মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : তালাবন্ধ গুদামে কোথা থেকে এল পচাগলা দেহ, ২৪ ঘণ্টা পরেও সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল না। নন্দপ্রসাদ বালিকা বিদ্যালয় থেকে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহ নিয়ে রহস্য ক্রমেই বাড়ছে। মঙ্গলবারও দেহটি শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনায় ব্লক প্রশাসন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বিকাশ ভবন থেকে স্থানীয় শিক্ষা আধিকারিকদের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে সোমবারের ঘটনার পর এদিন আতঙ্কে স্কুলমুখো হয়নি বেশিরভাগ পড়ুয়া। পরিচালন কমিটির সভাপতি চিরঞ্জিত ঘোষ বললেন, ‘আমরা পুরো ঘটনা বিকাশ ভবনে লিখিত আকারে জানিয়েছি। ওরা আমাদের কাছে রিপোর্ট চেয়েছিল। স্কুলে কিছুদিনের মধ্যেই পরীক্ষা শুরু হবে। তারপর সরকারি ছুটি রয়েছে। তাই এখন স্কুল বন্ধের কোনও প্রশ্ন ওঠে না।’ নকশালবাড়ির বিডিও প্রণব চট্টরাজ এই ইস্যুতে মন্তব্য করতে নারাজ।
স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮৫০। সোমবার হাজারের বেশি পড়ুয়া উপস্থিত হলেও, মঙ্গলবার একশোজন পড়ুয়াকে স্কুলে দেখা যায়নি। অধিকাংশ ক্লাসরুম ছিল ফাঁকা। কোনও ক্লাসে একজন, কোথাও দুজন পড়ুয়া উপস্থিত ছিল। স্কুলজুড়ে ছিল চাপা আতঙ্ক। যে ক’জন পড়ুয়া এসেছিল তাদের কাউকেই গুদামের আশপাশে ঘেঁষতে দেখা যায়নি। গোটা স্কুলে ৩৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, সবই সচল। কিন্তু একজন অপরিচিত ব্যক্তির স্কুলের গুদামে ঢোকার কোনও ভিডিও ক্যামেরাতে কেন ধরা পড়ল না, সেই প্রশ্নে ধন্দে পুলিশও। ক্যামেরাগুলির মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালানো হয় কি না তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। দুষ্কৃতী কার্যকলাপের সময় ক্যামেরা বন্ধ করা হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। নকশালবাড়ি থানার ওসি পুলক রায়ের বক্তব্য, ‘কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। মৃতের পরিচয় পর্যন্ত জানা যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


সোমবারের ঘটনার পর ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। স্কুলে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগের দাবি তুলেছেন তাঁরা। এক অভিভাবক মহম্মদ আকবরের কথা, ‘মেয়েদের স্কুলে এত বড় ঘটনার পরও প্রশাসনের আধিকারিকদের কোনও হেলদোল নেই। বড় শহরে এমন হলে অনেককিছু হয়ে যেত। আমরা প্রতিটি ছাত্রীর সুনিশ্চিত নিরাপত্তা চাই।’ মৃতদেহ উদ্ধার নিয়ে নানা মনগড়া গল্প ইতিমধ্যেই চাউর হয়েছে নকশালবাড়ির বিভিন্ন এলাকায়। ফলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরাও। এতসবের পরেও পড়ুয়াদের স্কুলে ফেরাতে কোনও পদক্ষেপ করেনি স্কুল কর্তৃপক্ষ। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত টিচার ইনচার্জ কেকা রায়ের বক্তব্য, ‘পরিচালন কমিটির সভাপতি এবং টিচার ইনচার্জ ছুটিতে আছেন। তাঁরা ফিরলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
সাইকেল মেরামতের কাজে যুক্ত সুপারভাইজার, শ্রমিক সকলকে এদিন থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শুক্রবার শেষবার গোডাউনে কাজ করেন মহম্মদ আহমেদ নামক এক শ্রমিক। তাঁকে দীর্ঘক্ষণ জেরা করা হয়েছে। সূত্রের খবর, তাঁর বক্তব্যে কিছু অসংগতি মিলেছে। শুক্রবার গুদামে তালা মেরে মালবাজারে অন্য একটি স্কুলে সাইকেল মেরামতের জন্য চলে গিয়েছিলেন শ্রমিকরা। পুলিশের অনুমান ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মৃতদেহটি গুদামে থাকায় পচন ধরেছিল। অর্থাৎ যেদিন শ্রমিকরা মালবাজার গিয়েছিলেন সেদিন থেকেই গুদামে মৃতদেহ থাকার সম্ভাবনা বাড়ছে। শ্রমিকদের চলে যাওয়া এবং তালাবন্ধ গুদামে দেহ মেলার মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে কি না তা বোঝার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। আপাতত ওই শ্রমিক বা সুপারভাইজার কাউকেই তাদের অনুমতি ছাড়া নকশালবাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করেছে পুলিশ। মৃতদেহটি মঙ্গলবার নকশালবাড়ি গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।

