অরিন্দম বাগ ও স্বপনকুমার চক্রবর্তী, মালদা: দড়ি দিয়ে খাটিয়ায় বাঁশ বেঁধে রোগীকে শুইয়ে বেহাল রাস্তা পার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হল না। মালদা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মঙ্গলবার হবিবপুরের রঞ্জিতপুর গ্রামের আদিবাসী বৃদ্ধা রানি সোরেনের মৃত্যু হয় (Malda)। এই মৃত্যুর জন্য রানির পরিজনরা রাস্তার বেহাল অবস্থাকেই দায়ী করেছেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় রঞ্জিতপুর গ্রামের বেহাল রাস্তার চরম দুর্ভোগের ছবি সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
বেহাল রাস্তায় খাটিয়ায় চাপিয়ে রোগীকে নিয়ে যাওয়ার ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর সেই রোগীকে বাড়িতেও ফিরিয়ে আনা হয়, তবে খাটিয়াতেই। ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় রবিবার খাটিয়ায় করে আবার মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে এবার আর বাঁচানো যায়নি ওই আদিবাসী বৃদ্ধাকে। এই ঘটনায় ঘাসফুল ও গেরুয়া শিবিরের মধ্যে চাপানউতোর শুরু হয়েছে।


ওই এলাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা এতটাই বেহাল যে, রাস্তা দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স আসা তো দূরের কথা, ভ্যানরিকশা পর্যন্ত চলতে পারে না। বেহাল রাস্তার কথা সেসময় স্বীকার করে শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পাণ্ডব সিংহ বলেছিলেন, ‘ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় রানিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। মূল রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে তাঁকে খাটিয়ায় করে নিয়ে যেতে হয়। চিকিৎসার পর ফের সেভাবেই তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়।’ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন রানি। যে কারণে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মালদা মেডিকেলে। তাঁর ছেলে সমর হাঁসদা বলেন, ‘গত রবিবার ফের মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। সেসময়ও মাকে খাটিয়ায় করেই মূল রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল। রবিবারই মাকে মালদা মেডিকেলে ভর্তি করি। সিসিইউ বিভাগে মায়ের চিকিৎসা চলছিল। আজ সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়ের মৃত্যু হয়েছে। এলাকায় রাস্তা না থাকায় রোগী নিয়ে যেতে অনেকটা সময় নষ্ট হয়। পাকা রাস্তা থাকলে হয়তো মাকে বাঁচানো যেত।’ শাশুড়ির মৃত্যুতে বেহাল রাস্তাকে দায়ী করেছেন সুমিতা সোরেনও। সুমিতা বলেন, ‘সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলে শাশুড়ির মৃত্যু হত না৷ এলাকায় পাকা রাস্তার দাবিতে বারবার আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছি৷ কিন্তু কোনও ফল মেলেনি৷’
বেহাল রাস্তার জন্য এমন মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রঞ্জিতপুরে। পরস্পরের ওপর দায় চাপাতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তর্জাও। মালদা জেলা তৃণমূলের সহ সভাপতি শুভময় বসু বলছেন, ‘এই ঘটনার জন্য দায়ী বিজেপি। ওই এলাকার সাংসদ, বিধায়ক, জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য বিজেপির। এর পরেও এতদিনে কাজ হয়নি কেন? কেন্দ্রের এত বঞ্চনা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার গ্রামোন্নয়নে ঢেলে টাকা দিচ্ছে। তপশিলি জাতি, উপজাতির মানুষ আগামীদিনে বুঝতে পারবে বিজেপি কত ভয়ংকর।’
বিজেপির দক্ষিণ মালদা সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায়ের পালটা অভিযোগ, ‘ওই এলাকার সমস্ত জনপ্রতিনিধি বিজেপির হলেও কোনও উন্নয়নমূলক কাজ করতে দিচ্ছে না রাজ্য সরকার। তা পঞ্চায়েত স্তরে হোক, পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে হোক অথবা জেলা পরিষদ স্তরে। এমনকি বিধায়ক নিজের উন্নয়ন তহবিলের টাকা দিয়ে কাজ করার কথা বললেও, অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাদের দলের জেলা পরিষদের সদস্য এনিয়ে প্রশাসনকে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। পুরসভা এলাকাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। রাজ্য সরকারের এই মনোভাবের কারণেই এই পরিস্থিতি।’
শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পাণ্ডব সিংহ বলেন, ‘পেট্রোলগড় থেকে গান্ধিনগর পর্যন্ত রাস্তা রয়েছে প্রায় তিন কিলোমিটার। মাঝে আটশো মিটার ঢালাই রয়েছে। বাকিটা কাঁচা। তার উপর একটা বড় অংশ রেলের জায়গা। ফলে রেল অনুমতি না দিলে রাস্তা করা সম্ভব নয়। এর মধ্যেই রঞ্জিতপুর এলাকাও পড়ে। যেখানে রানি সোরেনের বাড়ি।’

