গৌতম সরকার
জাদু নয়, বিপণন! নকশালবাড়িকে বিপণন। নকশাল শব্দটা ভাঙিয়ে বিপণন। বিধানসভা ভোটের আবহেও। বাইরে থেকে কেউ উত্তরবঙ্গে নির্বাচনের খবর সংগ্রহে এলে তাঁর অবশ্য গন্তব্য যেন বেঙ্গাইজোত। নকশালবাড়ির সেই গ্রাম, যেখানে মার্কস-লেনিন-মাও প্রমুখের মূর্তি এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। অবশ্যই যাওয়া চাই পাশের প্রসাদুজোতে। যেখানে ১৯৬৭ সালে কৃষকের ওপর গুলি জন্ম দিয়েছিল ঐতিহাসিক নকশালবাড়ি আন্দোলনের। টিভি ক্যামেরায় সেই জায়গাটা দেখিয়ে বিপ্লবের স্মৃতিচারণ এক ধরনের বিপণন তো বটেই।
সেইসঙ্গে আক্ষেপ ফুটিয়ে তোলা- আহা, নকশালবাড়ির লাল রংটা গেরুয়া হয়ে গেল। গলা কাঁপিয়ে টিভির খবরে কিংবা নানা বৈপ্লবিক বিশেষণ ব্যবহার করে সংবাদপত্রে নকশাল দুর্গের দখল বিজেপির হাতে চলে যাওয়ার সবিস্তার বিবরণ প্রকাশও তো নকশালবাড়ির বিপণনই। প্রতি নির্বাচনে হয়। এবারও হয়েছে। বাঙালি বিপ্লব ভুলেছে অনেক কাল। রেড বুক হাতে দলে দলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আবেগে ভাসতে ভাসতে গ্রামে চলে যাওয়া আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে কার্যত মূর্খামি।
কিন্তু সেই প্রজন্মের একাংশের মধ্যে আবার সেই ব্যর্থ বিপ্লবের প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতা আছে। সংবাদমাধ্যমে নকশালবাড়ির প্রসঙ্গ সেই কৌতূহলকে উসকে দেয়। মাওবাদী তকমায় পাহাড়-জঙ্গলে কাটানো একদল মানুষকে সদ্য নিকেশ করেছে রাষ্ট্র। দেশের খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিক শা সদম্ভে যে মাওবাদীমুক্ত ভারত তৈরির কর্মসূচি নিয়েছিলেন, তা সফল বলে ঘোষণাও করেছেন। যে অভিযানে দলে দলে লোক নিহত হয়েছেন গুলিতে। অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আরেকদল কার্যত নাকে খত দিয়ে রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছে।
মাওবাদীদের ভাবনায় উত্তরবঙ্গে হিমালয় পাহাড়ের কোলে তৈরি হওয়া নকশালপন্থার যোগাযোগ কতটা, আদৌ মিল আছে কি না ইত্যাদি নিয়ে সংশয় আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের এই নকশাল নিধনের আবহেও নকশালবাড়ির প্রতি সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ রয়েছে পূর্ণমাত্রায়। কোচবিহারে গেলে যেমন রাজবাড়িকে না ছুঁয়ে খবর শুরু হয় না, উত্তরবঙ্গে তেমনই নকশালবাড়ি।
রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে শুধু কোচবিহার নয়, উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে রাজবংশী জনগোষ্ঠীর আবেগ অনস্বীকার্য। রাজবাড়ির সঙ্গে আত্মিক অনুভব আছে। লোকে আমাদের রাজবাড়ি বলতে গর্বিত বোধ করেন। পান থেকে চুন খসলে রাজার শহরে ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম…’ গোছের তুলনা হয়। নকশালবাড়ি শব্দেও একটা কৌতূহল থাকে, যাকে উসকে দিলে টিভি চ্যানেলের টিআরপি, খবরের কাগজের কাটতি বাড়ে।
রাজনৈতিক দলগুলিও ভোটের স্বার্থে বিভিন্ন সময় নকশালবাড়ি নামের প্রতি আগ্রহকে ব্যবহার করে। দার্জিলিংয়ের সাংসদ থাকাকালীন বিজেপি নেতা সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া নকশালবাড়ির যে গ্রামটিকে দত্তক নিয়েছিলেন, সেখানে প্রবাদপ্রতিম নেতা কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল আমৃত্যু কাটিয়ে গিয়েছেন। রাস্তা বানিয়েই অবশ্য দত্তক গ্রামের উন্নয়ন শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু নকশালবাড়ির ঐতিহাসিক হাতিঘিসা গ্রামকে দত্তক নেওয়ার রেকর্ডটা ভাঙিয়ে কত যে রাজনীতি হয়।
দেশের যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাওবাদী নিধনের ফতোয়া দেন, তিনিই নকশালবাড়ির হতদরিদ্র আদিবাসী রাজু ও গীতা মাহালির বাড়ির দাওয়ায় মধ্যাহ্নভোজন করেন। তাতে রাজু-গীতার দারিদ্র্য ঘোচে না। বিজেপির স্থানীয় নেতা, পঞ্চায়েত সদস্যরাও আর মাহালি দম্পতির খোঁজ রাখেননি। নকশালপন্থার উত্থানের ভূমিতে আদিবাসী পরিবারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্নগ্রহণটাকে শুধু তাঁরা পুঁজি করে রেখেছেন। প্রতি ক্ষেত্রে দলীয় প্রতিযোগিতার নিয়মে তৃণমূল আবার ওই পরিবারকে সরকারি ঘর বরাদ্দ করে দিয়েছিল।
গীতাকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দিয়ে তৃণমূল সরকারও নকশালবাড়ি নামটাকে ব্যবহার করেছে ভোটের কৌশল হিসেবে। নকশালপন্থীদের মতো বাংলার মাটিতে অনুশীলন সমিতি, যুগান্তরের মতো বিপ্লবকামী সংগঠনের তৎপরতার ইতিহাস আছে বটে। কিন্তু সেই বিপ্লব তৃষ্ণা কবে হারিয়ে ফেলেছে বাঙালি। সিপিএমও দলের গঠনতন্ত্র থেকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব শব্দটা মুছে ফেলেছে। কিন্তু বাঙালির বিপ্লব বিলাস মোছা যায়নি।
নকশালবাড়ি নামটির উচ্চারণ কিছু মানুষের কাছে বিপ্লবীয়ানার নামান্তর। যে আবেগে রোমান্টিকতা আছে, কিন্তু বিপ্লবের প্রতি আত্মনিবেদনের ভ্রূণমাত্র নেই। তবে সেই রোমান্টিকতা, আবেগ, কৌতূহল, বিপ্লব বিলাস হয়ে উঠেছে কর্পোরেট জগতের পণ্য। যে পণ্যকে বিক্রি করতে খবরের দরকার হয়, রাজনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন হয়। যে কারণে এখনকার নির্বাচনের সঙ্গে নকশালপন্থার দূরতম যোগাযোগ না থাকলেও খবরে নকশালবাড়িকে ছুঁয়ে যেতে হয়।
একই কারণে রাজনৈতিক দলগুলিরও নকশালবাড়িকে ‘ধন্য’ করার তাগিদ উথলে ওঠে। অমিত শা-দের নির্বাচনি মাইক্রো ম্যানেজমেন্টে একই কারণে স্থান পায় বিমান বসুর মাহাত্ম্যকীর্তন। খুব সূক্ষ্মভাবে বিমান বসুর সাদামাঠা জীবনযাপনকে পণ্য করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের স্বয়ংসেবকের সঙ্গে তাঁর তুলনা টেনে প্রচার চলছে। আজকের বামপন্থীরা বিমানকে ভুলে নিউ ইয়র্কের জোহরান মামদানির পিছনে ছুটছেন বলে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
উমর খালিদের প্রতি বামপন্থীদের সহানুভূিতকে সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত রসে চুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বাংলার প্রথম দফার ভোটে নকশালবাড়ির বিপণন কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে প্রয়োজন ছিল। বিমানকে মহান বানানোর আড়ালে ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবনা থেকে নজর সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কর্পোরেট স্বার্থেরই লক্ষ্য। ভোটের ফলাফল ৪ মে জানা যাবে। কিন্তু সন্দেহ নেই যে, উত্তরবঙ্গে যতটা সম্ভব পদ্মের আবাদ করিয়ে নিতে মরিয়া ছিলেন খোদ অমিত শা। বাংলায় এই নির্বাচন শুভেন্দু অধিকারীর মতো শা’রও যে অগ্নিপরীক্ষা।
নকশালবাড়ির ‘বিপ্লবে’র আগুনের সেই দহনক্ষমতা আর নেই। কিন্তু কর্পোরেট স্বার্থে সেই আগুনের বিপণন এখন ঘোর বাস্তব। সেই বাস্তবতা ইভিএম-এ কতটা প্রভাব ফেলবে- তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে। কিন্তু বাঙালির বিপ্লব বিলাস যে অন্যতম বাণিজ্যিক পণ্য, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।



