রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি : ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে করতে মোবাইলের পর্দায় ভেসে ওঠে পরিচিত ফুড ভ্লগারের ভিডিও। তিনি গিয়েছেন পরিচিত নামের কিংবা সদ্য খোলা রেস্তোরাঁ, হোটেলে খাবার খেয়ে রিভিউ দেবেন বলে। ভূমিকা পর্বের পর টেবিলে সাজানো হয় অনেক প্লেট। সুস্বাদু সব খাবার। ক্যামেরার জাদুতে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সেই দেখে ঢোঁক গেলেন আপনি।
এরপর তিনি বলতে শুরু করেন, ‘এই রেস্তোরাঁর হোয়াইট সস পাস্তাটি একবার অন্তত খেয়ে দেখুন। দাম আহামরি নয়। স্বাদ অতুলনীয়।’ তাঁরই আরেক ভিডিও-তে শোনা যাবে, ‘শিলিগুড়ির সব চাইতে সস্তার ক্যাফে এটাই। চিকেনের নানা ধরনের আইটেম এক ছাদের নীচে।’


রেফ্রিজারেটরে রাখা সেই চিকেন আদৌ কতদিনের বাসি বা মশলা ব্যবহার হচ্ছে কোন সংস্থার, সেই তথ্য মেলে না অবশ্য। ভ্লগার ঘুরে দেখান না রেস্তোরাঁ বা ফাস্ট ফুড স্টলের রান্নাঘরটি। শুধু সুপারিশ দিয়েই দায় সারেন তাঁরা। বিপুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে আসে বিরাট দায়িত্ব। মনে রাখা দরকার, শহরে নতুন খাবারের ঠিকানা খুঁজতে জনপ্রিয় ভ্লগারদের ভিডিও-র ওপর ভরসা রাখেন খাদ্যপ্রেমীরা। তাই তাঁদের আরও দায়িত্ববান হওয়া দরকার।
এই প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে শিলিগুড়িতে বিরিয়ানি বিতর্কের পর থেকে। দুটো আলাদা দোকানের বিরিয়ানির মাংসে পোকা মেলার অভিযোগ উঠেছিল আগে। তারপর শৌচালয়ে কমোডের পাশে বিরিয়ানি, চাউমিন আর ভাত। যে দোকানটি সিল করা হয়েছে, সেখানেও এক-দুজন ফুড ভ্লগার গিয়েছেন অতীতে। ঘটনার পর তাঁদের ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে।
কীসের ভিত্তিতে ভ্লগাররা পরামর্শ দেন খাবারের দোকানে যাওয়ার, সেই প্রশ্ন ওঠে। আদৌও তাঁরা সব তথ্য সঠিক দেন? রিভিউ দেওয়ার আগে রান্নাঘরে উঁকি দেন? নাকি সব মাছ ঢাকা পড়ে যায় ‘পারিশ্রমিক’ নামক শাকটি দিয়ে। পরিচিত শব্দ ‘পেইড রিভিউ’।
অধিকাংশ ফুড ভ্লগারই রেস্তোরাঁ, ক্যাফের পেইড প্রোমোশন করেন। তিনি সবটা ঝাঁ চকচকে দেখাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁদেরও মাথায় রাখতে হবে, নিজের স্বার্থপূরণের বিনিময়ে সাধারণের স্বাস্থ্যকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া মানবিকতা নয়। রেস্তোরাঁ মালিকদের ছেলেখেলা বন্ধ করতে উদ্যোগী হতে হবে তাঁদেরও।
কথা হল শিলিগুড়ির বেশ কয়েকজন পরিচিত ফুড ভ্লগারের সঙ্গে। তাঁদের দাবি, আগের তুলনায় আরও বেশি সতর্ক হয়েছেন। ভিডিওতে খাবারের রিভিউ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বার্তা দিচ্ছেন তাঁরা। বলাই বণিক নামে এক ভ্লগারের কথায়, ‘আগে রেস্তোরাঁর রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন বা সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন কি না, সেদিকে অত গুরুত্ব দিতাম না। তবে এখন রিভিউ ভিডিও শুটের আগে এফএসএসএআই (ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া) লাইসেন্স দেখাতে বলি। তবে আমার মনে হয় প্রশাসনকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত। রেস্তোরাঁ ধরে ধরে নজরদারি প্রয়োজন।’ শহরের অপর এক ফুড ভ্লগার পিয়ালী দাসের বক্তব্য, ‘এখন বেশিরভাগ ইনফ্লুয়েন্সার পেইড প্রোমোশন করেন। তাই খাবার খারাপ হলেও কেউ নেতিবাচক রিভিউ দিতে পারেন না। তবে আমরা দেখেশুনে খোঁজখবর নিয়ে কাজ করছি। খোলা জায়গায় রান্না হলে, সেটিও ভিডিও-তে দেখাচ্ছি। সচেতনতার বার্তা দিচ্ছি।’ প্রীতি সিং-ও ফুড ভ্লগিং করেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ‘এক মিনিট কথা বলার সময় নেই’ বলে ফোনটি কেটে দেন।
শহরবাসীর একাংশ অবশ্য তাঁদের ভূমিকায় বেজায় ক্ষুব্ধ। শৌচালয়ে খাবার মজুতের ঘটনার পর শিলিগুড়ির শক্তিগড়ের বাসিন্দা সুপর্ণা ভাদুড়ি সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন। সমাজের প্রতি ভ্লগারদের যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেন। রবিবার তিনি ফোনে বললেন, ‘ভ্লগাররা পেইড প্রোমোশনের স্বার্থে খারাপ খাবারকেও এত ভালোভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেন যে, দেখে মনে হয় এখনই বেরিয়ে পড়ি খেতে। একটু গভীরে ভাবলে বুঝতে পারবেন, ৭০ টাকায় চিকেন বিরিয়ানি দিতে হলে মানের সঙ্গে কতটা সমঝোতা করা হয়।’
একই সুর সুকান্তপল্লির বাসিন্দা সুনন্দচন্দ্র দাসের গলায়। বললেন, ‘ভ্লগাররা তাঁদের ভিডিও’র মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পারেন। এখন সেটা করার উপযুক্ত সময়। খাবার ভালো মানের হলে অবশ্যই ভালো রিভিউ দিন। সঙ্গে রান্নাঘর, কীভাবে খাবার মজুত রাখা হয় ইত্যাদি দেখাতে হবে। তবেই মানুষ আরও বেশি ভরসা করবেন।’

