৪১ বছর বাদে ফের মহাকাশ অভিযানে দ্বিতীয় কোনও ভারতীয়। ১৯৮৪ সালে গিয়েছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা। তিনি প্রথম ভারতীয়, যিনি অন্তরীক্ষে গিয়েছিলেন। এবার বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা শুধু মহাকাশে গেলেন তা নয়, প্রথম ভারতীয় হিসেবে তিনি পৌঁছোলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। এই সাফল্য প্রত্যেক ভারতীয়র গর্ব।
রাকেশ থেকে শুভাংশু- মহাকাশ গবেষণায় দীর্ঘ পথ পার হল ভারত। বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে তবে শুভাংশু পৌঁছোলেন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে শুভাংশু সহ চার নভশ্চরকে নিয়ে স্পেসএক্সের ড্রাগন গিয়েছে সেখানে। ২৮ ঘণ্টা পর ড্রাগন যানটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে সফট ডকিং শুরু করে। মহাকাশ স্টেশনে ১৪ দিন থাকবেন এই ভারতীয় মহাকাশচারী।
উচ্ছ্বসিত শুভাংশুর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তাঁর পরিবারও এই সাফল্যে আপ্লুত। আগামীদিনে ভারতের গগনযান পাঠানোর যে পরিকল্পনা আছে, তাতে থাকবেন শুভাংশু। স্পেসএক্সের অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশনে তাঁর সঞ্চিত অভিজ্ঞতা গগনযানের অভিযানে কাজে লাগবে নিঃসন্দেহে। এর আগে চন্দ্রযান-৩, আদিত্য এল-১ মিশনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল ভারত।
গোটা বিশ্বে মহাকাশ গবেষণায় গত চার দশকে প্রশ্নাতীত সাফল্য এসেছে। ভারতও একাধিক সাফল্য পেয়েছে। নানা সময় বহু উপগ্রহ মহাকাশে পাঠিয়েছে ভারত। তার জেরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বহু উন্নতি হয়েছে। কিন্তু মহাকাশ গবেষণার এই সাফল্য সত্ত্বেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সোভিয়েত রাশিয়ার সহায়তায় রাকেশ শর্মা মহাকাশে গিয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় ভারতীয়ের মহাকাশে যেতে কেন ৪১ বছর সময় লেগে গেল?
গগনযান তৈরি এবং উৎক্ষেপণে এত সময় লাগছে কেন, সেটাই বড় প্রশ্ন। নভশ্চরদের নিরাপদে যাত্রা এবং পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে বটে। কিন্তু শুধু সেই কারণে একটি প্রকল্পের শম্বুকগতিতে এগোনো কোনও যুক্তি হতে পারে না। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে মহাকাশ গবেষণা উত্তরোত্তর বেড়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পূর্বতন সোভিয়েত রাশিয়া এবং চিনের অগ্রগতির ধারে-কাছে ভারত যেতে পারেনি।
এর অন্যতম বড় কারণ, ভারতে মহাকাশ গবেষণায় প্রয়োজনীয় রসদের অভাব। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষের বাজেটে মহাকাশ গবেষণার জন্য ১৩,৪১৬.২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০২৪ সালে ওই বরাদ্দ পরিমাণ ১৩,০৪২.৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২.৮৬ শতাংশ বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু এই বরাদ্দ বৃদ্ধির তুলনায় গগনযানের মতো প্রকল্পে খরচ অনেক বেশি। গোড়ার দিকে গগনযান প্রকল্প খরচ ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। সেটা বেড়ে ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
এমন নয় যে, ভারত কম খরচে মহাকাশ গবেষণা করতে পারে না। কিন্তু সবক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। যে অ্যাক্সিয়ম-৪ মিশনে শুভাংশুরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে গিয়েছেন, সেটি নাসা এবং মার্কিন ধনকুবের এলন মাস্কের স্পেসএক্সের যৌথ উদ্যোগ। বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া এই মুহূর্তে বড় মাপের মহাকাশ গবেষণার অগ্রগতি অসম্ভব। ভারতের ইসরো ইতিমধ্যে স্পেসএক্সের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে জিস্যাট এন২ উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করেছে।
কিন্তু ভারতের মতো দেশে বেসরকারি বিনিয়োগকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে হামেশাই পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ ওঠে। কাজেই ইসরো ভবিষ্যতে এলন মাস্কের মতো ধনকুবেরের সংস্থার সঙ্গে বড় আকারে গাঁটছড়া বাঁধতে চাইলে কাজটি স্বচ্ছতার সঙ্গে করা দরকার। জাতীয় স্বার্থকে অসুরক্ষিত করে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
রাকেশ, শুভাংশুরা নিঃসন্দেহে ভারতের মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিশা দেখিয়েছেন। সেই দিশায় গবেষণার কাজের পরিধি বাড়াতে হলে যথেষ্ট রসদ জোগাড় প্রয়োজন। অর্থের অপচয় বন্ধ করে মহাকাশ গবেষণায় সরকার অধিক নজর দিলে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নয়ন হবে, বিজ্ঞানমনস্কতারও প্রসার ঘটবে।



