দীপ সাহা
‘বঞ্চিত উত্তরবঙ্গ’।


গত কয়েক বছরে উত্তরের রাজনৈতিক আলোচনায় সবথেকে বেশি বোধহয় চর্চা হয়েছে এই শব্দবন্ধ নিয়ে।
একটু পিছনের দিকে ফিরে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়, বামফ্রন্টের সুদীর্ঘ শাসনকাল তো বটেই, এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) জমানাতেও উত্তরবঙ্গ অনেকটা সেই ‘ব্রাত্য আত্মীয়’র মতো থেকে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভাব, বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অভিযোগ আর হাহাকার বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে দার্জিলিংয়ের মেঘে ঢাকা পাহাড়ে, ডুয়ার্সের গিহন জঙ্গলে কিংবা কোচবিহারের এক্কেবারে প্রান্তিক গ্রামগুলোতে। কিন্তু সেই কান্নার শব্দ কলকাতার তৎকালীন রাইটার্স বিল্ডিং বা হালের নবান্নের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের দেওয়াল পর্যন্ত পৌঁছোতে পারেনি। আর তাই একবুক অভিমান জমেছিল তিস্তা, মহানন্দা কিংবা তোর্ষার বুকে। সেই অভিমানই ছাব্বিশে নির্মূল করে ফেলেছে তৃণমূলকে। দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার জেলা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে ঘাসফুল।
উত্তরবঙ্গ আগে থেকেই ছিল বিজেপির শক্ত ঘাঁটি, এক বিস্তীর্ণ পদ্মবন। আর এবারের ভোটে সেই বন আরও নিবিড়, আরও দুর্ভেদ্য হয়েছে। মোট ৫৪টি আসনের মধ্যে ৪০টিতেই সগর্বে ফুটেছে পদ্মফুল। আর তারপরই বঞ্চনার তকমা ঘোচাতে উত্তরের মাটিতে জোরালো হচ্ছে উপমুখ্যমন্ত্রিত্বের (North Bengal Deputy CM) দাবি।
মানচিত্রের দিকে তাকালে উত্তরবঙ্গ বরাবরই যেন এক অবহেলিত অংশ, যাকে দরকার হয় শুধু নির্বাচনের বৈতরণি পার হওয়ার সময় আর বাবুদের ছুটির দিনের অবকাশযাপনে। একটা খুব সাধারণ অথচ তীক্ষ্ণ উদাহরণ দিই। যখন দক্ষিণবঙ্গে, বিশেষ করে কংক্রিটের জঙ্গল কলকাতায় প্রবল তাপপ্রবাহের কারণে স্কুলগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী গরমের ছুটি ঘোষণা করা হত, তখন উত্তরের পাহাড়ে বা তরাই অঞ্চলে হয়তো মনোরম, স্নিগ্ধ আবহাওয়া। কিন্তু ওই যে, কলকাতার বাবুদের তৈরি বিধান মেনেই চলতে হবে গোটা রাজ্যকে! তাই অকারণে উত্তরের স্কুলগুলোর দরজাতেও তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হত। আবার এর ঠিক উলটো চিত্রটাও ছিল সমান বেদনাদায়ক। গতবার যখন পাহাড়ে প্রকৃতির ভয়াল রুদ্ররোষ, প্রবল বৃষ্টি আর ধসের কারণে মানুষের জীবন বিপন্ন, ঠিক সেই সময়েই খোদ কলকাতায় জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপুজোর বিসর্জন কার্নিভাল হয়েছে। রোশনাই আর উৎসবের সেই কোলাহল সেদিন উত্তরের মানুষের বুকের ক্ষতটাকে আরও দগদগে করে তুলেছিল।
উত্তরের মানুষ চাইছেন, দীর্ঘদিনের এই ক্ষত, যন্ত্রণা মুছে যাক। ঘুচে যাক সমস্ত ভেদাভেদ। উত্তরের মাটিতে তৈরি হোক এক অন্য রাজনৈতিক আখ্যান।
কীভাবে হতে পারে তা?
এই মুহূর্তে ১৭টি রাজ্যে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী রয়েছে। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে উপমুখ্যমন্ত্রী পদও রেখেছে বিজেপি। উদ্দেশ্য মূলত দুটো। এক, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। দুই, জাতিগত ও রাজনৈতিক অঙ্ক মেলানো। এই দুটি লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গে উপমুখ্যমন্ত্রী পদটি অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরবঙ্গের মাটিতে রাজবংশী, আদিবাসী, গোর্খা সহ বহু জনজাতি ও ভাষাভাষীর মানুষের বাস। রাজবংশী, কামতাপুরি ভোট এখানে একটা বড় ফ্যাক্টর। এবার সেই ভোটের অধিকাংশই গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। তাই রাজবংশী অঙ্কে উপমুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবি জোরালো হচ্ছে। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা সম্ভব বিজেপির। রাজবংশী মুখ হিসেবে সবার প্রথমেই উঠে আসছে মাথাভাঙ্গা থেকে জয়ী কোচবিহারের প্রাক্তন সাংসদ নিশীথ প্রামাণিকের নাম। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী এবং খোদ অমিত শা’র ডেপুটি থাকায় দিল্লিতে অন্তহীন যোগাযোগ নিশীথের। শা’র গুডবুকেও রয়েছেন তিনি। তাই উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি তাঁকে বেছে নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আবার শিলিগুড়ি থেকে পরপর দু’বার জয়ী শংকর ঘোষও আছেন দৌড়ে। এতদিন বিধানসভার মুখ্যসচেতক পদে থাকা শংকর যথেষ্ট গুরুত্ব পান রাজ্য নেতাদের কাছে। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা অবশ্য এখনই উপমুখ্যমন্ত্রী পদ নিয়ে কিছু বলতে চাইছেন না। কিন্তু উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিক মন্ত্রী হতে পারে সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু শুধু মন্ত্রিত্বে এবার আর চিঁড়ে ভেজার নয়।
কারণ বাম ও তৃণমূল- দুই আমলেই উত্তরবঙ্গ থেকে একাধিকজন মন্ত্রী হয়েছেন। তৃণমূলের শেষ টার্মেও উদয়ন গুহ, বুলু চিকবড়াইক, সত্যজিৎ বর্মন, গোলাম রব্বানি, সাবিনা ইয়াসমিন সহ অনেকেই মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু অধিকাংশই দলনেত্রী এবং কলকাতার নেতাদের রোষানলে পড়ার ভয়ে কোনও বিষয় নিয়ে নিজেদের স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে পারেননি। হয়ে থেকেছেন কাঠের পুতুল। ফলে উত্তরের রাজবংশী, গোর্খা বা আদিবাসীদের মনে বঞ্চনার অভিমান জমেছে একটু একটু করে। আর বিরোধী আসনে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি খুব সুকৌশলে এবং ধারাবাহিকভাবে মানুষের সেই মনের ভাষা পড়তে পেরেছে। তারাও বারবার বঞ্চনার তত্ত্বে শান দিয়েছে, উত্তরের মানুষকে বুঝিয়েছে যে, তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে কীভাবে তাদের দশকের পর দশক বঞ্চিত করে রাখা হচ্ছে। ফলে বিজেপিও এবার সেই একই ভুল করলে পস্তাতে হতে পারে আগামীতে।
পনেরো বছরের তৃণমূল শাসন হটিয়ে ২০৭ আসনে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছে বিজেপি। কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা এখন টপ সিক্রেট। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরপর দুটো টার্মে দুই আসনে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারীই মুখ্যমন্ত্রী পদের মূল দাবিদার। কিন্তু বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও জল্পনা জিইয়ে রেখেছে। তবে, দলের অন্দরে মন্ত্রিত্ব নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। উত্তরবঙ্গেও তা নিয়ে জোর জল্পনা।
এবারের ভোটে সবথেকে বেশি মার্জিনে জয় পেয়েছেন মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিজেপি (BJP) প্রার্থী আনন্দময় বর্মন। ১ লক্ষ ৪ হাজার ২৬৫ ভোটে তিনি পরাস্ত করেছেন তৃণমূল প্রার্থী শংকর মালাকারকে। এই বিপুল জয়ের জন্য তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করতে পারে বিজেপি। আবার দ্বিতীয় রেকর্ড মার্জিনে (৯৭,৭১৫) জয় পেয়েছেন ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির শিখা চট্টোপাধ্যায়। এঁরা দুজনেই দু’বারের বিধায়ক। ফলে শিকে ছিঁড়তে পারে যে কারও। মহিলা মুখ হিসেবে নাম উঠে আসছে কোচবিহারের লড়াকু নেত্রী মালতী রাভা রায়েরও।
আদিবাসী অঙ্কে মন্ত্রিত্বের দৌড়ে রয়েছেন ফাঁসিদেওয়ার বিধায়ক দুর্গা মুর্মু ও মালের শুক্রা মুন্ডাও। কালিম্পং আসনে জয়ী ভরত ছেত্রীও অন্যতম মুখ। ভারতীয় হকি দলের এই প্রাক্তন সদস্যকে ক্রীড়ামন্ত্রী করার দাবি উঠেছে দলেরই অন্দরে। শংকরকে অনেকেই চাইছেন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে। এসবই অবশ্য দাবি। শেষমেশ কার কার ভাগ্যে মন্ত্রিত্বের শিকে ছিঁড়বে, তা তো সময়ই বলবে। কিন্তু উত্তরের কাউকে উপমুখ্যমন্ত্রী করে বিজেপি চমক দিলে, সেটাই হবে ‘উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত’ তকমা ঘোচানোর প্রথম ধাপ। শমীক ভট্টাচার্য, সুনীল বনসল, ভূপেন্দ্র যাদব এবং সর্বোপরি অমিত শা, নরেন্দ্র মোদিরা এটা যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই মঙ্গল।

