সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, প্যারিসঃ গগন নারাং যতই বলুন কাউকে পদক দিয়ে বিচার করাটা ঠিক হবে না। কিন্তু আমজনতার কাছে তো খেলার ফলাফলই শেষ কথা। তাই টোকিও অলিম্পিকের বিচারে এবার যে ভারত পিছিয়ে সেই কথাই মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষের।
এবার শেষ পর্যন্ত ভারতের ঝুলিতে মোট ছয় পদক। যার মধ্যে তিনটিই এনেছেন শুটাররা। আরও বিস্তারিত বলতে গেলে মনু ভাকের একাই দুইটি। যার মধ্যে একটা তিনি জেতেন সরাবজ্যোত সিংয়ের সঙ্গে। পরে স্বপ্নিল কুসালেও তৃতীয় পদক নিশ্চিত করেন। এরপর লম্বা সময় পদক আসছে আসছে করেও আসেনি। শেষ পর্যন্ত হকি দল ও নীরজ চোপড়া ও শুক্রবার আমন শেরাওয়াত ওই গেরো কাটান। মাঝের সময়ে একাধিকবার পদকের কাছ থেকে ফিরে এসেছেন ভারতীয় অ্যাথলিটরা। মনু নিজে চতুর্থ হয়েছেন। এছাড়াও শুটারদের মধ্যে অর্জুন বাবুতা, মীরাবাই চানু, লক্ষ্য সেন, স্কিট মিক্সড দলের অনন্তজিৎ সিং নারুকা-মাহেশ্বরী চৌহান ও তিরন্দাজির মিক্সড ইভেন্টে ধীরাজ বোম্মাদেভেরা-অঙ্কিতা ভকতরা সকলেই চতুর্থ হয়েছেন খুব অল্পের জন্য। এবার এই অল্পের জন্য এঁরা যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট না হতেন, তাহলেই পদক সংখ্যাটা ১১-তে পৌঁছে যেত। কিন্তু এটাও ঘটনা, অলিম্পিকের মতো জায়গায় যদি বা কিন্তুর কোনও জায়গাই নেই। অল্পের জন্য ছিটকে যাওয়া মানে তুমি পদকের বাইরে। লম্বা সময়ের অধ্যাবসায়ের পর এই জায়গায় যেমন পৌঁছানো যায় তেমনি, সঠিক পদ্ধতি ও পরিশ্রমের ফলেই পদক আসে। আর তাই পরপর অলিম্পিকে সাফল্য আসে নীরজ বা হকি দলের। যা আগেও করে দেখিয়েছেন সুশীল কুমার বা পিভি সিন্ধুরা।


এই সাফল্য ধরে রাখা কতটা কঠিন? কেন সবাই পারে না? নীরজের উত্তর, ‘একটা সাফল্য পেলেই নিজের লক্ষ্য থেকে সরে গেলে চলবে না। এমনিতেই তো আমাদের অ্যাথলিটদের টাকা-পয়সা কম আসে। আর সেখানে আপনি যদি লক্ষ্য থেকে সরে যান তাহলে আপনার সাফল্যও থাকবে না। আর তখন তো আপনার হাতে আর কোনও টাকা-পয়সাও আসবে না। তাই ফোকাসড থাকাটা খুব জরুরি।’ ঠিক, এই জায়গাতেই যেন খানিক পিছিয়ে বহু অ্যাথলিট। দীপিকা কুমারী এই নিয়ে চারবার অলিম্পিকের আসরে অবতীর্ণ হলেন। নিশ্চিতভাবেই অভিনন্দন প্রাপ্য তার জন্য। মা হয়েও যোগ্যতা অর্জন করেছেন লক্ষ্যে অবিচল থেকে। এখানে এসেছেন ছোট্ট বাচ্চাকে বাড়িতে রেখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগের তিনবারের মতোই কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে। কেন হল না? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই দীপিকার মতো সিনিয়ারের কাছেও, ‘কেন হেরে যাই প্রতিবার, এবারও কেন গেলাম কোনও ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে।’ চানু আবার বারবার বলতে থাকেন ভাগ্যের কথা, ‘দেখুন ভাগ্যে যা থাকবে, সেটাই হবে। আমরা চেষ্টা করতে পারি শুধু।’
এদিন গগন এসেছিলেন মেইন প্রেস সেন্টারে ভারতীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করতে। তিনিও বললেন, ‘এই চারে শেষ করার একটা অদ্ভুত প্রবণতা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এর কারণ আমারও জানা নেই। এখন অলিম্পিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বেশি। বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব দেশ আগে নিয়মিত পদক জিতত, তারাও আর পারছে না সেইভাবে পদক জিততে। দেখুন না, আমেরিকা, চিন কি সেই আগের পদকসংখ্যা ধরে রাখতে পারে? প্রচুর নতুন নতুন দেশ আসছে। ফলে কাজটা কঠিন হচ্ছে।’ হয়তো ঠিক। তবু সরকার এবার অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে ৪৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে। তার এক শতাংশ না করেও বহু দেশ পদক তালিকায় ভারতের উপরে। এমনকি একটা সোনা জিতেছে পাকিস্তানও। মনস্ত্বত্ববিদ রাখার পরেও ভারতীয়দের মানসিকতা কেন এই জায়গায়, এটারই অন্তর্তদন্ত হওয়া উচিত সম্ভবত।
এর থেকে টোকিওতে পদক সংখ্যাও বেশি ছিল। লন্ডনের সমান পদক হলেও এবার কোনও সোনা দূরের কথা, একটার বেশি রুপোও আসেনি। লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের জন্য তাই এখন থেকেই ভাবনা শুরু করতে পারলে হয়তো শেষপর্যন্ত পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হতে পারে।

