দিনহাটা: মেয়ের বিয়ে। তাই প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস ভালো করে দেখে কিনে নিতে হবে। নিয়মে একটুও ত্রুটি রাখা চলবে না। তাই বাজার করতে বেরিয়ে রেখা পাল একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যাগে রাখা তালিকাটি বের করে মেলাতে লাগলেন। মনোযোগ দিয়ে তা দেখে আবার হাঁটতে লাগলেন বিশেষ একটি দোকানের দিকে। যে দোকানটির সামনে থামলেন সেখানে সার দিয়ে সাজানো রয়েছে নানা রঙের নানা নকশার কুলো। সঙ্গে রয়েছে বাঁশের চালন। দোকানদারকে মেয়ের বিয়ে জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কুলো আর চালন বেছে দিতে বলে রেখা জানালেন, ‘যতই আধুনিক যুগ হোক না কেন, বিয়ের কেনাকাটায় কুলো আর চালন থাকতেই হবে। কোনও শুভ অনুষ্ঠানই এগুলি ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।’
বিয়ের মরশুমে দিনহাটার চওড়াহাট বাজারে প্লাস্টিক বা স্টিলের হাজার রকম আধুনিক জিনিসের ভিড়েও বাঁশের চালন আর কুলোর গুরুত্ব অনেক। বাজারের আরেক দোকানে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে কথা বলছিলেন গৌরাঙ্গ বসাক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই চালন–কুলোর ব্যবসা করছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘অনেক জিনিসের কেনাবেচায় তারতম্য হয়, কিন্তু চালন আর কুলো বিক্রি সারাবছর চলে। কোনও দিন বিক্রি কম হয় না। যে কোনওরকম পুজো, বিয়ে বা অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ধান ঝাড়াই অবধি সবেতেই ওই দুটি জিনিসের খোঁজ পড়ে।’ তাঁর দোকানে বিভিন্ন মাপের কুলো আর চালন সাজানো রয়েছে। দাম মাত্র একশো টাকা থেকে শুরু। তবে নকশা, বাঁশের গুণমান ও আকার অনুযায়ী দাম বাড়ে।
এদিন বাজারে গিতালদহ থেকে এসেছিলেন পাইকারি বিক্রেতা মৃণালকান্তি ঘোষ। তাঁর হাতে ছিল বড় বস্তা, ভিতরে বেশ কয়েক ডজন কুলো ও চালন। তিনি জানালেন, এখন ধান ঝাড়াইয়ের সময় চলছে। গ্রামের মানুষের কুলোর প্রয়োজন হবে। তাই এই সময় চাহিদা আরও বেড়ে যায়। আবার চওড়াহাট বাজারেই আরও একটু এগোতেই দেখা গেল, বিয়ের জন্য নানা নকশা আঁকা বিশেষ কুলো-চালনের বিক্রিও চলছে জোরকদমে। দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যবসায়ী আনন্দ পাল অবশ্য বললেন, ‘শুধু বিয়ে নয়, যে কোনও পুজো, গৃহপ্রবেশ, নামকরণ সহ সবকিছুর জন্যই কুলো-চালন লাগে। তাই বছরের সব সময়ই বিক্রি সমান থাকে।’ দিন বদলাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিক হচ্ছে পৃথিবী। তবে কিছু জিনিস আজও বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ ও আচার–অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অংশ। বাঁশের তৈরি চালন ও কুলো তার মধ্যে অন্যতম। ফলে এই দুই ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী বাঙালি ঘরে আজও অটুট।

