রুদ্র সান্যাল
ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক মেরুকরণ যত তীব্র হয়েছে, ততই কিছু বাক্য অস্বাভাবিক দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ‘আমাদের টাকাতেই তো তোমাদের বেতন’- এই কথাটি এখন জনপরিসরের এক পরিচিত উচ্চারণ। সামাজিক মাধ্যম, চায়ের আড্ডা কিংবা জনসভা- সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক বা চিকিৎসকদের উদ্দেশে এই বাক্যটি প্রায়ই ছুড়ে দেওয়া হয়, বিশেষ করে যখন কোনও দাবি বা অধিকারের প্রশ্ন ওঠে। আপাতভাবে বাক্যটি যুক্তিসংগত বলে মনে হতে পারে। নাগরিক কর দেন, সেই কর (Tax) থেকেই বেতন আসে- এতে আপত্তির কী আছে? কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, এই যুক্তি অসম্পূর্ণ। এটি কেবল অর্থনৈতিক হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক সম্পর্কের ধারণা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্ন।
সরকারি কর্মচারীরা কারও ব্যক্তিগত দয়ার ওপর নির্ভরশীল নন- এই সত্যটি প্রথমেই স্পষ্ট করা জরুরি। একজন শিক্ষক, চিকিৎসক বা প্রশাসনিক আধিকারিক দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ এবং আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দায়িত্বে আসীন হন। রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক পেশাগত- তাঁরা শ্রম ও দক্ষতা দেন, রাষ্ট্র তাঁদের পারিশ্রমিক দেয়। এটি শ্রমের ন্যায্য বিনিময়। যখন বলা হয় ‘আমার টাকায় তোমাদের ঘর চলে’, তখন প্রকারান্তরে সেই শ্রমের মর্যাদাকে খাটো করা হয় এবং সম্পর্কটিকে ব্যক্তিগত দয়া বা করুণার স্তরে নামিয়ে আনা হয়।
কর, মালিকানা ও বিভাজনের ভ্রান্তি
আমরা দৈনন্দিন জীবনে অসংখ্য পরিষেবার জন্য অর্থ প্রদান করি। বিদ্যুৎ বিল দিলে কি বিদ্যুৎকর্মীর ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা তৈরি হয়? ট্রেনের টিকিট কাটলে কি রেলকর্মীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়? নিশ্চয়ই নয়। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পরিষেবা, যেখানে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ওপর দাঁড়িয়ে। সরকারি পরিষেবাও সেই একই কাঠামোর অংশ। অর্থ প্রদান এখানে ব্যক্তিগত ক্ষমতার উৎস নয়; বরং একটি সমষ্টিগত ব্যবস্থাকে সচল রাখার উপায়।
কর ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। নাগরিক কর দেন- এটি কোনও দয়া নয়, নাগরিকত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা, পরিকাঠামো, বিচার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা দেয়; নাগরিক সেই ব্যবস্থাকে সচল রাখতে কর প্রদান করেন। এই পারস্পরিক সম্পর্ককে যদি ‘আমরা বনাম তোমরা’ বিভাজনে নামিয়ে আনা হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। কারণ সরকারি কর্মচারীরাও নাগরিক, এবং তাঁরাও একই কর ব্যবস্থার অংশ। ফলে এখানে প্রকৃত অর্থে আলাদা কোনও পক্ষ নেই- আছে একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল সামাজিক কাঠামো।
এই বিভাজনের ভাষা ধীরে ধীরে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে। নাগরিক পরিষেবাকে তখন যৌথ দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একতরফা ‘দেওয়া-নেওয়া’ সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক আস্থাকে দুর্বল করে, কারণ এতে পারস্পরিক সম্মানের জায়গা সংকুচিত হয়।
রাষ্ট্র বনাম সরকার : গুলিয়ে ফেলার ফল
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভ্রান্তি জন্ম নেয় রাষ্ট্র ও সরকারকে এক করে দেখার ফলে। সরকার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেয়াদের প্রশাসনিক রূপ; রাষ্ট্র একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান। সরকারি কর্মীরা কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত কর্মী নন; তাঁরা রাষ্ট্রের কর্মী। তাঁদের বেতন কোনও ব্যক্তি বা দলের তহবিল থেকে আসে না; আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে, যা কর, শুল্ক, সরকারি সংস্থার আয় এবং অন্যান্য উৎসে গঠিত। যখন এই পার্থক্য অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন নাগরিক সম্পর্ক আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা অযথা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সমসাময়িক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই মানসিকতাকে প্রভাবিত করে। কর্মসংস্থানের সংকট, শিক্ষিত বেকারের হতাশা এবং বৈষম্য যখন বাড়ে, তখন সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতি অসন্তোষ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। জন আলোচনায় প্রায়ই এই আবেগকে কাজে লাগানো হয়। কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার দায় ব্যক্তিগত কর্মচারীর ওপর চাপালে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে।
ভোক্তা মানসিকতা ও সামাজিক আস্থার সংকট
এই বাক্যবন্ধের আরেকটি সামাজিক প্রভাব হল অতিরঞ্জিত ভোক্তা মানসিকতা। বাজারে ক্রেতা যেমন পণ্য কেনেন, তেমনভাবে রাষ্ট্রীয় পরিষেবাকেও যদি কেবল কেনাবেচার সম্পর্ক হিসেবে দেখা হয়, তবে নাগরিক দায়িত্ব ও সামাজিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষক প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেন, একজন চিকিৎসক সীমিত পরিকাঠামোয় রোগীর পাশে দাঁড়ান, অথবা একজন পুলিশকর্মী মাঝরাতে পাহারা দেন- এই কাজগুলো কেবল আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও পেশাগত নৈতিকতা।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষকরা প্রায়ই নীরব লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, কিন্তু শিক্ষককে দায়ী করার সহজ পথ সমাজকে বিভ্রান্ত করে। একজন নাগরিক যখন নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন, তখন সেই সচেতনতার ভিত্তি গড়ে দেন একজন শিক্ষকই। ফলে শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন মানে জ্ঞানের সামাজিক ভিত্তিকেই দুর্বল করা।
ভাষা বদলালে সম্পর্ক বদলায়
ভাষা শুধু ভাব প্রকাশ করে না; ভাষা সামাজিক মনোভাব নির্মাণ করে। ‘আমাদের টাকাতেই তো তোমাদের বেতন’ বলার পরিবর্তে যদি বলা হয় ‘রাষ্ট্রের অর্থে সরকারি কর্মচারীরা বেতন পান’, তবে বাস্তবতা অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু অবজ্ঞা যুক্ত হয় না। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন নাগরিক সম্পর্ককে পরিণত করে এবং আলোচনাকে যুক্তিনির্ভর করে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি সহযোগিতার ফল। শ্রেণিকক্ষ, হাসপাতাল, আদালত ও দপ্তরের নীরব শ্রম মিলেই রাষ্ট্র কার্যকর থাকে। সেই শ্রমকে সম্মান করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। অধিকার ও কর্তব্যের ভারসাম্য রক্ষা না হলে গণতন্ত্র কেবল আইনি কাঠামোয় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, সামাজিক আস্থায় নয়। পারস্পরিক সম্মান ও সংযত আলোচনার সংস্কৃতিই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের (Democracy) ভিত্তি।
(লেখক শিক্ষক)

