শৌভিক রায়
ঠিক এই মুহূর্তে শুধু ইরান-ইজরায়েল বা রাশিয়া-ইউক্রেন নয়, সুদান, ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া, নাইজিরিয়া সহ বিশ্বের অন্তত তিরিশটি জায়গায় নানা কারণে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধবিধস্ত এই দেশগুলিতে কত মানুষ নিহত হয়েছেন, কত শিশু পরিবার হারিয়েছে তার হিসেবে নেই। এরকম এক দুর্বিষহ মুহূর্তে তাই বারবার মনে পড়ছে অ্যান্সগার মিশনের কথা, যার সঙ্গে জড়িয়ে আমাদের উত্তরের ছোট্ট এক জনপদ।
স্ক্যান্ডিনিভিয়ান মিশন ফ্লাইট উড়ান সংস্থার একটি উড়ানের নাম ছিল অ্যান্সগার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিমানটি আমেরিকান এয়ারফোর্সের যুদ্ধসামগ্রী পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত হত। সেটির নামকরণ হয়েছিল সেন্ট অ্যান্সগার-এর নামে। সেন্ট অস্কার নামেও পরিচিত, এই মানুষটি নবম শতকে সুইডেনে এসেছিলেন শান্তির বাণী প্রচার করতে। আর ‘কিংডোম অফ গড’-এর দেশ সুইডেনের স্টকহোম থেকে, ১৯৪৬ সালের ২৪ মার্চ, অ্যান্সগার বিমানটি রওনা দিয়েছিল ভারতের উদ্দেশে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে তখন ইউরোপ জর্জরিত। পুরোনো রাষ্ট্র ভেঙে গিয়েছে। নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধের দামামা জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। লালিত মূল্যবোধ, সংস্কার সব ভেঙে চুরমার। মানুষের মনোজগতে এসেছে এক বিপুল আলোড়ন। কিছুদিন আগে হিরোশিমার বুকে ফেলা আণবিক বোমা তছনছ করে দিয়েছে সব। ইউরোপ, এশিয়াজুড়ে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন দগদগে ঘায়ের মতো দেখা যাচ্ছে।
যুগ সন্ধিক্ষণের সময়ে তাই এই আকাশযাত্রা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে, যুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত একটি উড়োজাহাজকে, শান্তির বাণী প্রচারকারী এক বিশেষ দূতের নামে নামাঙ্কিত করার মধ্যে দিয়ে মিশনারিরা তাঁদের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আর মিশনের গন্তব্য হিসেবে ভারতকে বেছে নেওয়ার পেছনেও ছিল এক বিশেষ উদ্দেশ্য। কেননা একমাত্র ভারত-ই প্রতি যুগে অহিংসা ও শান্তির কথা বলে এসেছে।
যাত্রা শুরুর সেই দিনটিতে স্টকহোমের বিমানবন্দরে বেশ ভিড়। শান্তির বাণী প্রচার করতে যে ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক আর তিনজন শিশু মাতৃভূমির নিশ্চিন্ত আরাম ও সুরক্ষা ছেড়ে এতদূর পাড়ি দিতে চলেছেন, তাঁদের এক ঝলক দেখতে চেয়েছিলেন সকলেই। সকাল ৮টায় আকাশে উড়েছিল ফ্লাইট অ্যান্সগার। দক্ষিণে উড়ে যেতে যেতে জানলা দিয়ে যাত্রীরা দেখেছিলেন, বসন্তের জন্য অপেক্ষা করে আছে সুইডেনের অরণ্য, মাঠ, লেক, গ্রাম ও শহর। কিন্তু যুদ্ধের তাণ্ডবে বসন্তের চেনা সুর যেন উধাও। সকাল সাড়ে ১০টায় ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে যখন উড়ান নামল, তখন সেখানেও প্রচুর সংখ্যক মানুষ উপস্থিত। সমবেত সংগীতে তাঁরা শান্তি মিশনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
নেদারল্যান্ডসের আকাশে যখন অ্যান্সগার প্রবেশ করল, মিশনারিরা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সৌজন্যে সেখানকার সুন্দর প্রকৃতি। আকাশ থেকেও সেটা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সর্বত্রই বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন এতটাই যে, মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল সবার। উইন্ডমিল ছাড়া গ্রামগুলিকে চেনা যাচ্ছিল না। জার্মানরা এক বিধ্বংসী বন্যার কবলে ফেলেছিল নেদারল্যান্ডসকে। মাইলের পর মাইল অনুর্বর ভূমি ছিল তার প্রমাণ। আমস্টারডামে নেমে মিশনারিরা পেলেন বিপুল সংবর্ধনা। তাঁদের ধন্যবাদ জানাতে দলে দলে সেই দেশের মানুষরা বিমানবন্দরে এসেছিলেন। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সুইডেনের সাহায্য তাঁরা ভোলেননি।
প্রকৃতি বদলে গেল ফ্রান্সে। সমতলের পরিবর্তে পাহাড় আর উপত্যকা বেশি পরিমাণে দেখা গেল। তবে অরণ্য, জঙ্গল, গ্রাম, শহর সবেতেই যুদ্ধের চিহ্ন। বরফে ঢাকা আল্পস যখন দেখলেন তাঁরা, তখন সূর্য পশ্চিমে অস্ত যাচ্ছে। ফলে আল্পস লাগছে ‘Bride with her Brides-maid’-এর মতো। ভূমধ্যসাগরও দেখা গেল। আর তাঁদের প্রথম দিনের যাত্রা থামল মার্সেইলে। সেখানেই সেদিন তাঁদের রাত্রিবাস। দুটি লরিতে চেপে মিশনারিরা সিটি সেন্টারে পৌঁছালেন। দুর্ভাগ্য তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় কোনও মানুষের যোগাযোগ হল না। যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল ফ্রান্সের পরিচিত অত্যন্ত ভদ্র সাধারণ মানুষগুলিকে।
দ্বিতীয় দিন, ভূমধ্যসাগর উপকূল ধরে নেপলসে পৌঁছে মিশনারিদের মন অত্যন্ত খারাপ হয়ে গেল। এত সুন্দর একটি শহর তখন ভগ্নপ্রায়। যুদ্ধ তার বিষাক্ত থাবায় সব শেষ করে দিয়েছে। একই অবস্থা ছবির মতো সুন্দর ঐতিহাসিক এথেন্স শহরেরও। তবে দক্ষিণ ইউরোপের প্রকৃতি তাঁদের আনন্দ দিয়েছিল। কেননা সেই সময়ে সেখানে তখন বসন্ত আসছে। ফলে, প্রকৃতিতে সাজোসাজো রব। যুদ্ধের বধ্যভূমিতে সেটিই ছিল নবজীবনের একমাত্র প্রতীক।
সেদিনই ক্রিট ও আলেক্সান্দ্রিয়া হয়ে অ্যান্সগার পৌঁছাল কায়রোতে। ততক্ষণে অন্ধকার ঘনিয়ে গিয়েছে। মরুভূমির মাঝে বিমানবন্দরের লাল ও সবুজ আলোর সংকেত হিরের মালার মতো দেখাচ্ছিল। কায়রোতে দু’দিন জনসংযোগ করেছিলেন মিশনারিরা। দেখেছিলেন বিখ্যাত পিরামিড ও মিউজিয়াম।
দু’দিন পর তাঁরা সুয়েজ ক্যানালের ওপর দিয়ে হেবরেন হয়ে বেথেলহেলম পৌঁছালেন। তাঁদের তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে পড়ছে জিশুখ্রিস্টের কথা। প্রেমের বাণী প্রচার করে যে মানুষটিকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়েছিল, তাঁর কথা ভেবে সকলেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। জিশুকে স্মরণ করে আবারও সকলে শপথ নিয়েছিলেন, শান্তির বাণী প্রচার করাই হবে তাঁদের জীবনের লক্ষ্য। অবশেষে জেরুজালেম ও জেরিকো হয়ে তাঁরা এলেন বাগদাদে। কিন্তু সেখানে তেমন কোনও আপ্যায়ন পেলেন না। ফলে তেল ভরে উড়ে গেলেন পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ তীরের চাৰ্জাতে।
শেষদিনে, প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে তাঁরা যখন করাচি পৌঁছালেন, তাঁদের কিন্তু সেখানে নামতে দেওয়া হল না। আরও পশ্চিমে যাওয়ার নির্দেশ এল। শেষ পর্যন্ত অ্যান্সগার নামল ‘বোম্বে’-তে। মিশনারিদের ইচ্ছে ছিল তাঁরা সেদিনই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়বেন। কিন্তু এয়ারপোর্টের মেডিকেল অফিসার তাঁদের সেই অনুমতি দিলেন না। ভয় ছিল, ইউরোপ থেকে তাঁরা পীতজ্বরের জীবাণু নিয়ে এসেছেন। ফলে নয়দিন সবাইকে কোয়ারান্টিনে থাকতে হল।
রিজার্ভেশন করে বোম্বে থেকে এলাহাবাদ হয়ে কলকাতার ট্রেন ধরেছিলেন মিশনের অন্যতম কর্তা রেভারেন্ড ব্রান্ডট। কিন্তু অত্যধিক ভিড়ে সেদিনও রিজার্ভেশনের আলাদা সুবিধে পাননি মিশনারিরা। কলকাতায় পৌঁছে, দুইদিন শান্তির বাণী প্রচার করে, ১৮ এপ্রিল কোচবিহারে এলেন রেভারেন্ড ব্রান্ডট ও তাঁর সঙ্গীরা। সেই সময় রেলপথ আজকের বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ছিল। দেওয়ানহাটে তাঁদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন তদানীন্তন কোচবিহার সুইডিশ মিশন স্কুলের প্রধান শিক্ষক সহ ছাত্র ও অন্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা। রেভারেন্ড ব্রান্ডট ছিলেন কোচবিহার সুইডিশ মিশনের প্রধান ব্যক্তি। কোচবিহার তথা ভারত তাঁর অচেনা ছিল না। কিন্তু ১৯৪৬ সালের সেই যাত্রা ছিল তুলনায় একেবারেই আলাদা। এই সফরকে তিনি যে খুব উপভোগ করেছিলেন, সেটি বোঝা যায় তাঁর বক্তব্য থেকে- If I was asked to choose between a safe ride in bullock-cart and risky flight in a modern aeroplane, I would certainly choose the latter, at least from Sweden to India.
যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে সেদিন এভাবেই এক হয়ে গিয়েছিল স্টকহোম আর কোচবিহার। আজ যখন বিশ্বের প্রায় সর্বত্র রণদামামা চলছে, তখন মনে হয় সেন্ট অ্যান্সগারের মতো শান্তির দূতদের আরও বেশি প্রয়োজন। দরকার সেদিনের মিশনারিদের মতো শান্তি যাত্রার। তাহলেই হয়তো একদিন একসূত্রে গেঁথে যাবে পৃথিবীর সব প্রান্ত। তাহলেই আর কোনও মায়ের কোল খালি হবে না, সব হারিয়ে কোনও শিশু অসহায় বসে থাকবে না খোলা আকাশের নীচে।
(লেখক শিক্ষক। কোচবিহারের বাসিন্দা।)



