শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

চাহিদা ও চাকরি

শেষ আপডেট:

মানুষ দেখেন চাল-ডাল-তেল-নুনের দাম কমল কি না। মোবাইল, সোনা-রুপো, মাইক্রোওভেনের মূল্য কমলে সব মানুষের কিছু যায় আসে না। ওষুধের দাম কমলে স্বস্তি আসে বৈকি, কিন্তু চাল-ডালের মূল্য কমলে যেমন হয়- ততটা নয়। তরুণ প্রজন্মের সামনে আজকের দিনে নজর একটিই- চাকরির ব্যবস্থা কতটা হল! এই প্রসঙ্গগুলিতে আশার জন্ম দেয়নি সদ্য লোকসভায় পেশ করা কেন্দ্রীয় বাজেট।

বাস্তবে প্রত্যাশার সঞ্চার করার সাধ্য ছিল না নির্মলা সীতারামনের। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়ে থাকা অনিশ্চয়তার পারদ সামলানো এখন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বাধ্যবাধকতা। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই কৃতী ছাত্র ও গবেষকের অজানা নয় যে, বাজারে চাহিদাটা বড় কথা। শুধু লগ্নি বাড়লে চাহিদা তৈরি হয় না। অর্থশাস্ত্রের মৌলিক শিক্ষাটাই হল- জোগান থাকলে সর্বক্ষেত্রে চাহিদা বাড়ে না। চাহিদা নির্ভর করে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর। মূল সেই বিসমিল্লাতেই গলদ মারাত্মক।

ভারতের মতো দেশে ক্রয়ক্ষমতা তখনই তৈরি হয়, যখন কর্মসংস্থান থাকে। সেই কর্মসংস্থান চাকরি হতে পারে, ব্যবসা কিংবা স্বনিযুক্তি জনিত কারণে হতে পারে। শুধু তাই নয়, সেই কর্মসংস্থান থেকে বাজারমূল্যের আনুপাতিক রোজগার যখন নিশ্চিত হয়। এই সবক’টি ক্ষেত্রে আমাদের দেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ পিছিয়ে আছেন। অর্থনীতির ছাত্র হলেও রাজনৈতিক ও বাজারের বাধ্যবাধকতায় সীতারামন এই সত্যের প্রতি চোখ বুজে ছিলেন বাজেটে।

অথচ বাজারের প্রত্যাশা থাকে বাজেটে। সেইজন্য আপাত গুরুগম্ভীর বাজেটও কৌতূহলের কেন্দ্রে থাকে। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলেও মানুষ যেমন হতাশ হন, বাজার তেমনই। নতুন কিছু মেলেনি বলে তাৎক্ষণিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে শেয়ার বাজারে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশের পর এক ঘণ্টাও কাটেনি, সেজন্য ১০০০ পয়েন্ট ধসে গেল সেনসেক্স। অথচ আশা জাগানো হয়েছিল প্রচুর। পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোট আসন্ন বলে প্রচার ছিল, এই বাজেট হবে কল্পতরু।

বাস্তবের ধাক্কা ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় সেই প্রচারকে অসার প্রমাণ করে দিয়েছেন সীতারামন। সেই বাস্তবটা কী? ভারতে কর্পোরেট ক্ষেত্রে মূলধনি ব্যয় কার্যত এক দশক ধরে নট নড়নচড়ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। মোট স্থির মূলধনের (গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল) গঠন এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তলানিতে ঠেকেছিল দু’বছর আগেই। এই সত্য মেনে নিলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যাবতীয় প্রত্যাশা সেখানেই গুটিয়ে গিয়েছে।

সীতারামন নতুন অর্থমন্ত্রী নন। এই প্রথম তিনি বাজেট পেশ করলেন না। প্রতিবার যাঁর বাজেটে ঘুরে-ফিরে আসে ইলেকট্রনিক্স, পণ্য হাব, ফ্রেট করিডর, সেমি কনডাক্টর, মূলধনি পণ্য, রাসায়নিক ইত্যাদি। এতে লগ্নির অনুপাতে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি হয় না। যেটুকু কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তা পেতে নানা ধরনের দক্ষতা দরকার হয়। যা তরুণ প্রজন্মের সকলের থাকে না। ফলে এই ক্ষেত্রগুলিতে বিনিয়োগ এলেই তরুণরা খুব লাভবান হন না।

অন্যদিকে, দেশীয় বাজারের চাহিদা আশানুরূপ নয় বলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা স্বনিযুক্তি প্রকল্পগুলিতে চাকরি ততটা সৃষ্টি হয় না। সরকারি বা বেসরকারি কিছু ক্ষেত্রে কিছু লোকের উচ্চ হারে বেতনও কিন্তু চাহিদা বাড়ানোর অনুঘটক হয় না সবক্ষেত্রে। শ্রম বাজারের হিসাব হাতের সামনে নিয়ে বসলে সেই সত্যটা স্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে যতই বাগাড়ম্বর করা হোক, নির্মলার হাতে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জাদুকাঠি কিছু ছিলই না।

চাহিদা বৃদ্ধির কোনও দিশাও বাজেটে দেখা হয়নি। শিক্ষা সংক্রান্ত প্রত্যাশা পূরণও যৎকিঞ্চিৎ। ৩০০০ উচ্চমাধ্যমিক স্কুল ছাড়া সীতারামনের ঘোষণা বলতে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় উপনগরী। যার নাগাল পাওয়া দেশের অধিকাংশ জনসংখ্যার পক্ষে শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও। ফলে এই বাজেট শুধু সীমাবদ্ধতা নয়, চিন্তার দেউলিয়াপনার নথিতে পরিণত হয়েছে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

স্বস্তির সঙ্গেই উদ্বেগ

অনিশ্চয়তার আঁধার থেকে অবশেষে মুক্তির আলো দেখল বাংলাদেশ (Bangladesh)।...

দিল্লির সংযমের সময়

বাংলাদেশের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে সারা দুনিয়া। জাতীয় সংসদের ২৯৯...

অগ্নিপরীক্ষায় বাংলাদেশ

দু’বছর পর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে চলেছে। একইসঙ্গে...

চরিত্রে কালিমা

নৈতিকতা তাদের একচেটিয়া বলে আবহমানকাল দাবি ছিল বামপন্থার। যেকারণে...