শুভদীপ ব্যানার্জি
সরকারিভাবে এখনও শেষ হয়নি অপারেশন সিঁদুর। স্থগিত রাখা হয়েছে মাত্র। তাই আজকের দিনটাকে আদপে বর্ষপূর্তি বলা যায় কি না, সেই নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। তবে সংঘর্ষ শুরুর দিন হিসেবে ৭ মে নিঃসন্দেহে ভারত সরকারের সামনে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। সবক শেখানোর পাশাপাশি এই এক বছরে আমরা কী কী শিখলাম?
গত বছরের এপ্রিলে পহলগামে নিরপরাধ পর্যটকদের ওপর পাকিস্তানি জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের প্রাণ যায়। এরপর থেকেই প্রত্যুত্তরের জন্য গোটা দেশ তৈরি হচ্ছিল। আগেই ঠান্ডা বস্তায় ভরে ফেলা হয় সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি। তবে শুধু কূটনৈতিক জবাবে থেমে থাকেনি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রক। গত বছরের ৬ মে’র মধ্যরাতের কিছু পরে বায়ুসেনার তরফে জোরদার আঘাত হানা হয় সীমান্তপারের বাছা বাছা ৯টি জঙ্গিঘঁাটি আর সন্ত্রাসবাদীদের চিহ্নিত লঞ্চপ্যাড নিশানা করে। ৫২ মিনিট ধরে চলা এই হামলায় ভারতের তরফে অংশ নেয় রাফাল, মিগ-২৯ এবং এসইউ-৩০এমকেআইয়ের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। গোয়েন্দা বিভাগের আগাম খবরের সুবাদে ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় ভারতীয় বায়ুসেনাকে। পিন পয়েন্ট অ্যাকুরেসির সঙ্গে নিখুঁত হামলা চালায় ভারত। সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’।
এর আগেও উরি, পুলওয়ামায় জঙ্গি হানার জবাবে পাকিস্তানের বুকে আঘাত হেনেছিল ভারতের সশস্ত্র বাহিনী। তবে অপারেশন সিঁদুরের বিশেষত্ব লুকিয়ে ছিল প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটিতে। স্বাধীনতার পর থেকে বেশ কয়েকবার পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ভারত। তবে, ১৯৯৯ সালে কার্গিলে অপারেশন বিজয়ের পরে এটাই ছিল অন্যতম বড় সংঘর্ষ। পহলগামে জঙ্গিহানার পরে পাকিস্তানও রীতিমতো আঁচ করতে পারছিল, কড়া জবাব দেবে পড়শি। তা সত্ত্বেও ৯ নিশানার ৯টিতেই লক্ষ্যভেদ করে দেখায় ভারত। এই প্রথম ‘বিয়ন্ড ভিজুয়াল রেঞ্জ’ টার্গেটের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে দু’দেশের সেনা। আর তাতেই বাজিমাত করে দেখায় ভারত। আইসিসিএস বা ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার গোটা অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
থেমে না থেকে অপারেশন বুনিয়ানে মারসোস শুরু করে পাকিস্তান। পরিকাঠামোর দিক থেকে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রোন হামলার চেষ্টা করে তারা। তবে রুশ প্রযুক্তির এস-৪০০ এবং ভারতের নিজস্ব আকাশ ও নাগ ক্ষেপণাস্ত্ররোধী ব্যবস্থার সামনে টিকতে পারেনি সেইসব হামলা। এরপর আর কোনও দ্বিধায় ভোগেনি ভারতের সশস্ত্র বাহিনী। সরাসরি শুরু হয় দ্বন্দ্ব। পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে নুরখান, রহিমইয়ারখান, রাওয়ালপিন্ডি, কিরানা হিলসের মতো পাক স্থলসেনা ও বায়ুসেনার ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ শুরু করে বায়ুসেনা। প্রস্তুত রাখা হয় নৌসেনার ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপকে। পাকিস্তানকে মালুম পাইয়ে দেওয়া হয়, ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষে তাদেরই লোকসান হবে বেশি। এরপর ১০ মে পাক সামরিক বাহিনীর অনুরোধে সংঘর্ষ বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ভারত।
তবে এখানেই সব শেষ নয়। প্রশ্ন থাকছে, অপারেশন সিঁদুর এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে। অধিকাংশ বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞের মতে, আবার যে কোনও সময় উসকানি আসতে পারে অটারির ওপার থেকে। সেক্ষেত্রে ফের শুরু করতে হতে পারে অপারেশন সিঁদুর। তবে শত্রুও তৈরি থাকবে এবার। পাশাপাশি, ভুললে চলবে না ভূ-রাজনীতির দাবার ছকে এখন ইসলামাবাদ আর ওয়াশিংটন খুব বেশি দূরে নয়। আমেরিকার কঁাধে ভর দিয়েই বড় দঁাও মারতে চাইবেন আসিম মুনির, শাহবাজ শরিফরা। বোমাবন্দুকের লড়াইয়ের পাশাপাশি ভারতকে তৈরি থাকতে হবে ন্যারেটিভ যুদ্ধের জন্যও। দেরিতে নয়। সবার আগে, সবার সামনে আনতেই হবে সংঘর্ষের খুঁটিনাটি। পেশিশক্তির সঙ্গে বাকপটুতাও বাড়াতে হবে, সমানতালে।



