শুভদীপ শর্মা, ময়নাগুড়ি: দুই যুগেরও বেশি সময় পর ‘পাজি’ ছেলেটাকে দেখে চমকে উঠছেন এলাকার মানুষজন। ঠাকুরদার ধমক খেয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া ছেলেটা এখন ৪১ বছরের তরুণ। যাঁরা চিনতে পারছেন, তাঁরাই প্রশ্ন করছেন, এতদিন কোথায় ছিলে?
ময়নাগুড়ি (Mainaguri) গ্রাম পঞ্চায়েতের বাগজান এলাকার বাসিন্দা গোসাই সরকার ও দুর্গা সরকারের বড় ছেলে প্রদীপ। গোসাই সরকার নামসংকীর্তন করে জীবিকানির্বাহ করতেন। তাঁদের দুই ছেলে প্রদীপ ও বিপ্লব। ছোটবেলায় দুষ্টুমির জন্য পাড়ায় পরিচিত প্রদীপের ডাকনাম ছিল ‘পাজি’। হঠাৎই একদিন উধাও হয়ে যান তিনি। তখন বয়স বছর পনেরো।


বাড়ি ছাড়ার পিছনে কারণটাও ছিল প্রদীপের সেই দুষ্টুমি। সেই রাতে পাড়ার পাশেই একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়ার জেদ ধরেছিলেন প্রদীপ। তাতে বাধা দেন তাঁর ঠাকুরদা জগদীশ সরকার। ঠাকুরদার কথা শুনে বন্ধুদের সঙ্গে অনুষ্ঠান দেখে আর বাড়ি ফেরেননি প্রদীপ। পকেটে প্রায় ৫০০ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যান। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনও সন্ধান পায়নি পরিবার। পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছেও খবর দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হদিস মেলেনি স্কুল পড়ুয়া ছেলেটার।
এরপর কেটে যায় দু’দশক। এরমধ্যে মারা গিয়েছেন প্রদীপের ঠাকুরদা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন মা-বাবাও। হঠাৎই মাস দেড়েক আগে এক পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ান এক তরুণ। চিনতে এক মুহূর্ত দেরি হয়নি মা দুর্গা সরকারের। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দু’দশকের জীবনসংগ্রামের গল্প শুনিয়েছেন প্রদীপ। জানিয়েছেন, বাড়ি ছাড়ার পর ট্রেনে চেপে সোজা দিল্লি চলে যান। সেখানে কয়েক মাস একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন। পরে এক পরিচিত বন্ধুর সঙ্গে কলকাতা পাড়ি দেন। সেখানেই একটি বাড়িতে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর ধরে কাজ করছিলেন। একদিন সেই বাড়িতে শোনেন এসআইআর-এর কথা। তালিকায় নাম না থাকলে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে, এমন ‘কথা’ শুনে জীবনে এই প্রথম ভয় পেয়েছিলেন। ভাবতে শুরু করেন কীভাবে নাম তুলবেন ভোটার তালিকায়। প্রদীপ নিজেই বলছেন, ‘সাত ঘাটের জল খেয়েছি তো। তাই আধার কার্ডটাও বানিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম তুলব কীভাবে? তারপর শুনলাম ভিনরাজ্যে পুলিশ ধরপাকড় করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কলকাতায় যদি তা হয়, তাহলে আমার পরিচয় কী দেব? এসব ভেবেই ফিরে এলাম।’
বাড়ি ফিরে মাসখানেক অস্বস্তি ছিল। তারপর আস্তে আস্তে বাইরে বেরোতে শুরু করেন। বাবা-মায়ের নাম আছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। সেই সূত্র ধরে ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করে ভোটার হওয়ার আবেদনও করেছেন প্রদীপ। স্থানীয় বিএলও কমল রায় বলেছেন, ‘নতুন করে ভোটার তালিকায় ওঁর নাম তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই করা হয়েছে।’
পাড়ার লোকজনের অবশ্য প্রদীপের ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে এতটুকু মাথাব্যথা নেই। স্থানীয় বাসিন্দা শিব রায় বলছেন, ‘ছোটবেলায় যে ছেলেটাকে পাড়ায় পাজি বলে ডাকতাম, সে এত বছর পর হঠাৎ করে আবার গ্রামে ফিরবে, এটা ভাবতেই পারিনি। প্রথমে তো চিনতেই পারিনি। পরে শুনে অবাক হয়েছি।’ আরেক প্রতিবেশীর কথায়, প্রায় ২৫-২৬ বছর আগে ছেলেটা হঠাৎ করে উধাও হয়ে গিয়েছিল। তখন অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল। এতদিন পরে তাকে আবার গ্রামে দেখতে পেয়ে সত্যিই ভালো লাগছে।
বাড়ি ফিরে নতুন জীবন শুরু করতে চাইছেন প্রদীপ। বলছেন আর কোনওদিন বাবা-মাকে ছেড়ে যাব না। বাবা বলছেন, ‘ছেলেকে আর কোনওদিন দেখব বলে ভাবিনি। এত বছর পর হঠাৎ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। ভগবানের কৃপায় ছেলেকে আবার ফিরে পেলাম।’ আর মা বলছেন, ‘ভাগ্যিস এসআইআর হচ্ছে। তাই তো ছেলেটা আবার ঘরে ফিরল।’

