ভারতের শ্রম বাজার যে কতটা অনিশ্চয়তায় ভরা তা মে দিবসের আগে এই শ্রমিক বিক্ষোভে পরিষ্কার।
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
নয়ডার শ্রমিক অসন্তোষ, এক জায়গায় আটকে থাকা মজুরি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং নিম্নমানের কাজের পরিবেশের মতো জ্বলন্ত বিষয়গুলি আজকের ভারতে শ্রমিকদের অধিকারের কথা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে৷ এই ঘটনাগুলি এদেশের বহুচর্চিত অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান মডেলের অন্তর্নিহিত গলদগুলিকে সামনে এনে যথেষ্টই উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশছোঁয়া, অন্যদিকে স্বল্প মজুরি থেকে শুরু করে চুক্তিভিত্তিক কাজের অনিশ্চিত ব্যবস্থা ঘিরে শ্রমিকদের জীবনে এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতা দানা বেঁধেছে। নয়ডার এই বিক্ষোভগুলি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং তা ভারতের শ্রম বাজারের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কাঠামোগত সমস্যাগুলিকেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সমগ্র দেশের সামনে তুলে ধরেছে৷
গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি উত্তরপ্রদেশের ‘নিউ ওখলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (নয়ডা)-র শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন কারখানা থেকে শ্রমিকরা দলে দলে বেরিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন। এর নেপথ্যে কোনও পূর্বনির্ধারিত সমন্বিত উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ছিল না। মূলত মালিকপক্ষের বঞ্চনায় সহ্যের সীমা পার হওয়ায় ৮২টি কারখানার অগণিত শ্রমিক একযোগে কাজ বন্ধ করে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট পালন করেন। তাঁদের প্রতিবাদের মূল বিষয় ছিল অমানবিক কাজের শর্ত— সপ্তাহে সাতদিন, দৈনিক ১২ ঘণ্টা করে কাজ করার নিয়ম এবং কারখানার অভ্যন্তরে বিরাজমান অত্যন্ত কঠোর ও অনিরাপদ কর্মপরিবেশ৷ আর এই হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে তাঁরা পেতেন মাত্র ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ টাকার মতো নগণ্য মাসিক বেতন।
অসন্তোষ যে সবসময় কেবল চরম বঞ্চনা দ্বারাই চালিত হয় তা নয়৷ বরং অনেক ক্ষেত্রে সমকক্ষদের সঙ্গে তুলনামূলক অবস্থার ফারাক বা আপেক্ষিক বঞ্চনাবোধ স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে৷ নয়ডার অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে শুধুমাত্র কম মজুরিই দায়ী ছিল না, বরং সংলগ্ন বিভিন্ন অঞ্চলের মজুরির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বৈষম্যই শ্রমিকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভে আগুন জ্বালিয়েছিল। নয়ডার শ্রমিকরা যখন খবর পেলেন যে, প্রতিবেশী হরিয়ানা বা দিল্লিতে কর্মরত তাঁদের সমকক্ষ শ্রমিকরা একই ধরনের কাজের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মজুরি পাচ্ছেন— তখন সেই তথ্য তাঁদের মজুরির সমতার দাবির পালে প্রবল হাওয়া জোগাল।
উদ্ভূত অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে প্রথমদিকে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন অত্যন্ত দমন-পীড়নমূলক নীতি গ্রহণ করে। স্থানীয় ইউনিয়ন নেতাদের গৃহবন্দি এবং গণগ্রেপ্তারের মতো পুলিশি পদক্ষেপ করে প্রশাসন৷ স্বাভাবিকভাবেই এর জন্য রাজ্য সরকার তীব্র সমালোচিত হতে থাকে। প্রবল চাপের মুখে পড়ে পরবর্তীতে রাজ্য সরকার শ্রমিকদের মজুরি সংশোধন করার পথে হাঁটে৷ কিন্তু তখন সিটুর মতো শ্রমিক সংগঠনগুলি সংশোধিত মজুরি বিজ্ঞপ্তিটিকে ‘অবৈজ্ঞানিক’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে৷ তাদের অভিযোগ, সরকার গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি আন্দোলনরত শ্রমিকদের কোনও প্রতিনিধির সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনাই করেনি। পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে, বিজেপি সরকার আইনত বাধ্যতামূলক ‘রাজ্য ন্যূনতম মজুরি পরামর্শ বোর্ড’ গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ন্যূনতম মজুরি সংশোধন করা হয়নি।
এদিকে, শ্রমিক অসন্তোষের এই আবহে আরএসএস-এর সহযোগী সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ (বিএমএস) মজুরি বৈষম্য, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অভাব সংক্রান্ত ‘শ্রমিকদের প্রকৃত উদ্বেগ’-এর কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়েছে। তবে, সারা দেশে একটি অভিন্ন ন্যূনতম মজুরি কাঠামো প্রবর্তনের দাবিকে অবাস্তব আখ্যা দিয়ে তারা এর বিরোধিতাও করেছে৷ তারা ধর্মঘটি শ্রমিকদের ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের’ নিন্দা করলেও, শিল্পমহলকে অবিলম্বে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ও সরকারকে ত্রিপাক্ষিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
নয়ডায় ঘটে যাওয়া শ্রমিকদের অসন্তোষ তথা ভারতের অন্যতম আধুনিক শিল্পকেন্দ্রে এমন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখার পর সেটাকে নিছক ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া কোনওভাবেই উচিত নয়৷ বরং এটাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য করাই শ্রেয়। এই ঘটনার সাময়িক উত্তাপটুকু সরিয়ে নিলে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটা হল এক নিদারুণ সত্য ঃ অর্থনীতি তার তরুণ প্রজন্মকে স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান প্রদানে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেশ কি সত্যিই আগামীদিনে ‘বিকশিত ভারত’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে পারে?
অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে একটি সহজ, অথচ চরম রূঢ় বাস্তবতা— গত এক দশকে শিল্পশ্রমিকদের মজুরি কার্যত অপরিবর্তিতই রয়ে গিয়েছে, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এটি কেবল অর্থনীতির কোনও বিমূর্ত পর্যবেক্ষণ নয়; বরং এটি শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবনে এক চরম দুর্দশা হয়ে ধরা দিয়েছে। যেসব শ্রমিকের মাসিক আয় ১০,০০০ থেকে ১৩,০০০ টাকা, তাঁদের ওই উপার্জনের অর্থ দিয়েই নিজেদের খাদ্য, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে হয়— শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রামের বাড়িতে থাকা পরিবারের ভরণপোষণও জোগাতে হয় ওই নামমাত্র আয় থেকে।
এই প্রেক্ষাপটেই স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে— কর্পোরেট মুনাফার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আদৌ কি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন বা মজুরি দেওয়া হচ্ছে? খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে মজুরি বৃদ্ধি না করা এবং কর্মী নিয়োগের বদলে কর্মী সংকোচনের পথে হাঁটতে গিয়ে আখেরে তা শিল্পের বাজারের জন্যই বুমেরাং হচ্ছে না তো? উপভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমলে বাজারে চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য, সে কথা কি সরকার থেকে শিল্পমহল ভুলে যাচ্ছে? গত বছর (২০২৫) বাজেটের আগে বাজারের চাহিদা নিয়ে নালিশ জানিয়ে শিল্পপতিদের বক্তব্য ছিল, শ্যাম্পু-সাবান থেকে গাড়ি-বাইকের বিক্রি কমে গিয়েছে। অর্থাৎ কেনাকাটার সংকট শুধু উচ্চমহলের গাড়ি বা বিলাস দ্রব্যে সীমাবদ্ধ নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সাবান-শ্যাম্পুতেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে৷
ওই সময় প্রকাশিত আর্থিক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মজুরি বৃদ্ধির হারে তেমন তারতম্য না ঘটলেও কর্পোরেট ক্ষেত্রে মুনাফা রীতিমতো বেড়ে গত ১৫ বছরের শীর্ষে পৌঁছেছে৷ তখন মোদি সরকারের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ বার্তা দেন, শিল্পপতিরা এবার কর্মীদের বেতন বাড়াক। তাহলে কর্মীরাই বেশি করে সংস্থার পণ্য কিনতে সক্ষম হবেন। এই প্রসঙ্গে মনে করানো হয়, ছয়ের দশকে ফোর্ড মোটর কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ফোর্ড তাঁর নিজের সংস্থার গাড়ি বিক্রি বাড়ানোর জন্যই কর্মীদের বেতন বাড়িয়েছিলেন।
তাছাড়া বর্তমান ভারতে সরাসরি মালিকের বদলে ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগ অনাচার আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে৷ নয়ডার শিল্প-শ্রমশক্তির একটি বিশাল অংশ ঠিকাদারদের মাধ্যমে নিযুক্ত। মজুরি, অতিরিক্ত কাজের ভাতা (ওভারটাইম) এবং বোনাস আটকে রাখার দায়ে সম্প্রতি ২০০-এরও বেশি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়— এ ধরনের অনাচার কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।
উদার অর্থনীতিকে আঁকড়ে ধরে নেহরু-ইন্দিরা যুগের অর্থনীতির কার্যত অবসান ঘটিয়ে ফেলা হচ্ছে৷ কিন্তু তাতে সার্বিকভাবে নিয়োগ বৃদ্ধি, মজুরি বৃদ্ধি এবং জীবনযাপনের মানের কতটা উন্নতি হচ্ছে? উৎপাদিত মূল্যে কাঁচামালের উপর উদ্বৃত্ত যেটা থাকে, তা মালিক ও শ্রমিকের অংশ৷ শ্রমিকের সর্বনিম্ন দাবি হল, তাঁর শ্রমের উৎপাদনের খরচটুকু পাওয়া৷ তার উপরে বাড়তি সে কিছুটা আদায় করতে পারে সংগঠিত শক্তির দাবিদাওয়ার জোরে এবং রাষ্ট্রীয় আইনের সুযোগে, যাতে তাদের জীবনযাত্রার মান বাড়ে৷ কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রীয় আইনে শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা কমেছে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলিকে দুর্বল হতে দেখা গিয়েছে৷ বহু ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠন লোপ পেয়েছে৷
ক্রমাগত প্রচার করা হচ্ছে যে— ছাঁটাইয়ের সুযোগ রাখা, চাকরির শর্ত অলিখিত রাখা এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার খর্ব করার মাধ্যমে আরও বেশি নিয়োগ করা সম্ভব, দক্ষ শ্রমিককে আরও বেশি মজুরি দেওয়া সম্ভব৷ কথাটা কতটা সত্যি? কার্যত নিয়োগ বৃদ্ধি হচ্ছে কতটা? সার্বিকভাবে প্রকৃত মজুরি কতটা বাড়ছে? সর্বনিম্ন মজুরি গোটা দেশে কতটা মানা হচ্ছে? বাস্তবে চাকরির অভাবে তো অনেকেই ন্যূনতম মজুরির দাবি না করে উলটে কম বেতনে কাজে যোগ দিচ্ছেন৷ এই পরিস্থিতিতে মে দিবসের কয়েকদিন আগে নয়ডার শ্রমিক অসন্তোষ যেন শ্রমিকের অধিকারের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দাবিকে নতুন করে তুলে ধরল৷
(লেখক সাংবাদিক)



