শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: পিএইচডি কেলেঙ্কারি (PhD Coursework Scam) নিয়ে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের হওয়ার দশা। রিসার্চ এলিজিবিলিটি টেস্ট (রেট) (RET)-এর মাধ্যমে কোর্সওয়ার্কে ভর্তি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় (NBU) কর্তৃপক্ষ। এবার বিশেষ কয়েকজন পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে আলাদা ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠল। কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশানিক ভবনের একটি হলঘরে আলাদা করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল বলেই অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে। কেলেঙ্কারির খবর ফাঁস হতেই সেই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ক্যাম্পাসে। কীভাবে পরীক্ষা হয়েছিল, কারা কোথায় পরীক্ষা দিয়েছিলেন, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা হয়েছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিলিগুড়ির বিদায়ি বিধায়ক শংকর ঘোষ। স্বচ্ছতার প্রমাণে প্রয়োজনে সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনার দাবিও তুলেছেন তিনি।
ভর্তি বাতিল ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ চেয়ে এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়েন্ট রেজিস্ট্রার স্বপন রক্ষিতের কাছে দাবি পেশ করেন শংকর এবং মাটিগাড়ার বিদায়ি বিধায়ক আনন্দময় বর্মন। দুই বিদায়ি বিধায়ক একসঙ্গে ক্যাম্পাসে যাওয়ায় হইচই শুরু হয়ে যায়। জয়েন্ট রেজিস্ট্রার স্বপনকুমার রক্ষিতের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তাঁরা। কেন ইউজিসি’র নির্দেশ অমান্য করে রেট নেওয়া হল, কীভাবে তৃণমূল যুব নেতারা কোর্সওয়ার্কে সুযোগ পেলেন তা জানতে চান শংকর ও আনন্দময়। তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের ঠিকমতো উত্তর দিতে পারেননি জয়েন্ট রেজিস্ট্রার। একসময় তিনি দুই বিধায়ককে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের নির্দেশেই যে তিনি কোর্সওয়ার্ক সংক্রান্ত বিভিন্ন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন সেকথাও জানিয়ে দেন। তবে স্বপনের উত্তরে সন্তুষ্ট নন দুই বিধায়কের কেউই।
শংকরের কথা, ‘লিখিতভাবে রাজ্যপালকে বিস্তারিত জানিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করতে অনুরোধ করব। বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ হবে। কোর্সওয়ার্কে যাঁরা সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে কারা নেট পাশ আর কারা রেট-এর মাধ্যমে সুযোগ পেয়েছেন তাও জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তৃণমূল নেতাদের সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য যে বড় ষড়যন্ত্র হয়েছে তা স্পষ্ট।’
আনন্দময় বলেন, ‘ইউজিসির নির্দেশ কেন অমান্য করা হল তার কোনও সদুত্তর পাইনি। তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মিলে তাদের দলের নেতাদের সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার জন্য নিজেদের মতো করে নিয়ম বানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরফলে যাঁরা এই কোর্সওয়ার্কে সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ল। কর্তৃপক্ষ তৃণমূল নেতাদের সুবিধা করার জন্য সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।’
কোর্সওয়ার্কের ভর্তি বাতিল করে স্বচ্ছ ভর্তির দাবিতে এবং নিময়ভঙ্গের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁদের শাস্তির দাবিতে এদিন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ দেখায় এবিভিপি। পরীক্ষানিয়ামক বিভাগের হাত থেকে সরিয়ে হঠাৎ করে কোর্সওয়ার্কের পরীক্ষা বিভিন্ন বিভাগের হাতে দেওয়া নিয়েও অস্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠেছিল। খরচ বাঁচাতেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেই জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় জয়েন্ট রেজিস্ট্রার এবং ডিন। ডিন বিকাশচন্দ্র পালের কথায়, ‘পরীক্ষানিয়ামক বিভাগে বরাতপ্রাপ্ত এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা নিতে হলে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে সামান্য টাকা খরচ করেই বিভাগগুলি কোর্সওয়ার্কের পরীক্ষা নিয়েছে।’ ডিনের যুক্তি মানতে নারাজ পরীক্ষানিয়ামক বিভাগের বরাতপ্রাপ্ত এজেন্সি। এজেন্সির এক আধিকারিক বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনা খরচে আমরা কোর্সওয়ার্কের পরীক্ষার বন্দোবস্ত করছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সেই পরীক্ষার জন্য আজ পর্যন্ত একটি টাকাও আমরা দাবি করিনি।’ ফলে পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে সরানো নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। যদিও বিশেষ ব্যবস্থাপনায় কয়েকজনের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও আধিকারিক।

