সুস্মিতা গঙ্গোপাধ্যায়, প্যারিস: প্যারিস শহরটার বিশেষত্ব কী? প্রশ্নটা করলে নিশ্চিতভাবেই প্যারিসের ফ্যাশন, লুভর মিউজিয়াম, মোনালিসার ছবি, আইফেল টাওয়ার, বাস্তিল দূর্গ, ভার্সেইঁয়ের রাজপ্রাসাদ- এসবের কথাই বলবেন যে কেউ। কিন্তু প্যারিসের রোজনামচার মধ্যে বোধহয় এসব পড়ে না। প্যারিস মানে হল, অলস দিনযাপন। প্যারিসের বিশেষত্ব এখানকার রাস্তার ধারের কাফেটারিয়াগুলোতে। এখানকার মানুষের মানসিকতা অতি সাধারণ, দুই হাত বাড়িয়ে আশপাশের দেশগুলো তো বটেই, এমনকি ভারত-বাংলাদেশের মতো দেশের মানুষকে আপন করে নেওয়াও হয়তো রোজনামচার মধ্যে পড়ে।
প্যারিসে দুটি মিডিয়া সেন্টার করা হয়েছে। একটা প্যারিস মিডিয়া সেন্টার। যা একেবারে যাকে বলে হার্ট অফ দ্য সিটিতে। হোটেল ডি ভিল স্টেশন থেকে নেমে প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটা পথ। জায়গাটা বিখ্যাত লা কারেউ দ্য টেম্পলের একেবারে গায়ে। আসার পথে পিকাসো মিউজিয়াম পড়বে। যা কাজ করতে এসে ঘুরে দেখে আসার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। অসম্ভব সুন্দর এক অস্থায়ী স্থাপত্য এই মিডিয়া সেন্টার। এতটাই সুন্দর যে এখানে আলাদা করে ঘুরে দেখানোর জন্য ভলান্টিয়াররা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এই গোটা রাস্তাটায় অন্তত গোটা কুড়ি ক্যাফে নজরে পড়ল। যার প্রতিটা ভর্তি সুবেশ নারী-পুরুষে। এখানকার মানুষের একটা প্রবণতা হল, এখানে ক্যাফের অন্দরে বসতে রাজি নয় বেশিরভাগ মানুষ। ফুটপাথজুড়ে রঙিন চেয়ার-টেবিল পেতে দেওয়া হয়। সেখানেই বসে একটা রেড ওয়াইন ও সঙ্গে হালকা খাবারদাবার নিয়ে বসছেন তাঁরা। সকালের দিকে একটা খ্রোঁশা (যাকে আমরা বাঙালিরা চিরকাল ক্রোশো বলেই চিনেছি), সঙ্গে এক কাপ কফি নিয়ে বসা ফরাসিদের নিয়মের মধ্যে পড়ে। দুপুরের দিকেই আবার দেখা যাবে খাবারগুলো বদলে গিয়ে ফ্রেঞ্চ অনিয়ন সুপ, স্যামন এন প্যাপিয়তে কী চিকেন কনফিত হয়ে যায়। রাতের খাবারে বিশাল এক লাঠির মতো লম্বা পাউরুটি বাগেত বা বুগেত থাকবেই।


তবে প্যারিসে কিন্তু দেখলাম ভারতীয় খাবারেরও প্রচুর দোকান। মেরি দি মনথোই বলে যে জায়গাটায় এতদিন ধরে থেকে গেলাম, সেখানেই রয়েছে কাশ্মীর নামের এক ছোট্ট রেস্তোরাঁ। গিয়ে বোঝা গেল, নামে ভারতীয় হলেও আসলে সেটা চালান বাংলাদেশিরা। সাদা ভাত, ছোলার ডাল, চিকেন তন্দুরি সবই মিলবে। তবে কোনওটাতেই অবশ্য ঝাল বা বাড়তি মশলা দেওয়া হয় না, এখানকার মানুষের রসনার কথা ভেবে। তেমনি ইউভস দ্য ম্যানরের পাশে আবার তাজমহল হোটেল। এটাও ভারতীয় নয়, চালান পাকিস্তানিরা। ফলে কাবাব জাতীয় খাবারের এখানে প্রচুর চাহিদা। তবে চমকে গিয়েছি, পোর্ত মাইওর এমপিসি-র পাশেই কিরণ রেস্টুরেন্ট দেখে। ছোট ক্যাফে নয়, পূর্ণ রেস্তোরাঁ এটা। মুম্বই নিবাসী রাজেন গুপ্তা ৪০ বছর আগে এসে স্ত্রীর নামে খোলেন। যা এখন রমরম করে চলে। দুপুর বা বিকেলের দিকে এসে জায়গা পাওয়া যায় না। কর্তব্যরত পুলিশদেরকেও দেখলাম দল বেঁধে চলে আসছেন এই কিরণে। এখানেই পরিচয় হল ফ্রিদা ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে। স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে খেতে এসেছেন। ভারতবর্ষ সম্পর্কে রীতিমতো ওয়াকিবহাল। বহু জায়গায় গেছেন, শুধু গোয়াটা বাকি। ওখানেও যাবেন বলে জানালেন। কী খেতে আসেন ভারতীয় এই রেস্তোরাঁয়, জানতে চাইলে স্বামী-স্ত্রী দুজনই এক বাক্যে বললেন, ‘তন্দুরি রুটি, ডাল মাখানি আর চিকেন টিক্কা মশালা।’ বাকি ফরাসিদের অনেককে আবার দেখলাম ল্যাম্ব বিরিয়ানির স্বাদ নিচ্ছেন এখানে এসে। এই কিরণের শেফ পরিষ্কার ভারতীয় স্বাদ রেখে শুধু একটাই ব্যাপার করেছেন। স্বাদে এবং দর্শনে কোনও তফাত নেই। শুধু খাওয়ারটা আঝালি। এই রেস্তোরাঁর মালিক মুম্বইকর হলেও খাবার বেশিরভাগই উত্তর ভারতের। কাশ্মীরি রোগান জোসের মতো খাবারের প্রাধান্যও দেখা গেল প্রচুর। এখানে আবার অতিথিদের খাবার পরিবেশন করেন কাঠমান্ডুর মিষ্টি মেয়ে মীরা ও ইসলামাবাদের সুদর্শন তরুণ ইউসুফ। এঁদের নিয়েই এখন রাজেন প্যারিসে দায়িত্ব নিয়েছেন ফরাসি রসনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুখাদ্য পরিবেশনের।

