রূপায়ণ ভট্টাচার্য
কী বলা উচিত একে?
স্ট্র্যাটেজির ভুল মেনে হাত তুলে দেওয়া, না ট্যাকটিক্স আমূল বদলে ফেলা?
একান্ত আলোচনায় বিজেপি নেতারা দুটোকেই মেনে নিচ্ছেন এক কথায়। স্ট্র্যাটেজি ভুল ছিল এবং সেটাকে পালটে নেওয়া হয়েছে ট্যাকটিক্স বদলের মাধ্যমে। প্রথমটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দ্বিতীয়টা ছোট ছোট পদক্ষেপ।
বিজেপির রাজ্য রাজনীতিতে প্রধান মুখের বদলের পর সেটা আরও প্রকট। বালুরঘাটের সুকান্ত মজুমদারের আমলে যা সম্ভব ছিল, কলকাতার শমীক ভট্টাচার্যের জমানায় তা চলছে না।
চলছে না, কারণ প্রসঙ্গটায় পুরোপুরি উলটোদিকে চলেছে গুলি। নিজেদের গুলিতে নিজেরাই গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
বিজেপির (BJP) সেই নেতাদের মুখগুলো চোখে ভাসছে বারবার। নির্বাচন এলেই যাঁরা ঝুলি থেকে বেড়াল বের করতেন। একটাই বেড়াল। উত্তরবঙ্গকে (North Bengal Separation) ভাগ করা, আলাদা রাজ্যের তত্ত্ব নিয়ে হুংকার।
যেন সব সমস্যার সমাধানের একটাই নাম। উত্তরবঙ্গ ভাগ। এই কথাটা সাম্প্রতিককালে উত্তরবঙ্গের পদ্ম নেতারা কে যে বলেননি, তা বলা খুব মুশকিল। ভোট এলেই এঁরা অ আ ক খ পড়ার মতো বলতে শুরু করে দিতেন, উত্তরবঙ্গ কত অবহেলিত। বিশাল জনসভা হলেও বলতেন, বাজারের পথসভা হলেও বলতেন।
তখন দিব্যি ভুলে যেতেন, উত্তরবঙ্গ ভাগ হলে অবধারিতভাবে দার্জিলিং আলাদা করার কথাও বলা শুরু হবে গোর্খাল্যান্ডপন্থীদের।
গৌড়বঙ্গেরও অনেকে নতুন উত্তরবঙ্গের মধ্যে থাকতে নারাজ। তাদের অনেকেরই শিলিগুড়ির তুলনায় কলকাতাই পছন্দ। উত্তরবঙ্গ ভাগ হলে কিন্তু দার্জিলিংও শেষপর্যন্ত উত্তরবঙ্গে থাকবে না। মালদা, রায়গঞ্জ, বালুরঘাটও থাকতে চাইবে না সেই উত্তরবঙ্গে। এই সহজ সরল সত্য তাঁরা বুঝতে চাইতেন না লোক তাতানোর খেলায়।
এবার বহুদিন পর দেখছি, কোনও ভোটের আগে বিজেপির সরাসরি কেউ বলছেন না, উত্তরবঙ্গ ভাগ করার কথা। তাঁরা বুঝে গিয়েছেন, ওই সমীকরণ লিখলে আবার পরীক্ষায় পাশ করা যাবে না। তাহলে কি এতদিন যে কথাগুলো বলে এসেছিলেন, তার সবই মিথ্যের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে। জানতেন, আদৌ হবে না। তবু বলে যেতেন তোতা পাখির মতো। বলতে হয় বলে। এখন বলতে বলতে হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আর বলছেন না।
আসলে, তলিয়ে দেখলে রাজনীতিতে ‘বঞ্চনা’ শব্দটা একটা খুব কার্যকরী মশলা। সেই মশলা দিয়ে রান্না করা ‘বঙ্গভঙ্গ’র ঝাল ঝাল তরকারিটা যে বাংলার মানুষ আর খাচ্ছে না, সেটা বোধহয় এতদিনে গেরুয়া নেতাদের বোধগম্য হয়েছে।
এতদিন তাঁরা উত্তরবঙ্গের আবেগকে উসকে দিয়ে একটা ফাটল ধরাতে চেয়েছিলেন। সমতলের রাজবংশী জনসমাজে এক কথা আর পাহাড়ে গিয়ে গোর্খাদের কানে আর এক মন্ত্র- এই ছিল তাঁদের দ্বিমুখী কৌশল। এতদিনে নয়াদিল্লির শাসক রাজনীতিকরাও বুঝতে পারছেন, উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার দাবি তুললে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দক্ষিণবঙ্গে। এমনিতেই তারা এখনও পর্যন্ত শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়িতে যথেষ্ট ভালো জায়গায়। বেশ বিপদে গৌতম দেব অ্যান্ড কোং। পুরোনো গান গেয়ে অন্য জায়গায় বিতর্ক বাড়াতে চান না পদ্ম নেতারা।
‘বঙ্গভঙ্গ’ শব্দটা বাঙালির মননে আজও একটা দগদগে ঘা। উত্তরবঙ্গের কয়েকটা আসনের জন্য গোটা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যে বোকামি, সেই অঙ্ক সম্ভবত এতদিনে তাঁদের মাথায় ঢুকেছে। এবং এখন, বিজেপির রাজ্য সভাপতি বা বিরোধী নেতা, দুজনেই দক্ষিণবঙ্গের। উত্তরবঙ্গ ভাগ করার কথা বললে তাঁদের এলাকায় প্রবল ভরাডুবির সম্ভাবনা। অতএব থামো হে বাপু। টুকটাক ছোটখাটো জনসভায় বলুন সমস্যা নেই, বড় মঞ্চে না বললেই হল!
তৃণমূলের নেতারা আবার যথারীতি অন্য যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইদানীংকালে এতবার উত্তরবঙ্গ গিয়েছেন, তাতে উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত কথাটাই সম্পূর্ণ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কথাটাকে ফেলে দেওয়া যাবে না একেবারে। তাঁর পার্টির নেতাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও এটা বলা যাবে না, মমতা উত্তরবঙ্গের দিকে নজর দেননি। বাগডোগরা বিমানবন্দর অ্যারাইভাল লাউঞ্জ থেকে তাঁর ছোটখাটো চেহারাটা বেরিয়ে আসছে, এমন ছবি বহুবার দেখা গিয়েছে।
যে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এই বিভাজনের দাবি তোলা হত, সেই যুক্তিও এখন ভোঁতা। মানুষ প্রশ্ন করতে শিখেছে- ‘রাজ্য ভাগ করলেই কি উন্নয়ন আকাশ থেকে পড়বে?’ ছত্তিশগড় বা ঝাড়খণ্ডের উদাহরণ তো চোখের সামনেই আছে।
উত্তরবঙ্গ থেকে ক’দিন আগেও দুই মন্ত্রী ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায়। পাঁচ বছরেও উত্তরের জন্য কিছুই করেননি। একজন, নিশীথ প্রামাণিককে দেখতে পাওয়া মানে উত্তরবঙ্গের আকাশে অরোরা বোলিয়ারিস দেখার মতো ব্যাপার। আর একজন, জন বারলা তো শিবির পালটে তৃণমূলে (TMC)। দুজনের কণ্ঠস্বরই শোনা যায় না আর।
মানচিত্র বদলালেই যে ভাগ্য বদলায় না- এই সহজ সত্যটা সাধারণ মানুষ বুঝে গেলেও, নেতারা এতদিন বুঝেও না বোঝার ভান করতেন। এখন ইন্টারনেটের জমানায় একটা বোতাম টিপলেই বোঝা যায়, ভারতের অধিকাংশ রাজ্যেই উত্তর-দক্ষিণ বিভেদ থেকে গিয়েছে। একটা অঞ্চল আর একটার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
ঘরের পাশে বিজেপি শাসিত বিহার, অসম এবং ওডিশায় ঘুরে আসি।
উত্তর অসমে বড় শহর বলতে শুধু তেজপুর। সাধারণত লোয়ার অসম, আপার অসম বলি আমরা। আপার অসম আসলে উত্তর অসম। সেখানে অনুন্নয়নের ছাপ সর্বত্র। কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে আসা পদ্মের নতুন পোস্টার বয় হিমন্ত বিশ্বশর্মা নতুন কিছু করতে পারেননি। উত্তর চূড়ান্ত অবহেলিতই থেকে গিয়েছে।
তাকানো যাক উত্তর বিহারের দিকে। সেখানে বেগুসরাই, সমস্তিপুর, মুজফফরপুর, কাটিহার, পূর্ণিয়ার মতো বড় শহর। বেগুসরাই হল এলাকার অলিখিত রাজধানী। কিন্তু সেখানেও সমস্ত আলো নিয়ে চলে যাচ্ছে দক্ষিণের পাটনা। বিহারের সব পর্যটন দেখবেন দক্ষিণেই- নালন্দা, রাজগীর, গয়া। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক ভালো ওই এলাকায়। বিহার থেকে অনেক রেলমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁরা কিন্তু কেউই উত্তর বিহারের কথা ভাবেননি। উন্নয়ন করেছেন পাটনা এলাকায়। ওখানে কাজ করলে প্রচার বেশি।
ওডিশাতেও এক দৃশ্য। সেখানে গেলে দেখা যাবে উত্তরে কেওনঝড়, সুন্দরগড়, ময়ূরভঞ্জ, বোলাঙ্গিরের মতো আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা খুব খারাপ। বাজার সব নিয়ে চলে গিয়েছে পুরী, ভুবনেশ্বর, কটক।
ঈশ্বরের আপন দেশ কেরলে যাই। সেখানেও উত্তর কেরলে, মানে মালাবার অঞ্চলে দারিদ্র্য অনেক বেশি। এবং সেখানেও, সিপিএম শাসিত একমাত্র রাজ্যেও ক্ষীর খেয়ে চলে যাচ্ছে দক্ষিণের তিরুবনন্তপুরম বা কোচি। ম্যাপের অবস্থা ওরকম যখন, তখন কী আর করা যাবে?
বিজেপি শাসিত রাজস্থানেও কিন্তু এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, শিক্ষা এবং আয় অনেক ভালো দক্ষিণে। পরিকাঠামোও তাই। এই সমীক্ষাটা হয়েছিল উত্তর রাজস্থানের বিকানের আর দক্ষিণ রাজস্থানের উদয়পুরকে নিয়ে।
কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটকে চলুন। সেখানেও উত্তরকে হেলায় হারিয়ে দেয় দক্ষিণ। কেননা বেঙ্গালুরু, মহীশূর, ম্যাঙ্গালুরু, তিনটি বড় শহরই রাজ্যের দক্ষিণে। এবং যা স্বাভাবিক, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো সবেতেই দক্ষিণ এগিয়ে।
মোদি রাজ্য গুজরাটে উত্তরে আহমেদাবাদ বা গান্ধিনগর থাকলেও দক্ষিণ গুজরাট ব্যবসা ও শিল্পে এগিয়ে। কারণ সেখানে সুরাট, বালসাড, ভারুচ এবং নকশারি চারটে শহর মিলে অনেক বেশি এগিয়ে দিয়েছে গুজরাটকে। অন্তত শিল্প এবং ব্যবসায়।
আমাদের এখানে দিল্লি থেকে এসে বেশ কিছু নেতা উত্তরবঙ্গ বঞ্চিত, এই সুর তুলতেন স্থানীয়দের কথায়। তাঁদের কিন্তু প্রশ্নের সামনে পড়তে হয়নি, প্রায় সারা দেশেই উত্তরের এমন দুরবস্থা কেন?
মজা হল, যাঁরা এতদিন গলার শিরা ফুলিয়ে বলতেন ‘উত্তরবঙ্গ আলাদা চাই’, আজ তাঁরা স্পিকটি নট। এই নীরবতা একটা কথা প্রমাণ করে। তাঁদের সেই দাবিগুলোর পিছনে কোনও আদর্শগত ভিত্তি বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল না। ছিল শুধুই ভোটের হাওয়া গরম করার সাময়িক অপকৌশল। আজ যখন দেখছেন হাওয়া উলটো দিকে বইছে, তখন সেই ঝুলি আর বেড়াল দুটোই লুকিয়ে ফেলেছেন।
অপেক্ষা করছি, বাকি কয়েকটা দিনে কেউ নিস্তরঙ্গ তিস্তা-তোর্ষা-মহানন্দার জলে আবার ‘উত্তরের বঞ্চনা’র পাথরটি ফেলে দেন কি না। স্ট্র্যাটেজি আর ট্যাকটিক্সের সূক্ষ্ম ফারাকটাই বা বাস্তবে কতখানি কাজে লাগানো যায়!

