জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা: নির্মীয়মাণ বহুতলটি বহুদূর থেকে দেখা যায়। মরশুমি ফল বিক্রেতা নব ঘোষের দোকানে বসে গুনে গুনে ভানু সাহা বললেন, ছ’তলা হয়েছে। আরও দুটো তলা উঠবে। স্বপন মণ্ডল ফুট কাটলেন, আটতলার অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু পুরসভার নেই। শুনে গলায় ঝাঁঝ ভানুর। বললেন, ‘আরে ভাই, টাকায় সব হয়। জলাজমি ভরাট করে বহুতল হয়। পুরাতন মালদা (Old Malda) শহরে কোন কাজটা আইন মেনে হয় শুনি?’
বাস্তবে জমি মাফিয়া আর প্রোমোটাররাজ মালদার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাদের মদতে এসব চলে, তা সবার জানা। ভানু বলছিলেন, ভাগ চলে যায় সব প্রভাবশালীর পকেটে।’ পুরাতন মালদা শহরের হৃৎপিণ্ড মঙ্গলবাড়ি চৌরঙ্গি মোড়ের আড্ডায় সবাই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন পুরসভার প্রতি। জমি মাফিয়া ও প্রোমোটাররাজের যুগলবন্দিতে গত এক দশকে ভোলই পালটে গিয়েছে শহরটার।
সবুজ গাছপালা বলে আর কিছু নেই। পুরো শহরটা এখন কংক্রিটে মোড়া। রোজই নির্বিচারে চলছে সবুজ নিধন। শহরের প্রায় সব জলাশয়ই বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। রেহাই দেওয়া হয়নি ছোট পুকুরগুলোকেও। আধুনিক শহর গড়ার অজুহাতের এই বেআইনি কর্মযজ্ঞে আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতারাও। বাতাসে ভাসে, এতে নাকি দলের ভেদ নেই। সব দলের কাউন্সিলারদের নাকি চরম বোঝাপড়া।
মালদার বিধায়ক বিজেপির গোপালচন্দ্র সাহা। কিন্তু তাঁকে কেউ কোনওদিন পুর বোর্ডের বিরোধিতা করে আন্দোলন করতে দেখেননি। পুরাতন মালদা শহরের বাইরে মালদা বিধানসভা কেন্দ্রের ৬টি গ্রাম পঞ্চায়েত। তার মধ্যে হবিবপুর ব্লকের ৩টি, ইংরেজবাজারের ১টি। তৃণমূল (TMC) আমলে ১০০ দিনের কাজ সহ নানা প্রকল্পে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে সন্দেহ নেই।
তবে এখনও বহু রাস্তা বাকি। প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎও পৌঁছেছে। কিন্তু কর্মসংস্থান বলে কিছু নেই। চাষাবাদের পরিকাঠামো উন্নয়নে কোনও উদ্যোগ নেই। মহিষবাথানির অমল কিসকু কথায় কথায় বললেন, তৃণমূল নেতারা বাড়িতে এসে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, স্বাস্থ্যসাথী ইত্যাদি মনে করিয়ে ভোট চাইছেন। বিজেপি নেতারা বলছেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে অনুদান ডাবল হবে। কিন্তু কেউ চাকরি কিংবা কর্মসংস্থানের কথা বলছেন না।
পুরাতন মালদা ব্লক গোটা রাজ্যে পোখরাজ আলু সরবরাহ করে। ফি বছর উৎপাদিত আলুর পরিমাণ গড়ে প্রায় ৫ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু পর্যাপ্ত হিমঘর না থাকায় অনেক কম দামে আলু বেচতে হয় চাষিদের। ভাবুক অঞ্চলের আলুচাষি সন্তোষ রাজবংশী আক্ষেপ করলেন, ‘ভোট এলে চাষিদের কথা মনে পড়ে। ভোট মিটলে কারও টিকি দেখা যায় না। ৫ বছরেও বিধায়ক গোপালচন্দ্র সাহার দেখা পাইনি।’
কিছুদিন আগে ভোটের প্রচারে বেরিয়ে জমিতে নেমে মাথায় আলুর বস্তা নিয়ে নাকি বিধায়ক ছবি তুলেছেন। কিন্তু আলুচাষিদের স্বার্থরক্ষায় কোনও উদ্যোগের কথা তাঁর মুেখ শোনা যায়নি বলে সন্তোষ জানালেন। পুরাতন মালদা ব্লক প্রাকৃতিক প্রাচুর্যেও ভরপুর। কিন্তু পর্যটন বিকাশেও কোনও উদ্যোগ নেই। ২০১১ সালে তৎকালীন কংগ্রেস বিধায়ক রাজ্যের পর্যটন ও বন দপ্তরকে চিঠি লিখেছিলেন ভাটরা বিলকে কেন্দ্র করে পর্যটনের পরিকাঠামো গড়ে তোলার আর্জি জানিয়ে। সরকার কান দেয়নি। টাঙন থেকে মহানন্দা পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিলের বড় অংশজুড়ে রয়েছে হালনা ফরেস্ট। শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে এই বিলে। বর্ষাকালে বিলটি বৃহৎ জলাশয়ের চেহারা নেয়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ঢেউ অন্যতম আকর্ষণ তখন।
বঞ্চনা না ধর্মীয় ভেদ- কোন অঙ্ক জিতবে, তার ওপর নির্ভর করছে মালদার ভোটের ভবিষ্যৎ। একুশের ভোটে প্রথম পদ্ম ফুল ফোটে এই কেন্দ্রে। বিধায়ক হন বিজেপির (BJP) গোপালচন্দ্র সাহা। মানুষের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখেননি বলে সর্বত্র অভিযোগ। বিজেপির পক্ষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেটুকু যোগাযোগ সাংসদ খগেন মুর্মুর সুবাদে বলে সবাই মানেন। রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলেও মালদা বিধানসভা কেন্দ্র কোনওদিন দখল নিতে পারেনি তৃণমূল। একাধিকবার দুলাল সরকার ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছেন। মালদা জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাধিপতি উজ্জ্বল চৌধুরীও পর্যুদস্ত হয়েছেন। এবার তৃণমূলের তাস জেলা পরিষদের এখনকার সভাধিপতি লিপিকা বর্মন ঘোষ। কংগ্রেসের প্রার্থী পুরোনো মুখ ১০ বছরের বিধায়ক ভুপেন্দ্রনাথ হালদার।

