দহন বেদী
বিপুল আচার্য
একাকিত্বের ভেলায় চড়ে
আমি যে কুয়াশা ভোরের
নিঃশব্দ কথোপকথন শুনতে চেয়েছিলাম
সবুজ ছুঁয়ে থাকা
চাদর দেখতে দেখতে অবশেষে
ম্যাজিক দেখে ফেলি অনুমিত কাঙাল জন্মের
এটা খুঁজে দেখা জরুরি ছিল না
বোধগম্যের উদ্বাস্তু ভূমি জুড়ে নিভন্ত কিছু
অনুরণনের দীর্ঘশ্বাস আরো দীর্ঘ হয়
নিজেকে সহজ রাস্তায় ঠেলে দিতে —
সহজ রাস্তায় কোনও জাদুকাঠি নেই
নিভন্ত হলেও যা কিছু ওই দহন বেদীতেই সমর্পিত।
জানি না কুয়াশা ভোর কত দূরে।
অন্ধকারের শোকগাথা
গণেশচন্দ্র রায়
অচেনা আলোর ভেতর দ্রুত ডুবে যাচ্ছে সমস্ত দৃশ্যপট
সূর্যের হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে শুরু হয় প্রস্তাবিত সকাল,
নবকলেবরে আধুনিক সভ্যতার হাত ধরে
দাঁড়িয়ে আছি, একটি ভয়ংকর দিনের অপেক্ষায়।
ছায়া গোধূলি নেমে আসে অরণ্য শূন্যতায়,
হৃদয়ের চোরাবালিতে মূর্ত জ্যোৎস্না
নদীতে ভেসে যাচ্ছে অর্ধেকটা দুপুর।
ক্লান্ত মেঘের পিঠে ঝরে পড়া কালো রোদে
বসে আছে গুপ্ত ঘাতক,
অর্ধনগ্ন জীবনে কেউ মগ্ন জলক্রীড়ায়
নৈঃশব্দের ভেতর তীব্র হচ্ছে অন্ধকারের শোক।
অবিশ্বাস ঘন হলে
প্রশান্ত দেবনাথ
কেবল নিজের কথা ভাবি আর সং সেজে থাকি
দিনরাত ঘুঘু ডাকে, ঝরে যায় গোলাপের কুঁড়ি।
কুঁড়িগুলো পায়ে দলে রঙিন উৎসব, এখানেই
রং পালটে শুদ্ধ হয় গলি থেকে উঠে আসা কারা–
তাদের পিছনে আলো, সামনে আলো, তাদের রঙিন
প্রতিশ্রুতি শুনে হাসে মঞ্চ, হাসে চায়ের দোকান
হাসির আড়ালে থেকে সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখি
অবিশ্বাস ঘন হলে, নিজেকেই খামচে ধরি।
ক্ষুদ্র
সুলগ্না বাগচী
সবকিছুকেই ক্ষুদ্র লাগে পেরিয়ে এলে
মনের মধ্যে মস্ত ক্ষতর ঘর
যাপন যাদের গোপন রাখে ব্যথা
তাদের কারও অসময়ী জ্বর৷
ভাবছে যখন এই বুঝি সব গেল
হাওয়ায় দোলে নরম মনের সাঁকো
ঠিক তখনই সময় একলা এসে
পার করে দেয় চেনা গলির বাঁকও৷
ক্ষতের দাগও একসময়ে দূরের বাড়ি
হিসেব মেলে আটকে থাকা ভাগে
বাড়ির মতোই, পেরিয়ে এলেই
সব আঘাতই ক্ষুদ্র লাগে৷
অপেক্ষা
উজ্জ্বল আচার্য
আমার কথাটায় অস্পষ্টতা ছিল
যে কারণে তোমার বুঝতে কষ্ট হয়
তোমার কথাতেও স্বচ্ছতা ছিল না কোনও
তোমায় গ্রহণ করতে তাই আমার এত ভয়।
আসলে সর্বত্র এক অস্পষ্ট কোলাহল
আমাদেরকে ঘিরে ধরছে
আমাদের সবকিছু যেন সঠিক নয়
সবাই শুধু নিজের দিকেই ছুটছে।
তোমার আমার দুজনের মাঝে
প্রাচীর তুলেছে এক আকাশ বিস্ময়
দুজন দুজনকে গ্রহণ করতে
আরও অনেক বছর কেটে যাবে নিশ্চয়।
পৃথিবীর পদযাত্রা
বিভা দাস
নিঃশব্দ চরণে পশ্চিমের বিদায়মণ্ডলে
এসে দাঁড়ান দেব অংশুমালী-
তবুও বিদায় নেবার আগে
চিরঅভ্যাস বশত একবার ফিরে তাকান
প্রিয় পৃথিবীর দিকে-
স্নিগ্ধ কিরণরেখা তির্যকভাবে এসে দাঁড়ায়,
নিরীহ পথ শরীরময় অলৌকিক আলো
নিয়ে রোজ হেঁটে যায় আরও দুর
কুয়াশার অন্তরালে-
ধীরে ধীরে পার হয় গ্রীষ্ম, শীত, তন্দ্রাহীন পাতাখসা;
সমগ্র পৃথিবী তখনও যেন স্মৃতি আগলে
বসে থাকে দেব অংশুমালীর।
ক্ষয়ে যায় চিরন্তন অদ্ভুত নৈরাশ্য,
জলের আয়নায় ভেসে ওঠে সুদূর অতীত
দুরে ওই মন্দিরের কাঁসর-ঘণ্টা বেজে ওঠে,
দেবালয়ে সন্ধ্যারতির সময়।
এইভাবেই প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বয়ে চলে
পৃথিবীর পদযাত্রা-
অতীত থেকে বর্তমান
যুগ থেকে যুগান্তরে…
শীতকাল খুব বেশি দুরে নেই
আশিস সরকার
শীতকাল খুব বেশি দূরে নেই–
শীতের দুপুরে খুব ঘুমোতে ইচ্ছে করে আমার
ঘুমোতে পারি না, কিছুতেই গরম হয় না হাত-পা,
এবার ঠিক করেছি শীতের দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে– শুধু ছবি আঁকবো;
জানি, ছবি আঁকার সময় কফি খেতে ইচ্ছে হবে খুব
সিগারেট খেতেও ইচ্ছে হবে কিন্তু– দেবিনা বাধা দেবে
সে বাধা ভাঙতে পারি– ও একটু রাগ করবে,
কিন্তু জোর করবে না।
তোমাকে আমি জানি মিতুল—
তোমার রাগ নেই, বদলে তোমার তীব্র অভিমানের
কাছে আমি হেরে যেতে যেতে– তোমাকে হারিয়েছি।
এবার শীতে আমি কফি খাব না, খাব না সিগারেট,
দুপুরে রোদে পিঠ– শুধু তোমার ছবি এঁকে এঁকে
সেলিব্রেট করব শীতকাল;
তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে মিতুল
এসো না এবারের শীতে, এখানের গ্রীষ্ম তোমার জন্য নয়।

