করোনাকালের ছবি ফিরছে। দলে দলে ভোট দিতে আসছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। বাসের মাথায় চেপে, কেউ দামি গাড়ি ভাড়া করে। প্রত্যেকের মনে ভয়। যদি নাম বাদ যায়। যাঁরা এখানে থেকেও ভোট দেননি, তাঁরাও এবার দাঁড়াবেন লাইনে। ফলে ভোটের হার বাড়তে পারে উত্তরে।
দীপ সাহা


মোথাবাড়ি (Mothabari) জামে মসজিদের পাশে গুমটি মতো চায়ের দোকান। বাইরে কয়লার আঁচে দুধ জ্বাল দিতে ব্যস্ত দোকানি। ভেতরে তখন বেঞ্চির ওপর পায়ে পা তুলে ভোট-আড্ডায় জনা পাঁচেক তরুণ।
-ধুর শালা। আর ভোট দিব্যার মনই করে না। গ্যালা বার তো ভোটই দিইনি।
-অ্যাবার আর ই ভুল করিস না। ভোট না দিলে নাম কাটি দিবেক।
-(পাশ থেকে আরেক তরুণ) ঠিকই কউছে। কামকাজ ছাড়ি দিয়া ভোটটা অন্তত দিস।
কথার পিঠে কথায় গমগম করছে গোটা গুমটি। অচেনা আগন্তুকের মতো ওই আড্ডায় ঢুকে পড়তেই ছন্দপতন। প্রত্যেকেই কেমন যেন চুপটি মেরে গেলেন।
-এবার ভোট না দিলে খুব সমস্যা, না? সহসা প্রশ্নে ঘাড় নাড়লেন দুজন। বাকিরা পরিবেশটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
দিন কুড়ি আগের কথা। এই চায়ের দোকান থেকে ১০০ মিটার দূরে কালিয়াচক বিডিও অফিসে আটকে রাখা হয়েছিল বিচারকদের। এসআইআর-এ নাম বাদ পড়ায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল মোথাবাড়ি। নামীদামি সব কাগজ, টেলিভিশন জেনে গিয়েছিল মোথাবাড়ির নাম। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত। কিন্তু ঘরে ঘরে চাপা উদ্বেগ তো আছেই। অধিকাংশ বাড়িতেই একজন, দুজনের করে নাম বাদ পড়েছে। কারও বাবার নামে সামান্য অমিল, কারও বা পদবিতে দু’জায়গায় দু’রকম বানান। ফলে তাঁদের ভোটাধিকার এখন বিচারের দরজায়। পরিবারের বাকিরা অবশ্য ঝুঁকি নিতে নারাজ। তাই এবার ভোট দিতে লাইনে দাঁড়াবেন সক্কাল সক্কাল।
পঞ্চানন্দপুরে মণিরুজ্জামানের বাড়ি। বাবা বসিরুদ্দিন শেখ ছাড়াও বাড়িতে আছেন স্ত্রী ও এক ভাই। বাবার নামে গণ্ডগোল থাকায় ভাই এসআইআর তালিকায় বিচারাধীন। স্ত্রীরও তাই। পাঁচ পুরুষ ধরে নাকি এখানেই বাস মণিরুজ্জামানদের। কিন্তু এবার ভোট না দিলে ভাইয়ের মতো তাঁদেরও নাম বাদ পড়ে যেতে পারে আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁকে।
ফেরার পথে হেমতাবাদ বাজারের কাছে চণ্ডীগড় নম্বরের একটি বিলাসবহুল গাড়ি দেখে কৌতূহল জাগল। ১৭ আসনের ওই গাড়িতে গাদাগাদি করে ফিরেছেন অন্তত ২৫ জন। প্রত্যেকেই পরিযায়ী শ্রমিক। ভোট বড় বালাই। তাই পরিবার নিয়ে ঘরে ফেরা। এতদূর থেকে গাড়ি ভাড়া করে ফেরা চাট্টিখানি কথা নয়। কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল টাকাপয়সা দিয়ে ফিরিয়েছে কি না, সেটা জানা না গেলেও ভোট না দিলে নাম কাটার ভয় যে তাঁদেরও রয়েছে তা নিশ্চিত।
মালদা স্টেশনেও (Malda Station) গত কয়েকদিনে দলে দলে নেমেছেন পরিযায়ীরা (Migrant Workers Return)। অটো, ছোট গাড়ি ভাড়া করে ফিরেছেন গ্রামে গ্রামে। দিনহাটা, ধূপগুড়ি, জলপাইগুড়ির মতো জায়গাতেও হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ঘরে ফিরেছেন, ফিরছেন। মঙ্গলবার শিলিগুড়িতেও দেখা গিয়েছে এক ছবি। বাসের মাথায়, পিছনে বাদুড়ঝোলা হয়ে তাঁরা বাড়ির পথে। কেউ রাজনৈতিক দলের সৌজন্যে, কেউ আবার নিজেদের তাগিদে। আর এই ছবি মনে করিয়ে দিচ্ছে সেই করোনাকালকে।
ভয়। ভয়। আর ভয়। মানুষের মনে এখন ভয় ছাড়া কিছু নেই। সেই করোনার মতো এসআইআর-ও এখন তাঁদের কাছে একটা আতঙ্ক।
এই গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী, কেউ জানে না। গ্রামের ছাপোষা মানুষগুলো তো নয়ই। স্থানীয় নেতারাও তাঁদের কোনও আলোর পথ দেখাতে পারছেন না। শুধু বলছেন, যাঁদের নাম রয়েছে তাঁরা যেন ভোট দেন। নইলে ‘বিপদ’ আছে।
দাড়িভিট বাজারে ভাঙাচোরা চা-মিষ্টির দোকান ভারতী পালের। শিঙাড়ার লেচিতে পুর ভরতে ভরতে বলে ওঠেন, ‘ম্যালা হিন্দুর নামও বাদ দিছে ওরা।’
-আপনাদের কারও নাম বাদ পড়েছে নাকি?
‘হ্যাঁ, গেছে তো। আমার নামটাই তো রাখে নাই’, বলে ওঠেন ভারতী। চোখেমুখে তাঁর একরাশ বিস্ময়, ভয়।
পাশ থেকে ছেলে জানালেন, বাড়িতে তাঁদের মোট ছয়জন সদস্য। কিন্তু মায়ের নাম কী কারণে বাদ পড়েছে তা তাঁদের অজানা। নাম তুলতে কোথায় যেতে হবে, কী করতে হবে তাও জানেন না তাঁরা। তরুণের কথায়, ‘প্রধান বলছে, বাকিদের ভোটটা দিতে। ভোটের পর নাকি মার নাম তুলে দেবে।’
কথায় আছে, আশায় বাঁচে চাষা। এখানে ভারতীরাও তাই। ভয়ের চাইতে তাঁদের আশাটাই বেশি। বাড়ির বাকিরা ভোট দিলে যদি তাঁর নাম ওঠে!
এসআইআর আসলে প্রত্যেকটা মানুষকে কোনও না কোনওভাবে প্রভাবিত করেছে। কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ রাগান্বিত, কেউ আতঙ্কিত, কেউ আবার আশঙ্কিত। আর এই ক্ষোভ, রাগ, আতঙ্ক, আশঙ্কা এবং আশা নিয়েই এবার ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন মানুষ।
ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভা এলাকার ভোটার রাজেশ দাস যেমন টোটো চালান। তাঁর কথায়, ‘গতবার ভোটের দিন ভোটারদের বাড়ি আর বুথে পৌঁছে দিয়েছিলাম। এই করতে গিয়ে নিজের ভোটটাই দেওয়া হয়নি। এবার আর রিস্কই নেব না। কামাই পরে, আগে ভোট।’
একুশের বিধানসভায় ২৯৪টি আসনে মোট বৈধ ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৩২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৪২৮ জন। তারমধ্যে গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হয়েছিলেন ৫ কোটি ৯৯ লক্ষ ৩৫ হাজার ৯৮৯ জন। শতাংশের হিসেবে যা ৮২.৩০। এবার এসআইআর আবহে এই ভোটের হার অনেকটাই বাড়বে বলে আশাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি।
আসলে গণতন্ত্রের উৎসবে যখন আমজনতার ঢল নামে এবং ভোটের হার প্রত্যাশার পারদ ছুঁয়ে ফেলে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর ধুকপুকানি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ইভিএমে জনমত উপচে পড়া মানেই স্পষ্ট বার্তা দেওয়া, তবে সেই বার্তার আসল অর্থ ডিকোড করাটা বেশ শক্ত। সেই অঙ্কই এখন মেলাতে চাইছেন সব প্রার্থীরা।

