সত্যম ভট্টাচার্য
এককালে আমাদের বাড়ি ডুয়ার্সের গেটওয়ে ময়নাগুড়িতে হওয়ার কারণে সেখান থেকে মাতামহের আবাস মালবাজার সংলগ্ন একটি চা বাগানে যাত্রা ছিল বড়ই মনোমুগ্ধকর। ধূপগুড়ির রাস্তায় পিতৃদেবের কর্মস্থল হওয়ার কারণে ময়নাগুড়ি থেকে সে রাস্তাও ছিল গাছে ঢাকা। রাস্তাঘাট উন্নত হবার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। এখন আর কোনও দূরত্বকেই দূরত্ব মনে হয় না। কিন্তু শুধু প্রদীপের এই আলোটুকু দেখলে বা দেখালে হবে না। একইসঙ্গে তার নীচের অন্ধকারের দিকটিও মাথায় রাখতে হবে।
চালসা থেকে ময়নাগুড়ি বাইপাস পর্যন্ত সড়ক চওড়া করবার কারণে বৃক্ষনিধন হতে চলার খবরটি মনকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে। এই গাছগুলি কাটা পড়তে চলেছে কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলছে কাটা পড়বে, কেউ আবার উলটোটা বলছে। তবে গাছগুলি কাটা পড়ার দিকেই পাল্লা ভারী। আমরা সকলেই জানি যে, মাত্র একখানা ট্রেন দিনে দু’বার যাবে এবং আসবে বলে কীভাবে লাটাগুড়ি বনকে কয়েক বছর আগেই বেশ খানিকটা কেটে ফেলা হয়েছে। বনবস্তির লোকেদের গাছ কাটাকে চুরি বললে (যদিও তা মূলত অভাবের কারণেই) এটি ছিল পুরোপুরি ‘দিনদুপুরে ডাকাতি’। যেন ব্যাপার এমন যে আমরা যা খুশি তাই করব, তোমাদের ক্ষমতা থাকলে কিছু করো। এখন জনগণও হয়তো সেই সময় ভেবেছিল কী আর করা যাবে। অথবা তারা ভেবেছিল যে এই অঞ্চলে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলি হয়তো কিছু করবে। কিন্তু এই ভাবনার সময় তারা এই বিষয়টিকে মাথায় নেয়নি যে, এই সমস্ত পরিবেশবাদী সংগঠনের কর্তাব্যক্তিদের এই সময় পরিবেশ বাঁচানোর আড়ালে সরকারি আনুকূল্য বা পুরস্কার গ্রহণ এবং আলোর নীচে আসাটাই মূল লক্ষ্য। তাই তাঁরা লোকদেখানো আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই করবেন না।
লুপপুলের কারণে কীভাবে নেওড়াভ্যালি জঙ্গল কেটে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে তা আমরা সবাই দেখেছি। আবার ওদিকে সেবক থেকে যে রেলপথ তৈরির কাজ চলছে সেখানে পাহাড় সোচ্চারে প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছে। প্রতি বর্ষায় একের পর এক বিপর্যয়ে চলে যাচ্ছে কত কত প্রাণ। সিকিমের বাঁধগুলির কারণে মাঝেমধ্যেই ফুঁসে উঠছে তিস্তা, নামছে ধস, হচ্ছে ভূমিকম্প। দিনের পর দিন বন্ধ থাকছে রাস্তা। আসলে এই সমস্তের আড়ালে ভয়ংকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকাবাসীর জীবনের মান।
মহাসড়ক হবার কারণে ডুয়ার্সের জলবায়ুর পরিবর্তন আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। ভাবনাচিন্তা না করেই গ্রাম-শহর নির্বিশেষে বাড়িতে বাড়িতে বসানো চলছে এসি। এর দায় জনগণকেই নিতে হবে। তাই আন্দোলনেও জনগণকেই নামতে হবে। মনে রাখতে হবে উন্নত দেশগুলিতে কিন্তু পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখেই উন্নয়নের কথা ভাবা হয়। তাই আশা করা যায় এইবার হয়তো স্থানীয় মানুষ নিজেরাই এই আন্দোলনের ভার হাতে তুলে নেবেন। নিজেদের এবং আগামী প্রজন্মকে ভালো রাখার স্বার্থে এই কাজটুকু করতেই হবে। এছাড়া আমাদের হাতে অন্য কোনও উপায় নেই।
(লেখক পেশায় শিক্ষক। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা।)



