শোষণের আদর্শ ভূখণ্ড উত্তরবঙ্গ

শেষ আপডেট:

শুভঙ্কর চক্রবর্তী

শীতের শেষে ডানাওয়ালা পরিযায়ীরা ফিরে গিয়েছে। উত্তরে এখন দু’পেয়ে পরিযায়ীদের আনাগোনা বাড়ছে। চপারের কান ফাটানো আওয়াজ আর ধুলোর ঝড় জানান দিচ্ছে, কলকাতা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার থেকে ডুয়ার্সের রুক্ষ মাটি আর দার্জিলিংয়ের কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ে উন্নয়নের পসরা সাজিয়ে নেমে পড়েছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী। ডানাওয়ালাদের মতো প্রতিবছর নয়, দু’পেয়ে পরিযায়ীদের উত্তরের মাঠেঘাটে দেখা যায় পাঁচ বছর পরপর। তাঁদের হাতে থাকে জাদুদণ্ড, থুড়ি, ঝকঝকে ইস্তাহার। চিত্রনাট্য সেই একই, অভিনেতারাও চেনা, শুধু ক্যালেন্ডারের পাতাটা ২০২১ থেকে ঘুরে ২০২৬-এ এসে দাঁড়িয়েছে। তিস্তার মতো শান্ত ও ঋজু উত্তরবঙ্গবাসী এই রাজনৈতিক সার্কাস দেখেন আর ক্লান্ত হয়ে হাসেন। তাঁরা জানেন, ‘বঞ্চিত উত্তরবঙ্গ’-এর প্রতি এই হঠাৎ উথলে ওঠা প্রেম আসলে ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল মাত্র।

‘শেষ হিসাব’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সন্ধ্যা হয়ে এল এবার/ সময় হল হিসাব নেবার’। হিসেবের খাতা খুলে ২০২১ সালের সেই মহাযুদ্ধের মঞ্চে ফিরে যাওয়া যাক। সে এক অভাবনীয় বাগযুদ্ধ! উত্তরবঙ্গ তখন শাসক-বিরোধী উভয়পক্ষের কাছেই পাখির চোখ। কলকাতা ও দিল্লির নেতারা মঞ্চ কাঁপিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উত্তরবঙ্গে এইমস, সেনাবাহিনীতে পৃথক নারায়ণী ব্যাটালিয়ন, আইআইটি, চা শ্রমিকদের জন্য পাট্টা, পাহাড় সমস্যার স্থায়ী সমাধান, মেখলিগঞ্জের তিস্তা চরে রাজ্যের সবচেয়ে বড় শিল্পতালুক, কোচবিহার, বালুরঘাট ও মালদায় বিমানবন্দর চালু, বন্ধ চা বাগান খোলা, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি, কৃষিতে বিপ্লব, গঙ্গাভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে দশকের পর দশক ধরে চলা উত্তরের বঞ্চনার চিরতরে অবসান ঘটানোর শপথ নিয়েছিলেন শাসক, বিরোধী সব দলের নেতারাই। সোনার বাংলার সঙ্গে সঙ্গে সোনার উত্তরবঙ্গ গড়ার ঘোষণা হয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবে কী ঘটল পাঁচ বছরে? যে শ্রমিকদের রক্তজল করা শ্রমে বিশ্বখ্যাত চা তৈরি হয়, তাঁদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি প্রদানের। ন্যূনতম মজুরি দূরের কথা, উত্তরের চা শিল্প বর্তমানে আইসিইউ-তে। শ্রমিকরা কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছেন। চা নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য কোনও শাসকেরই মাথাব্যথা নেই৷ পাহাড়ের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। গোর্খাদের জন্য ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর মুলোটি ২০২১ সালেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ঝোলানো হয়েছিল। পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পর, পাহাড়বাসী আজও অভিধানে ‘সমাধান’-এর সংজ্ঞা খুঁজছেন।

গত পাঁচ বছরে উত্তরের শিল্প নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনও কাজই হয়নি। কোচবিহারের চকচকা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। আলিপুরদুয়ারের দুই শিল্পতালুকের সীমানা প্রাচীর ছাড়া আজও আর কিছুই হয়নি। জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়িতে কিছু ছোট ছোট কারখানা হলেও তা স্থানীয় কর্মসংস্থানের মানচিত্রে হেরফের করার মতো নয়। পাহাড়ে শিল্প গড়ে বিনিয়োগের বড় বড় কথা বলা বেলুন চুপসে গিয়েছে। সম্ভাবনা থাকলেও দুই দিনাজপুরে বিনিয়োগ টানার কাজে সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলো বড় বড় গোল্লা পেয়েছে। মালদার অবস্থাও তথৈবচ। প্রচুর সম্ভাবনাময় মাখনা নিয়ে ভাবার সময় পাননি নেতারা। শিল্পের নামে গত পাঁচ বছরে এখানে শুধু গড়ে উঠেছে শাসক ও বিরোধীদের দলীয় কার্যালয় আর সিন্ডিকেটরাজ।

স্বাস্থ্যের বিষয়ে উত্তরবঙ্গবাসী চলছেন মূলত ভগবান ভরসায়। কঠিন রোগের কথা না হয় বাদই দিলাম, সাধারণ অসুখেও রোগী বাঁচবে কি মরবে তা ঠিক করে ভাগ্যরেখা। রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসকদল, উভয়পক্ষের প্রতিশ্রুত নারায়ণী ব্যাটালিয়ন শেষমেশ রাজ্য পুলিশের একটি বাহিনী তৈরির মধ্যেই আটকে গিয়েছে, যা রাজবংশী সম্প্রদায়ের বৃহত্তর আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করতে পারেনি। উত্তরবঙ্গের যে যুবসমাজকে লক্ষ লক্ষ চাকরি আর তথ্যপ্রযুক্তি হাবের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তারা আজও নিজেদের ছেঁড়া ব্যাগ গুছিয়ে ভিনরাজ্যে যাওয়ার ট্রেনে ভিড় জমাচ্ছে দিনমজুরের কাজ করতে। আজ উত্তরবঙ্গ থেকে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় সস্তা শ্রমিক। কোভিডের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফেরার পরামর্শ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, নিজের জেলাতেই শ্রমিকদের কাজের বন্দোবস্ত করবেন। সেই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। তিস্তার পাড় ভাঙার মতো নেতাদের নৈতিকতা ভাঙার এই চরম প্রহসনের শিকার উত্তরের বাসিন্দারা। রাজবংশী স্কুলের নামে রাজবংশী ভাষায় পঠনপাঠনের ভাঁওতাও তাঁর অন্যতম উদাহরণ।

২০২৬ সালের ভোট দুয়ারে কড়া নাড়তেই পুরোনো ইস্তাহারগুলোর ধুলো ঝাড়া হচ্ছে। চতুর বক্তৃতা-লেখকরা কেবল কম্পিউটারে সালগুলো পরিবর্তন করে দিয়েছেন। পুরোনো কাসুন্দি অতি সন্তর্পণে নতুন, ঝকঝকে বোতলে ভরে উন্নয়নের অমৃতসুধা বলে ফেরি করা হচ্ছে। পাটভাঙা শাড়ি বা ইস্ত্রি করা কুর্তা আর গালভরা হাসি নিয়ে নেতা-নেত্রীরা আবার হাজির। এ এক অদ্ভুত ভ্রান্তিবিলাস, যেখানে ঠকছেন কেবল সেই সাধারণ ভোটাররা। আসলে সুজলা, সুফলা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এই অঞ্চলকে শোষণের আদর্শ ভূখণ্ডে পরিণত করা হয়েছে।

প্রতিশ্রুতির ডালি আর রাজনৈতিক কোলাহলের মাঝে উত্তরবঙ্গ ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সে পাঁচ বছর আগে ছিল। পর্যটন আর ভোটব্যাংকের রাজনীতির জন্য উত্তরবঙ্গ এক নিখুঁত ছবিওয়ালা পোস্ট কার্ড মাত্র। প্রকৃত ক্ষমতায়নের বেলায় সে আজও ব্রাত্য। ইভিএম সিল হয়ে গেলেই নেতারা আবার ফিরে যাবেন মহানগরের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দুর্গে। চপারের আওয়াজ থেমে যাবে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রতিশ্রুতিগুলো আবার দীর্ঘ শীতঘুমে চলে যাবে। এমনটা ধরেই নেওয়া হয়েছে, উত্তরবঙ্গের মানুষ কাঞ্চনজঙ্ঘার মতোই এক অটল ধৈর্য নিয়ে বেঁচে থাকবেন। তাঁরা এই বঞ্চনা সইবেন আর প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ঝকঝকে ইস্তাহারে মুড়ে তাঁদের দিকে ছুড়ে দেওয়া গণতন্ত্রের এই নিদারুণ উপহাস দেখেও শান্ত হয়ে ভোট দেবেন। তবে নেতারা ভুলে গিয়েছেন, অবিভক্ত বঙ্গে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের স্ফুলিঙ্গটি প্রথম উত্তরবঙ্গের ভূখণ্ডে বিচ্ছুরিত হয়েছিল। সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, কৈবর্ত বিদ্রোহের রাস্তায় হেঁটে তা তেভাগা, নকশালবাড়ি বিদ্রোহে এসে পৌঁছেছিল।

একশো বছরেরও বেশি সময় আগে ‘কাজের লোক’-এর বর্ণনা দিয়েছিলেন সুকুমার রায়। লিখেছিলেন, ‘বাঃ আমার নাম বাঃ, বসে থাকি তোফা তুলে পায়ের উপর পা!’ গত পাঁচ বছরে উত্তরের বঞ্চনা ঘোচানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া নেতাগুলোর প্রায় সকলেই আদতে কবির সেই ‘কাজের লোক’।

Categories
Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

যে হাতে ক্ষমতা, সেই হাতে বন্দি বঙ্গ বিবেক

রূপায়ণ ভট্টাচার্য পঁচিশে বৈশাখ। সদ্য প্রাক্তন হয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা...

জটিল অর্থনীতি, সহজ পাঠ মোদির 

অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত সোনার গয়না কেনা বা নিজের গাড়িতে চেপে প্রতিদিন অফিসে...

রং পালটে ক্ষমতার কাছে ফেরার মরিয়া চেষ্টা

দীপ সাহা শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, কখনও বা সঙ্গিনীর নজরে...

তৃণমূলিকরণ ঠেকানো কি আদৌ সম্ভব শমীকের?

গৌতম সরকার গৈরিকীকরণ স্বাভাবিক। কিন্তু দুয়ারে বিপদ তৃণমূলিকরণের! বিজেপির জন্য...