ভুল হিসেবি তছনছ
মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস
একান্ত নিজস্ব বলে কিছু নেই, অলস সম্পর্কগুলো
হাত ধরে হাঁটে, ভুল কিছু নদীর সহবাসে
অযথা বালির উপর খড়ের শয্যা পাতা
নির্বিঘ্নে আগুন সংযোগ নিবিড়তম
অলস ধারার মতো কিছু অখণ্ড ধারাপাত
হাত পেতে আছে দিগন্তের কাছে। হারিয়ে
যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ দাঁড়াব স্থির। তুলে নেব
অন্তহীন প্রবাহ, প্রেম ফুরোলে
শুকনো বুকে নদী জলে টান ধরে নৌকোয়…
ফোঁটা ফোঁটা ছড়ানো জীবন আঁচলে ঝরছেই
শেষ বিকেলের ট্রামলাইন
মলয় চক্রবর্তী
শেষ বিকেলের ট্রামলাইন বেয়ে যায় একলা এক চিন্তা,
তুমি আর আমি সেখানে উঠিনি বহু বছর।
চৌরাস্তার মোড়ে বিক্রেতার গলার স্বর—
যেন ভাঙা সুরের ভিতর হারিয়ে যাওয়া প্রতিশ্রুতি।
একটা ফোনকল না হওয়াই কখনো-কখনো কবিতা হয়,
অপেক্ষা ঘুরে ফিরে আসে পিয়নবিহীন খামে।
রোদ মিশে যায় কফির কাপে, তবু তুমি আস না—
আসলে কেউই আসে না, শুধু শব্দেরা ফিরে ফিরে আসে।
ঘড়ির কাঁটা থেমে গেলে বুঝি সন্ধ্যা নয়, স্মৃতি নামে—
বাতাসে পুরোনো পর্দার নড়াচড়া,
আর আমি এখনও বিশ্বাস করি,
প্রতিটি না-পাঠানো মেসেজেই একটু প্রেম থেকে যায়।
শরীর
মনোজ চক্রবর্তী
শরীর তো শুধু রক্ত-মাংসের নয়
শরীর যেন এক ক্যানভাসে আঁকা ছবি।
যদি তুমি শিল্পী হও–
সেই শরীরে তুলির আঁচড় কেটে দিও।
রক্ত-মাংস-হাড়ে নিমজ্জিত সেই শরীর
যেন এক চলমান শিল্প।
চোখের নীচে ক্লান্তির ছায়া
চামড়ার নীচে জমে থাকা জীবনের গল্প
হৃদয়ে জমে থাকা শব্দহীন বেদনা
হাঁটুতে জমে থাকা ছোট ছোট পরাজয়
তবু্ও যে দাঁড়িয়ে আছি—
জীবনের ভাঙা-গড়া ছবি নিয়ে
যেন এক নিঃশব্দ কাব্য।
উনানের ছায়া
গৌতম বাড়ই
পৃথিবীর কাদায় ডুবে আছে আমাদের ঘর-সংসার,
মা প্রতিদিন ঘাঁটেন সেই মাটি—
রাতের নিঃশেষে বাবার আঙুলে জেগে ওঠে এক দেবতা।
ঠোঁটে বিড়ি, চোখে ধোঁয়া,
আমরা শিশুরা গড়াগড়ি খাই—
যজ্ঞের নেউলে হয়ে ঘুরে বেড়াই ছাইয়ের মধ্যে।
যারা উড়তে চেয়েছিল পাখির মতো,
তারা এক এক করে হারিয়ে গেছে আকাশে।
মা এখনও পাথর ঠুকে আগুন জ্বালান,
বাবা দেখেন, আগুনে গলে যায় তাঁর মুখ।
মূর্তিগুলির খবর রাখে শুধু ছাই,
যেন ভাঙা প্রতিমার মতো সংসার দাঁড়িয়ে থাকে।
এখনও মা আগুনের পাশে গল্প করেন দানাশস্যের,
আর আমি ভাবি—
বাবা-মা কি আবার ছোটবেলার মতো
ভিন্ন ঘরে বাস করছেন নিঃশব্দে?
আবহমান
সুনীতা দত্ত
নিরক্ষরেখার শেষ প্রান্তে
অনন্ত যাপন আবহমান
মস্তিষ্কের শিরায় রক্তক্ষরণ
তবুও অধরা পথের নিশানা
আলোকবর্ষ পেরিয়ে
সৌরজগতের অচেনা গ্রহে
নিজস্ব ক্লান্তি পথ খোঁজে
নদী পাহাড় সব অচেনা
মুখ আর মুখোশের আড়ালে
গহিন গহ্বর হাঁ করে থাকে
গোগ্রাসে গেলে সময় কাল
নক্ষত্র লোকে অচেনা আমি
হতাশ বিষণ্ণ সময়ের সাথে
আঁধারের রেখা ছায়া পথে
দিন যাপন তবু অব্যাহত
ঘৃণা লজ্জা এক পাশে হাসে
শোকসন্তাপে পৃথিবীর ছায়া
দরবারি আলোয় গ্রন্থকীট
রক্ত প্রবাহে গার্হস্থ্য চিন্তা
পৃথিবীর শেষ প্রান্তে
আবার খুঁজে ফিরি মানবতা।
আগ্নেয়
আশিস চক্রবর্তী
সময় এখন প্রখর উদ্বেলিত, চারপাশে জ্বলন্ত চিতা
ভেতরে ভেতরে যতই পোড়ো নীরব ন্যায় সংহিতা
কিছুই দৃশ্যমান নয়, তবুও চাপা তুষ ধিকিধিকি জ্বলে
চাই বা না চাই আমরা সবাই এক অদৃশ্য আগুনের কবলে
খুব ধীর লয়ে আমাদের ঘিরে ফেলছে আগ্নেয় বলয়
বাহ্য রূপ যাই হোক ভেতরে খাক করা প্রবল প্রলয়
এসির শীতলতায় ভাবছ বেশ আছি নিরুদ্বিগ্ন নিস্তাপে
ভয়ংকর আঁচ প্রতিনিয়ত শরীর ও মনের পরিমিতি মাপে
ইউক্রেন রাশিয়া গাজায় হাজারো মানুষ নিথর নিশ্চুপ
গোলা বারুদে ওরা রোজ দেখে ভয়াবহ আগ্নেয় রূপ।
তোমায় লেখা শেষ চিঠি
বনশ্রী ঘোষ
ঘুমন্ত ঝগড়ায় তুমি যেভাবে ঝড় আনলে,
ভেঙেচুরে ছেড়ে এলাম বর্ষা বরফের মরশুমে।
তোমার বুক পকেটের বোতাম বরাবর
আদরের মতো কী একটা গন্ধ লেগে আছে!
তুমি ছেড়ে যাওয়ার পথের মাঝে,
ধু-ধু রাস্তা ঘিরে টিমটিমে আলো জ্বলছে।
তোমার ঠোঁটের গন্ধে ছাতিমফুলের ঘ্রাণ-
আমার দুশ্চিন্তায় ধোঁয়া ওঠে গরম ভাতের।
ডাকবাক্সে রাখা পাতাটা খোলা হয়নি এখনও,
চোখ খুলে দেখি অনেকটা পথ হাঁটা বাকি।
আমি ক্লান্ত পথিক দূর থেকে দূর পানে চেয়ে থাকি
নতুন রৌদ্রের ভিড়ে অজানা গল্প লেখার ছলে।

