শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা: কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে আগামী অগাস্টে ১০০ দিনের কাজ ফের চালু হওয়ার কথা। যদিও ডুয়ার্স থেকে দলে দলে ভিনরাজ্যে চলে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের এতে এখন আর আগ্রহ নেই। তাঁদের অনেকেই ফিরতে চান না বলে সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন (Tea Garden Workers)। এর কারণ হিসেবে উঠে আসছে কেরল, মহারাষ্ট্র বা কর্ণাটকে তাঁদের বর্তমান কাজে বেশি আয়ের পাশাপাশি স্থিতাবস্থা না ভাঙার বিষয়টি।
যেমন লুকসান চা বাগানের ফ্যাক্টরি লাইনের রবিন ওরাওঁ। সিকিমের লোনাক লেক বিপর্যয়ের পর তিনি লাচুং থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে বাড়ি ফিরে আসেন। সপ্তাহখানেক হল ফের নিজের বোনজামাই আরইয়ান ওরাওঁকে সঙ্গী করে আবার পাড়ি দিয়েছেন ভিনরাজ্যে। বেঙ্গালুরুতে নির্মাণকাজ জুটিয়ে নিয়েছেন ওই দুজন। রবীন বলছেন, ‘১০০ দিনের কাজে যা মজুরি তার থেকে অন্তত আড়াই গুণ বেশি মিলছে এখানকার কাজে। তাই ফিরে গিয়ে লাভ নেই।’ লুকসানেরই ভুট্টাবাড়ি বস্তির দুর্গা ছেত্রী নামে এক বাসিন্দা সপরিবারে বেঙ্গালুরুতে আছেন। তিনি একটি ওষুধ কোম্পানিতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন। দুর্গার স্ত্রী জুনাও কাপড় মিলের কর্মী। বর্তমানে বাড়িতে ননদ অসুস্থ থাকায় তিনি লুকসানের বাড়িতে এসেছেন। ওই মহিলা বলছেন, ‘ফের ওখানেই ফিরে যাব। স্বামীর পাশাপাশি দুই মেয়েও কাজ জুটিয়ে নিয়েছে। ১০০ দিনের কাজ করে আর কত মিলবে। বরঞ্চ বেঙ্গালুরু থেকে চলে এলে সবকিছু হারাব।’


বানারহাটের রুগ্ন দেবপাড়া চা বাগানের গুদাম লাইনের জিতেন নায়েক নামে এক তরুণ গুজরাটের জামনগরে একটি বেসরকারি নামী কোম্পানিতে ক্লিনারের কাজ করেন। থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব ওই সংস্থারই। ফলে মাসে ১৫ হাজার টাকা উপার্জনের কিছু নিজের জন্য রেখে বেশিরভাগটাই বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে পারছেন। ওই তরুণ বলেন, ‘আগে ১০০ দিনের কাজ করেছি। মজুরি পেতে দেরি হয়। ততদিন দারুণ সমস্যার মধ্যে দিন কাটে। বরঞ্চ এখানকার উপার্জনে আমার নিজের ও সেইসঙ্গে বাগানে থাকা পরিবারের খরচ নির্বিঘ্নেই উঠে যাচ্ছে। তাই ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।’
কেন্দ্রের ভারী শিল্পমন্ত্রকের অধীনস্থ অ্যান্ড্রিউ ইউল কোম্পানির টি ডিভিশনের বানারহাট ব্লকে ৪টি চা বাগান রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিটিতে মজুরি-বেতন অনিয়মিত। ফলে বহু বাসিন্দা ভিনরাজ্যে চলে গিয়েছেন। এমনই একটি বাগান নিউ ডুয়ার্স-এর রিমিস লাকড়া, অশোক তিরকি, সুশীল মিঞ্জরা কেরলের তিরুবনন্তপুরমে কেউ হোটেল-রেস্তোরাঁতে ডেলিভারি বয় আবার কেউ রান্নার শেফ-এর কাজ করছেন। শুধু নিউ ডুয়ার্স থেকেই ১০০-র বেশি তরুণ এখন তিরুবনন্তপুরমে রয়েছেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন। রিমিস বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, বাড়ির লোকেদের চিকিৎসা, আত্মীয়তা, লৌকিকতা, খাই খরচ এসব ১০০ দিনের কাজের আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। তাই ফিরে গিয়ে লাভ নেই। সেক্ষেত্রে এখানকার কাজ হারাব।’ কৃষি অধ্যুষিত আংরাভাসা দুই নম্বর পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান মাম্পি রায়ের দেওর সঞ্জিত বর্মন বর্তমানে মহারাষ্ট্রে। কাজ করছেন উড়ালপুলের নির্মাণকর্মী হিসেবে। তিনি অবশ্য বলেন, ‘গ্রাম থেকে ১০০ দিনের কাজ চালু হতে চলার খবর আসছে। অনেকেই চলে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন। দেখা যাক কী হয়।’
কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়নমন্ত্রক চলতি বছরের ২৭ মার্চ যে গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে তাতে এরাজ্যের ক্ষেত্রে অদক্ষ শ্রমিকদের (আনস্কিলড ম্যানুয়াল) জন্য ১০০ দিনের কাজের মজুরি ধার্য করা হয়েছে ২৬০ টাকা। এখানে যখন ওই কাজ বন্ধ হয়ে যায় তখন মজুরি ছিল ২২৩ টাকা। ফলে দিনে ৬০০-৯০০ টাকার লক্ষ্মীলাভ ছেড়ে কেন তাঁরা আসবেন এই প্রশ্ন যে সংগত, মানছেন সমাজকর্মীরাও। ডুয়ার্স জাগরণ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্ণধার ভিক্টর বসু বলেন, ‘ভিনরাজ্যের বেশি মজুরির কাজ ছেড়ে ১০০ দিনের কাছে ঢুকলে যে আর্থিক লাভ হবেন না সেকথা সবাই জানেন। যাঁরা এখনও বাইরে যাননি তাঁদের হয়তো আটকানো যাবে। ১০০ দিনের কাজের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি। ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনও বড় হাতিয়ার হতে পারে।’

