ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন মোড় এনে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যক্তিগত সখ্য। ২৩তম ভারত-রাশিয়া শীর্ষক সম্মেলনে যোগ দিতে পুতিন এখন ভারতে। ২০০০ সালের পর থেকে মোট ১০ বার তিনি ভারতে এলেন। পুতিন ক্ষমতায় আসার বহু আগেই ভারত ও রাশিয়ার বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন হয়েছিল। বিশ্বের প্রথম এই কমিউনিস্ট দেশটি ঘুরে এসে রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে তাঁর চোখ দিয়ে রুশ দেশের সঙ্গে বাঙালি তথা ভারতবাসীর আত্মিক পরিচয় গড়ে ওঠে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে একসময় কমিউনিস্ট রাশিয়া হয়ে উঠেছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী, বামপন্থী বিপ্লবীদের পীঠস্থান। ১৯৫৫ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সোভিয়েত যাত্রা ও তারপর সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ফার্স্ট সেক্রেটারি নিকিতা ক্রুশ্চেভের ভারত সফর দুই দেশের বন্ধুত্বের বাঁধনকে আরও মজবুত করে। ঠান্ডাযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধের আবহে ভারত অবশ্য প্রকাশ্যে উভয় দেশ থেকে সমদূরত্ব রাখার নীতি নিয়েছিল।
বদলে তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন দেশগুলিকে নিয়ে ভারত গড়ে তুলেছিল নির্জোট আন্দোলন। নেহরু-ক্রুশ্চেভ, ইন্দিরা-ব্রেজনেভ, রাজীব-গর্বাচভ থেকে মোদি-পুতিন- দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সমীকরণের শক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কালোত্তীর্ণ করে তুলেছে। সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙন ও ঠান্ডাযুদ্ধের অবসানের পরেও সেই ছবিটা বদলায়নি। বরং প্রোটোকল ভেঙে দিল্লির বিমানবন্দরে মোদির পুতিনকে স্বাগত জানানো, তাঁর সঙ্গে করমর্দন-আলিঙ্গন, একই গাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর ৭ লোককল্যাণ মার্গের বাসভবনে যাওয়া ইত্যাদি সবই উষ্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উদাহরণ।
একথা ঠিক যে, সোভিয়েতের পতনের পর রাশিয়ার দাপট আগের তুলনায় অনেকটা ম্লান। কিন্তু তার পরেও প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা সহ একাধিক ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা বন্ধ হয়নি। রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তায় অপরিশোধিত তেল কেনায় ভারতের সঙ্গে শুল্ক যুদ্ধে নেমেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ধাক্কা সামলাতে রুশ তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বটে, কিন্তু সামান্য হলেও আমদানি কমাতে শুরু করেছে নয়াদিল্লি। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সখ্য তৃতীয় কোনও দেশের অঙ্গুলিহেলনে কখনও পরিচালিত হয়নি। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির নানা পরিবর্তনে পুরোনো বন্ধু রাশিয়ার দিকে ফিরে তাকাতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছে ভারত।
ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর ভারতের স্বার্থে আঘাত লাগার মতো একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অবৈধ ভারতীয় অভিবাসীদের শিকল ও বেড়ি পরিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো, শুল্ক আরোপ, অপারেশন সিঁদুর থামানোর কৃতিত্ব দাবি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ ও লাগাতার প্রশংসা ইত্যাদিতে ট্রাম্পকে নিয়ে মোদির প্রচারের ফানুস আগেই ফাঁসিয়ে দিয়েছে। নজিরবিহীনভাবে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, তিনিই ভারত-পাকিস্তানের সংঘাত বন্ধ করেছেন। মোদি স্পষ্ট ভাষায় তা খারিজ করতে পারেননি।
তবে ভারতের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বে নতুন শান দিতে বাধ্য হয়েছেন মোদি। কিন্তু তা নিয়ে প্রচারের আড়ালে পাকিস্তান ও চিনের বিরুদ্ধে ভারতের অভিযোগগুলির নিষ্পত্তিতে রাশিয়াকে ভারত কতটা পাশে পাবে, তা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। মোদি-পুতিন যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করা হলেও সরাসরি পাকিস্তানের নিন্দা করেননি রুশ রাষ্ট্রপতি। পাকিস্তানকে সামরিক দিক থেকে সবরকম সাহায্য করা চিনকে রাশিয়া আদৌ কড়া বার্তা দেবে কি না, সেই নিশ্চয়তা পুতিনের কাছ থেকে আদায় করতে পারেননি মোদি।
একসময় ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরে আমেরিকা, চিন, পাকিস্তানকে লালচোখ দেখানো থেকে পিছু হটত না মস্কো। নয়াদিল্লির সঙ্গে ক্রেমলিনের সেই হৃদ্যতা কমেনি ঠিকই। কিন্তু আমেরিকা-চিন-পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান স্নায়ুর যুদ্ধে রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত কতটা সাহায্য পাবে, পুতিনের নয়াদিল্লি সফরে সেই ধোঁয়াশা কাটল না।

