গৌতম সরকার
ভয়ের ভোট! হাজারো ভয়! কারচুপি, রিগিং, ছাপ্পা…। ঘাড়ের ওপর হিংসা, অশান্তি। এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচনকে ঘেঁটে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির সম্ভাবনা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে ভেদাভেদের ভয়। পারস্পরিক অবিশ্বাস কিংবা পাশের পাড়া, পাশের বাড়িকে শত্রু ঠাওরানোর ভয়ও কম নয়। এছাড়া আছে প্রতিপক্ষ দলকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা। শুধু ধর্মে-ধর্মে নয়, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষের ছায়াতেও ভয়ের আভাস।
ঘৃণা এখন সবকিছু ছাপিয়ে। সমাজের আনাচে-কানাচে। ঘৃণাকে আরও ছড়িয়ে দিচ্ছে ভোট। তার প্রভাব এমনই যে, বাংলায় প্রচুর মানুষ ঘৃণা বুকে বাঁচতে চাইছেন। নির্বাচন শেষে কেউ হয়তো জিতবে। কেউ সরকার গঠন করবে। কিন্তু ভোটের আড়ালে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণাকে নিরস্ত করার সামর্থ্য কারও থাকবে না। সরকারের শক্তি পুলিশ, আইন। কিন্তু মানুষের মনের ঘৃণাকে কোনও ফৌজদারি দণ্ডবিধি দিয়ে আটকানো অসম্ভব যে। সদিচ্ছা থাকলেও।
আটের দশকে গোর্খাল্যান্ড ও নয়ের দশকে কামতাপুর আন্দোলন ভাঙতে বলপ্রয়োগ করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। পাহাড় সেই যে বামেদের থেকে মুখ ফিরিয়েছে তখন, আর ঘুরে তাকায়নি। পাহাড়কে পুরোপুরি স্থিতিশীলও করা যায়নি। বরং পাহাড়-সমতলের দ্বন্দ্ব থেকে গিয়েছে। স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের টোপ ঝুলিয়ে বিজেপি কার্যত সেই দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করে পাহাড়ের ভোট আদায় করেছে। এবারও যার ব্যতিক্রম নয়।
গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্ন কোনওদিন পূরণ হবে কি না পরের কথা, কিন্তু সমতলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব উৎসাহিত হচ্ছে। ক’দিন আগে কালচিনি, মাদারিহাট, বীরপাড়া, মাল, নাগরাকাটা, মেটেলি ইত্যাদি এলাকায় দেখে এসেছি আদিবাসী ও নেপালি দ্বন্দ্ব। মাদারিহাটে প্রার্থী নেপালি বলে একের পর এক চা বাগানে বিজেপি সমর্থক আদিবাসীরা বেঁকে বসেছেন। হান্টাপাড়া, তুলসীপাড়া, ধুমচিপাড়া ইত্যাদি বাগানে প্রচার চলছে, নেপালি বিধায়ক হলে আদিবাসীরা কোণঠাসা হবেন। এই ভেদাভেদ মেটানো কার সাধ্য বলুন।
ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বহু মুসলিম। বিভিন্ন জেলায়। তাদের একাংশের ক্ষোভ, অসন্তোষ থেকে ঘৃণা ভাসছে বাতাসে। ভোটার তালিকা থেকে বাতিলরা নির্বাচনের দিন পথ অবরোধ বা বিক্ষোভে শামিল হতে পারেন বলে শুনে এলাম। তাতেও বিদ্বেষের বাতাবরণ তৈরির আশঙ্কা প্রবল। পুলিশ বা আধাসেনা সেই বিক্ষোভ বা অবরোধের মোকাবিলা করবে নিশ্চয়ই। কিন্তু ঘৃণা নিরসনের সাধ্য কারও হবে না।
বরং রাষ্ট্র নিপীড়নকে অস্ত্র করলে ঘৃণা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ে। যার উদাহরণ অতীতের কামতাপুর ও গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন। ওই দুই আন্দোলনকে বামফ্রন্ট সরকার দমনপীড়নে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল। কিন্তু কামতাপুরি ও গোর্খা জনগোষ্ঠীর মন থেকে অসন্তোষের আগুন নেভানো যায়নি। চলতি শতকের প্রথম দশকে গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনকেও দমনের চেষ্টা হয়। তাতে সংগঠন ছত্রভঙ্গ হলেও সরকারের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস ভেঙে গিয়েছিল।
নেতাদের কিছু পদ ও সুযোগ দিয়ে কাছে টানতে তৃণমূল সরকারের চেষ্টা ইতিমধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। বরং অবিশ্বাসের ক্ষত খুঁচিয়ে রাজবংশী ভোটে হানা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ভাবনা। গাছের বীজ একবার পোঁতা হলে তা চারদিেক ছড়িয়ে পড়ে। সন্দেহের বীজও তাই। গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনের এখন নানা গোষ্ঠী। বিজেপি সাংসদ নগেন রায়ের গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ একজন তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন শীতলকুচিতে। অন্যদিকে, সিতাই ও নাটাবাড়িতে বিজেপির টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন বংশীবদন বর্মনের দুই অনুগামী।
এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এমন বিবাদ যে, তারা পরস্পরকে ভোট দিতে নারাজ। ভিন্ন ভিন্ন দল বা জনগোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন, তেমনই আলাদা আলাদা জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে ঘৃণার ব্যাপকতা কম নয়। রাজনৈতিক, সামাজিক ইন্ধনে একই গোষ্ঠীর মধ্যে আবার নানা ভাগ, যা বিদ্বেষকে অক্সিজেন জোগাচ্ছে। রাজনৈতিক স্বার্থ এই ধরনের বিদ্বেষকে উৎসাহিত করছে। বিধানসভা ভোটে মানুষের মন বুঝতে বেরিয়েছিলাম কয়েকদিন। ফিরে এসেছি ঘৃণার নানা চেহারা দেখে। শিউরেও উঠেছি।
সিপিএম একসময় একধরনের পার্টি সমাজ তৈরি করেছিল। শহরে, গ্রামে, পাড়ায়, চা বাগানে। সেই সমাজের প্রভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হত। স্থানীয় বিবাদ, গণ্ডগোল ইত্যাদিতে যেমন সেই সমাজের কথা ছিল চূড়ান্ত, তেমনই ওই পার্টি সোসাইটি সামাজিক ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করত। তাতে সম্প্রীতির অন্তত একটি প্রকাশ্য বাতাবরণ থাকত। যাকে নষ্ট করার সাহস পেত না কেউ সহজে।
নীরবে গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ আরেক ধরনের সোসাইটি তৈরি করে ফেলেছে। কোথাও সোজাসুজি শাখার মাধ্যমে, কোথাও স্বনির্ভরতার নানা কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, এমনকি কোথাও পুজোপাঠ বা কীর্তনের আড়ালে। সেই কর্মযজ্ঞগুলির উদ্দেশ্য সবই একমুখী। তাতে বহুত্ববাদের বার্তা নেই। সহাবস্থানের প্রসঙ্গ নেই। বরং হিন্দুত্বের একছাতার তলায় সেইসব কর্মসূচি একধরনের বিভেদ তৈরি করছে সমাজে।
নির্বাচন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ঘৃণার বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম ঠেকানোর কোনও মন্ত্র কারও জানা আছে বলে মনে হচ্ছে না। ভোটে অশান্তি হতে পারে। ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসও হতে পারে। সেসব একসময় ফিকে হয়ে যায়। কিন্তু বিদ্বেষের ছায়া দীর্ঘতর হতে থাকলে সহাবস্থান নয়, সংঘাত হবে চিরস্থায়ী। পাঁচদিন বিভিন্ন জেলায় ঘুরে সেই ভয় নিয়ে ফিরে এসেছি। সুস্থ চেতনাই পারে এই ভয় দূর করতে। সেই চেতনার আশায় কতদিন থাকতে হবে, কে জানে!



