দীপ সাহা
উত্তরের হাওয়া সবসময় একটু অন্যরকম। একুশের ভোটে যখন দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ সমতল, হুগলি থেকে সুন্দরবন জোড়াফুলের সবুজ ঝড়ে মাতোয়ারা ছিল, ঠিক সেই সময় তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা আর মহানন্দার তীরে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হচ্ছিল এক অন্য রাজনৈতিক আখ্যান। উত্তরের জনতা জনার্দন দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল ভারতীয় জনতা পার্টিকে। ৫৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৩০টিতে জয়ী হয়ে পদ্ম শিবির বুঝিয়ে দিয়েছিল, উত্তরের মনস্তত্ত্ব কলকাতার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনেও সেই গেরুয়া স্রোত অব্যাহত ছিল। আর এবার, ছাব্বিশের বিধানসভার মহাসংগ্রামে উত্তরবঙ্গ যেন এক নতুন ইতিহাস লিখল (North Bengal)।


পাহাড়ে ঘেরা, নদীমাতৃক এই উত্তরের পথে-প্রান্তরে ঘুরে উত্তরবঙ্গ সংবাদ আগেই আভাস দিয়েছিল শাসকের শক্তিক্ষয় হচ্ছে। সেই জায়গায় গেরুয়া আধিপত্য বাড়তে চলেছে। সোমবার ফল ঘোষণার পর সেই সত্যই যেন পাথরে খোদাই করা অক্ষরে ফুটে উঠল। ৫৪টি আসনের মধ্যে ৩৯টি আসনেই জয়ী অথবা এগিয়ে থেকে বিজেপি প্রমাণ করল, উত্তরের মাটিতে তাদের শিকড় কতটা গভীরে।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সাক্ষী থাকল আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলা। এই তিন জেলার মোট ১৭টি বিধানসভা আসনের সবক’টিতেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে গেরুয়া শিবির। তৃণমূল কংগ্রেস এখানে খাতাই খুলতে পারেনি। এই শূন্যতা কেবল সংখ্যার নয়, এটি শাসকদলের প্রতি এক প্রবল জনরোষের বহিঃপ্রকাশ। চা বলয় এবং আদিবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চল বরাবরই অভিমানী। এখানকার মানুষ তাঁদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার জবাব দিয়েছেন নিঃশব্দে। বিদায়ি বিধায়ক তথা মন্ত্রী বুলু চিকবড়াইকের মালের মাটিতে পতন সেই ক্ষোভেরই স্পষ্ট প্রমাণ।
আলিপুরদুয়ারের মাটিতে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকোন্দল যেন উইপোকার মতো দলকে কুরে-কুরে খেয়েছে। সুমন কাঞ্জিলাল, যিনি বিজেপির টিকিটে জিতে পরে ঘাসফুলে নাম লিখিয়েছিলেন, তাঁকে আলিপুরদুয়ারের সাধারণ মানুষ এবং তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। দলবদলুদের প্রতি মানুষের এই অনাস্থা এক নতুন রাজনৈতিক নৈতিকতার জন্ম দিচ্ছে। দলের নেতাদের একাংশের রোষানলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের স্বপ্ন। বিপরীতে, চা বলয়ের পুরোনো, পোড়খাওয়া ও অভিজ্ঞ নেতা মোহন শর্মাকে সেনাপতির মতো ময়দানে নামিয়ে বিজেপি যে নিখুঁত চাল চেলেছিল, তাতেই কিস্তিমাত হয়েছে।
জলপাইগুড়িতেও একই চিত্র, একই ভুল। দলীয় কোন্দল এবং প্রার্থী বাছাইয়ের চরম ব্যর্থতা শাসকদলকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। রাজগঞ্জ আসনে এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেননি। তার উপর বিদায়ি বিধায়ক খগেশ্বর রায়ের বিদ্রোহ আগুনে ঘি ঢেলেছিল। ফলে জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি। উলটোদিকে, পরিবর্তনের এক প্রবল হাওয়া ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে সামান্য ঘাসফুল বাগানকে। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রের লড়াইটি ছিল যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা এক আধুনিক কুরুক্ষেত্র। সেখানে লড়াই ছিল ‘মা’ শিখা চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘ছেলে’ রঞ্জন শীলশর্মার। এই লড়াইয়ের দিকে নজর ছিল গোটা রাজ্যের। কিন্তু রাজনীতির ময়দানে সম্পর্কের আবেগ নয়, শেষ কথা বলে মানুষের রায়। রঞ্জনের ঔদ্ধত্য আর আস্ফালন সাধারণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। সেই শূন্য স্থানে জয়ী হয়েছে মানুষের রাম-আবেগ।
শিলিগুড়ির বুকে বিজেপির শংকর ঘোষের কাছে তৃণমূলের হেভিওয়েট প্রার্থী তথা শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেবের পরাজয় এক মহাকাব্যিক পতন। একুশের নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি ৩৫ হাজার ৫৮৬ ভোটে পিছিয়ে ছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এবার সেই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে শংকর ঘোষের এই জয় বুঝিয়ে দিল, শিলিগুড়ির মানুষের মনস্তত্ত্ব কতটা বদলে গিয়েছে। চলতি বছর রামনবমীর যে ‘জনসুনামি’ শিলিগুড়ির রাস্তায় দেখা গিয়েছিল, তাতেই এই বিপর্যয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। রাজনীতির মারপ্যাঁচে টিকে থাকতে গৌতম দেব গদা হাতে, মাথায় পাগড়ি পরে রাস্তায় নেমে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান তুলেছিলেন। কিন্তু মানুষের মন এত সহজে ভোলে না। কৃত্রিম ভক্তি আর মেকি আবেগ দিয়ে চিঁড়ে ভেজেনি। গৌতম দেব নিজেকে নিজেই ‘শিলিগুড়ির অভিভাবক’ তকমা দিয়ে যে অহংকারের পাহাড় গড়েছিলেন, তা বুমেরাং হয়ে তাঁর উপরেই ভেঙে পড়েছে। তাঁর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, দাম্ভিকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার তাঁকে পর্যুদস্ত করেছে। অন্যদিকে, সমতলের মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি এবং ফাঁসিদেওয়ায় বিজেপি তাদের একুশের আধিপত্য সগৌরবে বজায় রেখেছে। বিদায়ি দুই বিধায়ক আনন্দময় বর্মন ও দুর্গা মুর্মু প্রমাণ করেছেন, মাটির কাছাকাছি থাকলে মানুষ ফেরাতে পারে না।
কোচবিহারের দিনহাটাতেও লেখা হয়েছে পতনের একই আখ্যান। বিদায়ি মন্ত্রী উদয়ন গুহ, যিনি ক্ষমতার অলিন্দে নিজেকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য মনে করতেন, তিনি ১৭ হাজার ৪৪৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হেরে গিয়েছেন বিজেপির অজয় রায়ের কাছে। বিজেপির অন্দরে প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকলেও, ইভিএমের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ সেসব ভুলে গিয়েছে। ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে তৃণমূলে এসে উদয়ন গুহ যেভাবে ক্ষমতার দম্ভ ও আস্ফালন দেখিয়েছিলেন, সাধারণ ভোটাররা নীরবে তার যোগ্য জবাব দিয়েছেন। কোচবিহারে একুশের ভোটে বিজেপি সাতটি এবং তৃণমূল দুটি আসন পেয়েছিল। এবার তৃণমূলের অবস্থা আরও সঙ্গিন। একমাত্র সিতাই আসনটি ছাড়া আর কিছুই তাদের হাতে নেই। সেখানে সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়ার স্ত্রী সংগীতা রায় মাত্র ২ হাজার ৭২১ ভোটের ব্যবধানে সম্মানরক্ষা করেছেন।
পাহাড়ের রাজনীতি বরাবরই ছকভাঙা, রহস্যময় এবং সাধারণ সমীকরণের বাইরে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে যেমন বিপদ, তেমনই রাজনীতির বাঁকেও সেখানে লুকিয়ে থাকে চমক। অতি দ্রুত সেখানে বদলায় রাজনৈতিক সমীকরণ। একুশের ভোটে তৃণমূলের জোটসঙ্গী অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার তিনটি পাহাড়ি আসনের মধ্যে দুটি পেলেও, এবার সবক’টিই বিজেপির ঝুলিতে। পাহাড়ের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে যে, এলাকার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য জিটিএ-তে অনীত থাপাকে তাদের পছন্দ হলেও, বিধানসভা বা জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তারা বিজেপি ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করে না।
পাহাড় ছাড়িয়ে উত্তর দিনাজপুরে ঢুকলে তৃণমূল কংগ্রেস যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ পেয়েছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত চোপড়া, ইসলামপুর, চাকুলিয়া এবং গোয়ালপোখরে শাসকদল তাদের গড় অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। চাকুলিয়া আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী আলি ইমরান রমজ (ভিক্টর) বিশেষ কোনও ম্যাজিক দেখাতে পারেননি, তাঁকে তৃতীয় স্থানে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তবে রায়গঞ্জে দলবদলু কৃষ্ণ কল্যাণীর প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে বিজেপির কৌশিক চৌধুরীর কাছে পরাজয় এক বড় বার্তা। হেমতাবাদের মতো আসনে বিদায়ি মন্ত্রী সত্যজিৎ বর্মন হেরে গিয়েছেন বিজেপির হরিপদ বর্মনের কাছে। কালিয়াগঞ্জ নিজেদের কাছেই রেখেছে গেরুয়া শিবির। করণদিঘি আসনে সিপিএম আশা দেখেছিল। কয়েক হাজার লোক নিয়ে মিছিল করা হাজি সাহাবুদ্দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেলকি দেখালেও, তিনি তিন নম্বরে ছিটকে গিয়েছেন এবং ওই আসনটিও হাসিল করেছে বিজেপি।
দক্ষিণ দিনাজপুরেও বিজেপির দাপট অব্যাহত। ছ’টি আসনের মধ্যে কুশমণ্ডিতে তাপসচন্দ্র রায়, গঙ্গারামপুরে সত্যেন্দ্রনাথ রায়, বালুরঘাটে বিদ্যুৎকুমার রায় এবং তপনে বুধরাই টুডু গেরুয়া নিশান উড়িয়েছেন। হরিরামপুর ও কুমারগঞ্জ আসনে যথাক্রমে বিদায়ি মন্ত্রী বিপ্লব মিত্র ও তোরাফ হোসেন মণ্ডল এগিয়ে থেকে তৃণমূলের মুখরক্ষা করেছেন।
মালদার গল্পটাও এবার অন্যরকম। একুশের বিধানসভায় মালদার ১২টির মধ্যে ৯টিতে জিতেছিল তৃণমূল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় কার্যত একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল ঘাসফুলের। কিন্তু এসআইআর-এর অজানা কোপে সেই বাগানে এবার যেন পোকা ধরেছে। তৃণমূল নেমে এসেছে ছ’টিতে, বাকি ছ’টিতে পদ্ম ফুটেছে। ইংরেজবাজার ও পুরাতন মালদার মতো জোড়া শহরে গেরুয়া পতাকা উড়েছে সদর্পে। রতুয়ায় বর্ষীয়ান নেতা সমর মুখার্জি আবারও জিতেছেন। মোথাবাড়িতে বিপদ আঁচ করে সুজাপুরে লড়েছিলেন তৃণমূলের বিদায়ি মন্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। এসআইআর আবহে শিরোনামে উঠে আসা সুজাপুরে ৬০ হাজার ২৮৭ ভোটে জিতে গিয়েছেন তিনি। মোথাবাড়িতে জিতেছেন তৃণমূলের মহম্মদ নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে পূর্বাভাস মিলিয়ে গাজোল, হবিবপুর, বৈষ্ণবনগর ও মানিকচকে বিজেপি জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। হরিশ্চন্দ্রপুরে দলীয় কোন্দলের চোরাস্রোত সত্ত্বেও জিতেছেন তৃণমূলের মতিবুর রহমান।
রাজনীতি কেবল প্রতিশ্রুতি আর প্রচারের বিষয় নয়। রাজনীতি হল মানুষের সঙ্গে এক নিবিড় আত্মিক সংযোগ। উত্তরবঙ্গের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছেন যে অবজ্ঞা, ঔদ্ধত্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁরা কোনওভাবেই মেনে নেবেন না। দলবদলুদের প্রতি ঘৃণা, দুর্নীতি ও অহংকারের বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লবই এবার উত্তরবঙ্গের রায়।

