গৌতম সরকার
ভোট কাহারে কয়! সে যে কেবলই ক্ষমতাময়…! ভোট মানে ক্ষমতার গন্ধ। শাসকের গদির হাতছানি। যে আশার ছলনে ভোটের পিছনে শুধু ছুট…ছুট! মন্ত্রী, এমএলএ, এমপি হওয়ার সাধ। শাসকের ঘনিষ্ঠে থাকার অহং। লালবাতি, নীলবাতির গাড়িতে আসক্তি। এসব কারণে ভোটের দৌড় হয়ে ওঠে ম্যারাথন। পিছনে পড়ে থাকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পৃথক রাজ্যের দাবি, ভাষার স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা।
শাসকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকার বাসনায় নরেন্দ্র মোদির সভামঞ্চে বসে ছিলেন নগেন রায় ও বংশীবদন বর্মন। কিছুটা দূরত্ব রেখে দুজনে বসলেও আপাতত নিজেদের বিবাদ শিকেয় তুলে রেখেছেন তাঁরা। নগেন রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন বিজেপির দাক্ষিণ্যে। অনুগ্রহ পেতে এখন মরিয়া বংশীবদন। তিনি ইতিমধ্যে তাঁর অনুগামীদের সন্তুষ্ট রাখতে দুটি কেন্দ্রের পদ্ম প্রতীকে টিকিট জোগাড় করে ফেলেছেন। সংগঠনগত স্লোগান জয় শিবচণ্ডী ফেলে এরপর হয়তো জয় শ্রীরাম বলবেন।
সুবাস ঘিসিংকে একসময় পাহাড়ছাড়া করেছিল গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। এখন ক্ষমতার প্রসাদের হাতছানিতে ঘিসিংয়ের দল জিএনএলএফ ও মোর্চা একই বৃত্তে। বিজেপির অনুগ্রহপ্রার্থী উভয় দল। নগেন, বংশী, বিমল গুরুং, মন ঘিসিং- সকলে গেরুয়া আচ্ছাদনে নিজেদের মুড়ছেন। উলটো শিবিরে অনীত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা পাহাড়ে সুশাসনের কথা বলে তৃণমূল সরকারের ছত্রছায়ায় নির্বিবাদে ক্ষমতার ক্ষীর খাচ্ছে।
স্বঘোষিত মহারাজ নগেনের আবার দুই নৌকায় পা। তাঁর ঘনিষ্ঠ হরিহর দাসকে আগে রাজবংশী অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান করেছিল তৃণমূল সরকার। এবার তিনি শীতলকুচিতে তৃণমূল প্রার্থী। তৃণমূল সরকারের কাছ থেকে বঙ্গবিভূষণ সম্মান নিয়েছেন নগেন। গাছের খান, তলারও কুড়োন। বিজেপির দাবি, আমাদের লোক। তৃণমূল মুখ টিপে হাসে। আর তিনি মহারাজকীয় মেজাজে নিজের অভিসন্ধি রহস্যে ঢেকে রাখেন।
উত্তরবঙ্গে প্রায় সব জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা সংগঠন। অধিকাংশ সংগঠনের দাবি, আলাদা রাজ্য বা স্বগোত্রীয় কিছু। সংবিধানের অষ্টম তফশিলে ভাষার স্বীকৃতি, জনজাতির অধিকার ইত্যাদি। ক্ষমতার দৌড়ে এখন সেসব ফিকে। ভোটে লড়ছে কামতাপুর স্টেট ডিমান্ড কাউন্সিলও (কেএসডিসি)। যে সংগঠনের সঙ্গে কেএলও প্রধান জীবন সিংহের ওঠা-বসা। সেই কাউন্সিলের সঙ্গে তিনি দিল্লি যান কেন্দ্রের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে।কেএলও-র স্বপ্নের আলাদা কামতাপুর রাষ্ট্র কবেই উবে গিয়েছে। কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় পৃথক রাজ্যের দাবিও এখন ফিকে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেই মেনে নিতে রাজি অতীতের কামতাপুরি জঙ্গিরা। কিন্তু সেই দিল্লি কা লাড্ডু কবে মিলবে, সেটাও অনিশ্চিত। দিল্লির শাসকরা সব জনগোষ্ঠীকে আশ্বাস দেয়। পাহাড়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের আশ্বাস, কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি। ভাষা, সংস্কৃতি রক্ষায় নানা কথা।
বাস্তবে সব লাড্ডু অধরা। বরং সমস্ত জনগোষ্ঠীগত সংগঠনের আত্মীকরণ ঘটছে গেরুয়া রাজনীতিতে। হিন্দুত্বের বড় ছাতার তলায় গোর্খা, নেপালি, কামতাপুরি, রাজবংশী, আদিবাসী- সকলকে একদেহে লীন করার কৌশলী চেষ্টা ইতিমধ্যে অনেকটা সফল। এই কৌশলে আলাদা রাজ্য বা ভাষার স্বীকৃতির দাবি ভুলে কেউ ছুটবেন এমপি বা এমএলএ হওয়ার তাগিদে। কারও দৌড় শুধু নেতাসুলভ মেজাজে নিদেনপক্ষে লালবাতি গাড়ি পাওয়ার লক্ষ্যে।
যাঁরা এখন পদ্মের ভিকট্রি স্ট্যান্ডে ওঠার জন্য ছুটছেন, তাঁদের অনেকে অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগ্রহও পেয়েছেন। বিমল গুরুং, প্রয়াত অতুল রায়, বংশীবদন বর্মন, বিরসা তিরকি, তেজকুমার টপ্পো- কে নেই সেই তালিকায়। মমতা অবশ্য প্রথমেই নটে গাছটি মুড়িয়ে রেখেছিলেন। তাঁর সাফ কথা ছিল, যাই করো বাপু, আলাদা রাজ্যের কথা ভুলেও উচ্চারণ কোরো না। পৃথক রাজ্য নৈব নৈব চ।
বদলে গুচ্ছ গুচ্ছ অ্যাকাডেমি, উন্নয়ন পর্ষদ, সাংস্কৃতিক পর্ষদ গড়ে কোটি কোটি টাকা বিলিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। ব্যাপক দুর্নীতি, তছরুপের সুবিধা দিয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নেতাদের মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে দিয়েছেন। আন্দোলন করার মানসিকতা, শক্তি- সবই মুড়িয়ে নির্বিষ করে দিয়েছেন। সেই কাজটা এখন করছে বিজেপি। তবে অন্য মোড়কে। যার যা দাবি, সেটাকে প্রথমে উৎসাহিত করছে। তারপর দাবিপূরণে কেন্দ্র টালবাহানা করলেও জনগোষ্ঠীর নেতাদের আর ফোঁস করার শক্তি থাকছে না।
পাহাড়ে গুরুংদের একটি আসনের (দার্জিলিং) ললিপপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘিসিংদের তাও দেওয়া হয়নি। কিন্তু জিএনএলএফ বা সিপিআরএম-এর আর বিজেপিকে সমর্থন করা ছাড়া গতি নেই। পদ্ম শিবিরে এমনভাবে টিকি বাঁধা হয়ে গিয়েছে যে নড়নচড়ন শিবেরও অসাধ্য। দুই আসনে টিকিটের বিনিময়ে বংশীবদনরাও বৃহৎ পদ্ম পরিবারের সদস্য হয়ে গেলেন। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের অস্তিত্ব রাখা কঠিন। নগেন এখনও গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন বজায় রেখেছেন বটে। মমতার কাছে পুরস্কার ও একটি কেন্দ্রে টিকিট নিলেও পদ্মের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে পারছেন না অন্তত প্রকাশ্যে। কোথাও যেন বাঁধা পড়ে গিয়েছেন। বিজেপি এভাবে জনগোষ্ঠীগুলিকে বেঁধে ফেলে একের পর এক আলাদা রাজ্যের দাবিকে নির্বিষ করে দিচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোঁস করলেও পদ্ম-পরশে ছোবল দেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছেন জনগোষ্ঠীর নেতারা। কেন্দ্রীয় সরকারের আতিথেয়তার ফাটা বাঁশে আটকে থেকে দরকষাকষির ক্ষমতা ক্রমে কমছে কেএলও-র একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ জঙ্গি নেতা জীবন সিংহেরও। বিজেপির এক ঢিলে মরছে অনেক পাখি। একদিকে জনগোষ্ঠীগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ধামাচাপা পড়ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতার পরশ পাওয়ার তাড়নায় নেতাদের নির্বিষ করে দেওয়া যাচ্ছে। তৃতীয়ত, পৃথক ধর্মাচরণ ও লোকাচার থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠীকে হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনার কাজ চলছে জোরকদমে। যা সংঘের বৃহত্তর পরিকল্পনার মধ্যে ছিল।



