শুভঙ্কর চক্রবর্তী ও দীপ সাহা
গোধূলির আলো তখন নিভুনিভু। রায়গঞ্জ (Raiganj) শহরে ঢোকার মুখে হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করালেন এক পুলিশ আধিকারিক। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গোটা দশেক বন্দুকধারী জওয়ান। ভারী গলায় আধিকারিকের নির্দেশ, ‘ডিকিটা খুলতে হবে’। ডিকি খোলার পর সেখানে থাকা ট্রলি দেখে শুরু হল প্রশ্ন, কোথা থেকে আসছেন, কোথায় যাবেন ইত্যদি। তবে জওয়ান বা পুলিশ আধিকারিকের কেউই ট্রলি খুলে দেখলেন না তার ভেতরে কী আছে। গাড়ির পেছনের সিটে রাখা ব্যাগ নিয়েও তাঁদের কোনও উৎসাহ দেখা গেল না। ট্রলির দিকে তাকিয়ে ভেতরে কী আছে আধিকারিক তা জানতে চাইলেন বটে, তবে খুলে দেখে নিতে বলায় তাঁর আর বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল না। হাত নেড়ে চলে যেতে বললেন। নাকা পেরিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করল, কিন্তু সত্যিই যদি ব্যাগের ভেতরে অস্ত্র, টাকা বা মাদক থাকত তাহলেও কি ওই ধরনের তল্লাশিতে তা ধরা পড়ত? এ প্রশ্ন মনে থেকেই গেল।


খবরের সন্ধানে শিলিগুড়ি (Siliguri) থেকে রওনা হয়ে গত কয়েকদিনে দার্জিলিং, দুই দিনাজপুর এবং মালদা জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে নাকা চেকিংয়ের (Naka Checking) বজ্র আঁটুনির আড়ালে ওই ধরনের ফসকা গেরো দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কুশমণ্ডির লক্ষ্মীতলা নাকা চেকিংয়ে যখন গাড়ি দাঁড় করাল পুলিশ ও আধাসেনা তখন তাদের তৎপরতা দেখে মনে হয়েছিল, সব নাকা বুঝি সমান নয়। কিন্তু ভুল ভাঙল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। এ যেন রায়গঞ্জেরই রিপিট টেলিকাস্ট। তল্লাশির নামে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হয়রানি ছাড়া বোধহয় একে কিছুই বলা যায় না। রাস্তায় কয়েক কিলোমিটার পরপরই কোথাও বাঁশ বেঁধে, কোথাও তাঁবু খাটিয়ে চলছিল ‘তল্লাশি’। হরিরামপুরের জগদোলা নাকায় আবার ভিন্ন ছবি। পুলিশ নয়, সেখানে পুরো নিয়ন্ত্রণই আধাসেনার হাতে। খাতা হাতে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদেরও কাছেপিঠে দেখা গেল না। তবে বন্দুকধারী জওয়ানরাও গাড়ির ভেতরে উঁকি মেরে দেখলেন না। ডিকি দেখেই তাঁরা সন্তুষ্ট।
খানিক পরপর নাকায় দাঁড়িয়ে একসময় বিরক্তি এল। ইটাহার থেকে কালিয়াগঞ্জ যাবার রাস্তায় কুনোর রোডে মুকুন্দপুর পেট্রোল পাম্পের কাছে নাকায় যথারীতি গাড়ি দাঁড়াল। এবারেও তল্লাশির ধরনে পরিবর্তন নেই। ‘ট্রলি খুলে দেখছেন না কেন? ভেতরে তো নিষিদ্ধ কিছু থাকতেও পারে। গাড়ির ভেতরেই বা তল্লাশি করছেন না কেন?’ প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন পুলিশ আধিকারিক। এগিয়ে এলেন নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত তিন আধিকারিক। তাঁদের একজন বললেন, ‘আমরা লোক দেখলেই সব বুঝে যাই। অতকিছু দেখার প্রয়োজন হয় না।’ পাশ দিয়ে তখন বেশ কয়েকটি ব্যাগপত্র সহ যাত্রী নিয়ে চলে গেল একটি অটো। তা আটকে অবশ্য তল্লাশির প্রয়োজন মনে করলেন না নিরাপত্তাকর্মীরা।
হেমতাবাদের ঠাকুরবাড়ি মোড়ের নাকা চেকিংয়ে রণংদেহি মেজাজে পুলিশ ও আধাসেনার জওয়ানরা। গাড়ির লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক চেয়ারে বসে গাড়ির নম্বর, মালিকের ফোন নম্বর ইত্যাদি নথিবদ্ধ করছেন। আর একজন অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ডিকিতে ট্রলি দেখেও তা খুললেন না কেউই। ‘ভালোভাবে দেখে নিচ্ছেন না কেন? না দেখলে এভাবে আটকানোর মানে কী?’ প্রশ্ন করলেই এক মহিলা পুলিশ আধিকারিক চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আপনার কাছ থেকে শিখতে হবে না। কীভাবে তল্লাশি হবে তা আমরা জানি।’ পাশ থেকে এক জওয়ান বললেন, ‘হল্লা মত করো, জলদি নিকাল যাও’। অযথা সময় নষ্ট না করে আমরাও হেমতাবাদ ছাড়লাম। কিন্তু মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নের উত্তর মিলল না, লোকদেখানো নাকা তল্লাশিতে আদৌ কি কোনও লাভ হয়?

