অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: শহরের ক্ষুদিরাম বসু লেনে এ যেন আরেক ক্ষুদিরামের লড়াই। তবে এ লড়াই দেশ স্বাধীন করার নয়। স্বাধীন দেশে নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। সব অন্ধকার সরিয়ে ভবিষ্যতে নিজেকে ‘উদয়ন পণ্ডিত’ হিসাবে গড়ে তোলার লড়াই।
টিন ও ত্রিপলের ছাউনি দিয়ে তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘর। ঘরটি নির্মিত ঠাকুরদার আমলে পাট্টা পাওয়া জমির ওপর। ঘরে বৈদ্যুতিক আলো নেই। দিনেরবেলায় টিনের ছাউনির ফাঁকফোকর ভেদ করে আসা সূর্যের আলো আর রাতে টর্চ ও মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটে ভরসা করেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪৫৮ নম্বর পেয়েছে সুমিত রাহা। বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় মোবাইল চার্জ করতে হয় পাশের বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে। এভাবেই অনটনের সংসারে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করছে কালিয়াগঞ্জের (Kaliyaganj) শান্তি কলোনির কিশোর। সুমিতের ইচ্ছে, ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে অশিক্ষার অন্ধকার থেকে মানুষকে আলোর পথচারী করে তুলবে।


সুমিতের বাবা বিমল রাহা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মা সরস্বতী অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন৷ দাদা পরিযায়ী শ্রমিক। কালিয়াগঞ্জ পার্বতীসুন্দরী উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র সুমিতের কথায়, ‘বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। তাই সন্ধ্যাবেলা পাশে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পড়তে বসতাম। বন্ধুরা ও স্কুলের শিক্ষকরা সহযোগিতা করেছে বলেই আজ এই রেজাল্ট করতে পেরেছি। পড়াশোনার খরচ জোগাতে মাঝেমধ্যে ডেকোরেশনের কাজও করি।’
বন্ধু শুভ প্রামাণিক তুলনায় কম নম্বর পেলেও সুমিতের জন্য গর্বিত। একগাল হেসে শুভ বলে, আমার বন্ধু খুব মেধাবী। ওর বাড়িতে বিদ্যুতের আলো নেই। তাই মাধ্যমিকের পর থেকে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় সুমিত আর আমি আমাদের বাড়িতে বসেই একসাথে পড়াশোনা করেছি। আমি চাই বন্ধু জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক।
ছেলের লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত কন্ঠে সরস্বতী বলেন, ‘সময়মতো খাবারটুকু ওর মুখে তুলে দিতে পারিনি৷ তবু খালি পেটে হাসিমুখে আমাদের প্রণাম করে পরীক্ষা দিতে গিয়েছে ছেলে। র্যাশন থেকে পাওয়া কেরোসিন রান্নার কাজেই লেগে যায়। ঘরে আলো জ্বলে না বলে সন্ধ্যা হলেই বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে পড়তে বসত ছেলে।’
সুমিতের রেজাল্টে খুশি মা ও বাবা। কিন্তু এভাবে দারিদ্র্যের বোঝা ঠেলে আর কতদূর ছেলেকে পড়ানো সম্ভব হবে সেটাই এখন তাঁদের দুশ্চিন্তা। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নয় সুমিত। চোয়াল শক্ত করে সে বলে, ‘জীবনযুদ্ধে যখন নেমেছি, এর শেষ দেখে ছাড়ব।’

