নদী ও নারী
সমীর চট্টোপাধ্যায়
নদী ও নারীর কাছে কত ঋণ
জমে জমে হয়েছে পাথর
দিন যায়, দিন চলে যায়-
নদী ও নারী প্রতিক্ষণ আমাকে জাগায়
কত দিন ও রাত্রি, কত নির্জনতা
প্রতিদিন কত ভাঙন ও আকাঙ্ক্ষা
গড়ে ওঠে, ভেঙে যায়-
আমি জেগে থাকি,
নদীর জলের শব্দ, কত কথা
এই আকাশের নীচে নারীর স্পর্শ পাই
নদীর জলের শব্দ, কত গল্প-
প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন গড়ে ওঠে
প্রতিদিন, এক নতুন জীবন।
অবহেলা পেলে
আভা সরকার মণ্ডল
বিসর্জিত বাসনার দায়ভার কাঁধে নিয়ে
গর্ভবতী একটি নদীর খোঁজে ব্যাকুল ছিল বসতি
মাটি গলে যায় অগ্নিদগ্ধ মোমের মতো
দেবতাদের কাঠামো আটকে থাকে চরে!
হাঁটুজল বহন করে নৌকার সন্তাপ
কৃতকর্মের পাহাড়ে অনুতাপের জ্বর
চোখের সম্মুখে পরিণতি পরিস্ফুট হতেই
হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে দুরূহ দেয়াল ঘেরা অন্যায় ইমারত— উদ্দাম হয় ধ্বংস!
মাতৃত্ব ও সহজিয়া ক্ষোভ জমা রাখে,
পূর্ণতা পাওয়ার দায়বদ্ধতা থেকেও জন্ম নেয় না– আমূল ক্ষমার প্রবৃত্তি।
অবহেলা পেলে বরাবরই
বড় নৃশংস হয়ে ওঠে প্রকৃতি।
ফিরে এসো
প্রদীপ কুমার দাস
পাখিরা দাঁড়িয়ে আছে কাকতাড়ুয়ার মতো
ফসলের ঘ্রাণ নিতে,
ঘরের স্নানঘর থেকে নদী বয়ে যায়
ভালোবাসার নীল সন্ধ্যায়…
সবুজ মাঠ জেগে ওঠে পুতুল নাচের ইতিকথায়
ঘরের চৌকাঠ মাড়িয়ে জীবনের ছবির আঁকি
তুমি দাঁড়িয়ে আছো বৃষ্টির মতো
জানলার কার্নিশঘেঁষা টিপটিপ শব্দে–
ঘরের কলিংবেল বাজলে আমি সম্পর্ক খুঁজি
শীতের ইমেজে দাঁড়িয়ে থাকি শূন্য ব্যালকনিতে…
নদী ঝরনা হয়ে যায়
অস্থির সময়ের কলঘরে
প্রাচীন সময়ের সীমানা পেরিয়ে
তরাইয়ের জঙ্গল থেকে তিস্তার পাড় ঘেঁষে
আমাদের চেনা হিলকার্ট রোডে।
শীতের কাঁটা
পার্থসারথি মহাপাত্র
কনকনে কুলফি শীতল বাতাস
রেল বালকের ত্বকে কাঁটার শিহরন
কাঁটায় কাঁটা বোনে সোয়েটার।
ট্রেন আসতেই কাঁটা ভুলে এক ছুটে কামরায়
হাঁটা গলিতে হাত-পায়ের বিচিত্র কসরত
কামরার আবহ ও আবহাওয়া বদল
হাতে পেল কয়েকটা পাঁচ দশের সিক্কা–
শীত এখন অতীত, পকেটে ভর্তি উত্তাপ…
ব্যর্থ
বিশ্বজিৎ মজুমদার
চামড়া টানাটানি করে দেখলাম
অনেকটাই মোটা;
ফলত এত গালিগালাজ, কটুকথা–
কিছুতেই কিছু এসে গেল না।
তাই চামড়া কেটে
ডুগডুগি বাজানোর ইচ্ছেটা
ক্রমশ কমে যেতে লাগল,
ডুবন্ত জাহাজের মাস্তুলের
দিকে হাত বাড়াই;
ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে পড়তে
নিজেকে লুকিয়ে ফেলি সিংহাসনের পেছনে।
শুভদৃষ্টি
রবীন্দ্রনাথ রায়
শব্দেরা নীরব, চোখের জলই তার ভাষা,
বোবা নয় সে,
শুধু থেমে গেছে–
জীবন নিয়ে খেলা আর সত্যের আড়াল
কল্পনার ডানাগুলো ছিঁড়ছে
পুড়েছে নিশিদিন—
চোখের পাতায় অশ্রুপাতের বৃষ্টি,
স্বপ্নেও বারুদ, জ্বলছে জীবনের অনুশ্রুতি
মস্তিষ্কের প্রাণ–
জানি না কোন নদী বয়ে যাবে শরীর স্পর্শ করে
ঢেউয়ের তালে বাজবে
সপ্ত সুরের গান –
কল কল ছন্দে বাজবে
হৃদয়ের মাদল, কেঁপে উঠবে
সন্ধ্যার শালবনি—
আকাশটা ধূসর হলে
মাটিতেই খুঁজে নেব রং,
অন্ধকার পেরিয়ে দেখব–
দুর্গা মায়ের শুভদৃষ্টি।
ভাঙন
আশিস চক্রবর্তী
পূর্বাপর ভাঙনের যত গল্প শুনিয়েছি–
সব বিষাদে ভরা, স্তিমিত নিস্তাপ
দেশভাগের কত পরেও চোরাস্রোতের মতো
আজও রয়ে গেছে ভাঙনের নিভৃত বিলাপ।
কাঁটাতারের এপারে গঙ্গার পাড় ভাঙে
ওপারেও উদ্বেলিত পদ্মার দু’পাড়
ঘরবাড়ি ভাঙে, মন ভাঙে নীরবে
ধর্ম, ভাষা, মনুষ্যত্ব সব ভেঙে ভেঙে দেশ উজাড়।

