেই সব দিনের কথা মনে পড়ে যায়।

গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের মাস্টারমশাই ছিলেন মন্মথবাবু। নীলাম্ভরী তাঁর একমাত্র মেয়ে। মেয়েকে নিজেরই আদর্শে বড় করে তুলেছিলেন তিনি। মেয়েকে বলতেন, জীবনে বইকে যেন সারাজীবনের সঙ্গী করে রাখে সে। বাবার কথাগুলো আজ নীলাম্ভরীর খুব মনে পড়ে।

এদিকে, বিয়ের পরের পৃথিবী সম্পূর্ণ যেন অচেনা লাগে নীলাম্ভরীর। কেউ যেন তাঁর মূল্যবোধ ও ইচ্ছে নিয়ে ভাবে না। বিয়ের তিনদিন পর থেকে রান্নাঘর তাঁর একমাত্র ঠিকানা হয়ে উঠেছে। শাশুড়ির কথা, মেয়েদের অত বিদ্যে নিয়ে কী হবে! নীলাম্ভরীর বই পড়ার ইচ্ছে সকলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনও এক অতলে হারিয়ে গিয়েছে।

অথচ এই নীলাম্ভরী কলেজে বোটানি ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার পর তাঁকে ‘গল্পগুচ্ছ’ কিনে দেন বাবা। বরাবর টিফিনের পয়সা জমিয়ে বইমেলায় বই কিনত সে। আজ সবটাই শুধু স্মৃতি। বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বাবার কথাগুলো খুব মনে পড়ছে নীলাম্ভরীর। বাবা বলতেন, রবি ঠাকুরের লেখা জীবনের কথা বলে। কখনও কষ্ট পেলে এই গল্পগুলোই বাঁচার প্রেরণা জোগায়। নীলাম্ভরীর দু’চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। জানলা দিয়ে বাইরে প্রকৃতির দিকে চেয়ে থাকে সে। চেনা জগৎ তাঁর কাছে স্বার্থপর মনে হয়।

 

প্রত্যাবর্তন

অঞ্জনা ভট্টাচার্য

অনেকদিন বাদে গ্রামে ফিরেছে মরিয়ম বিবি। সে যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে, সেবার গ্রামে আকাল হয়েছিল। খুব খরা। চারদিক শুখা। আবাদ হয়নি। এদিকে ওরা সাত ভাইবোন। বাবার ধার চরমে। এক বেলা ভাত জোগাড় করা যাচ্ছিল না। খিদের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে কত মানুষ তখন পুকুরে, কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে তার হিসেব নেই। মরিয়ম খিদের জ্বালা সহ্য করতে পারত না। দিনে খেলে রাতে উপোস। তা-ও মেটে আলু আর সেদ্ধ ভাতে।

এই সময় তহেকৎ আলি দিল্লি থেকে ওদের গ্রামে আসে। গ্রামের করুণ অবস্থা দেখে নিজের উদ্যোগে লঙ্গরখানা চালু করে। তিনবেলা পাত পেড়ে খাবারের ব্যবস্থা। মরিয়মরাও আসত খেতে। ফর্সা রং, গোলাপি ঠোঁট আর মিষ্টি চেহারার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে তহেকৎ মরিয়মকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। যত্নের প্রতিশ্রুতি দিতে ভোলে না। নগদ টাকা দেয় মরিয়মের বাবাকে। পঁয়তাল্লিশ বছরের তহেকৎ আলির বিবি হয়ে দিল্লিবাসী হয় মরিয়ম। আরও দুটো বৌ ছিল তহেকতের। কিছুই যায় আসেনি মরিয়মের। খিদের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল সব। নিজের বয়সি ছেলেমেয়েদের ‘ছোট মা’ হয়ে ওদের সঙ্গে খেলতে খেলতে একদিন নিজে মা হয়েছে।

আজ প্রায় আটাত্তর বছর পর নাতির হাত ধরে গ্রামে ফিরে এসেছে। কীসের টানে কে জানে! হয়তো ছোটবেলার খিদের যন্ত্রণা আজও পিছু ছাড়েনি মরিয়মের।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

উত্তরের কবিমুখ

শিশির রায়নাথ কবিতা লেখা তাঁর শখ, অন্য আরও দশটা...

অণুগল্প

ডাকনাম তন্ময় কবিরাজ বিশাল বাড়ি। বাসিন্দা একজন। সুবিমল। চাকরি ছেড়ে সম্পত্তি...

কবির দাড়ি অথবা দাড়ির কবি

সুতপা সাহা সুকুমার রায় লিখেছিলেন, ‘গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, গোঁফ...

রবিকিরণ

নস্টালজিয়া পেরিয়ে ওটিটি’র রহস্যময় কবিগুরু গ্রন্থন সেনগুপ্ত তখন আমার বয়স বড়জোর...