রাজনীতির আঙিনায় প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক বারবার সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক মোহভঙ্গ ঘটিয়ে চলেছে।
সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়
বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক নেতারা প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে মিথ্যা বলে চলেছেন৷ লক্ষ করলে দেখা যায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মিথ্যাচার বিশেষত বেড়ে যায় নির্বাচনের মরশুমে৷ এইসব প্রতিশ্রুতির নজির সাধারণ জনগণের অজানা নয়।
শুধু এদেশ বলে নয় বিদেশেও রাজনৈতিক মিথ্যাচার বারে বারে ঘুরেফিরে এসেছে৷ কয়েক বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের মিথ্যাচার এক প্রকার বলা চলে সেই সবের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনে কারচুপি-জালিয়াতির মিথ্যা অভিযোগ শুধু তোলা নয়, সেবার তিনি হারলেও উলটে তিনি নিজেই নিজেকে জয়ী বলে দাবি করেন। আর এই মিথ্যার মাধ্যমেই তিনি তাঁর সমর্থকদের উসকে দিয়েছিলেন একেবারে ক্যাপিটল ভবনে রক্তক্ষয়ী হামলা চালাতে৷ আবার ব্রিটেনে ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটের সময় বরিস জনসনের মিথ্যা দাবি নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি৷ কিংবা এদেশে নোটবন্দি করার সময় মোদি সরকার জনগণকে বুঝিয়েছিল এইভাবে সিস্টেম থেকে কালো টাকা দূর করে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আটকানো হবে৷ কিন্তু বাস্তবে সেটা যে হয়নি তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে জনগণ৷ আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ রাজ্যে কোনওভাবেই এসআইআর করতে দেবেন না বলেছিলেন কিন্তু যখন তা শুরু হল তখন তো লোকজনকে ফর্ম ফিলআপ করানোর জন্য তৃণমূল হেল্প ডেস্ক বসিয়ে দিল৷ এমন সব ঘটনা দেখে মনে হতেই পারে মিথ্যাচার রাজনীতির অঙ্গ৷ বিশেষত মিথ্যের আশ্রয় নিয়ে ভূরিভূরি প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের মন জয় করাটাই হল নেতাদের স্বভাব৷
নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা দখল করতে হয় ঠিকই৷ কিন্তু সেইগুলি একেবারে যে পালন করতে রাজনৈতিক দলগুলি চায় না একথা বলাটাও উচিত হবে না৷ কারণ রাজনৈতিক নেতারাও বোঝেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি তাদের ক্ষমতায় এনে দিয়েছে সেগুলি পালন করাটাও জরুরি৷ তাই তো বিজেপিকে ক্ষমতায় এসে তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ করতে দেখা যায়৷ ঠিক তেমনই পশ্চিমবঙ্গে বামেরা ক্ষমতায় এসে ভূমি সংস্কার কিংবা তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতায় এসে টাটাদের কাছ থেকে জমি নিয়ে সিঙ্গুরের কৃষকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ইতিবাচক ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না৷
অনেক সময় সদিচ্ছা থাকলেও নানা রকম জটিলতায় প্রতিশ্রুতি পালন সম্ভব হয় না৷ বেশ কয়েক বছর আগে দিল্লিতে তখন ইউপিএ সরকার চলছে, সেই সময় কলকাতায় একটি বণিকসভা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, প্রতিশ্রুতি পালন করতে কতটা সক্ষম তাঁদের দল৷ তখন তিনি জানিয়েছিলেন, কোনও একটি দল এককভাবে ক্ষমতায় এলে সে দল যতটা প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারে জোট সরকার গড়লে ততটা পারে না৷ কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জনগণ এককভাবে কোনও দলকে ভোট দিলে এক রকম প্রতিশ্রুতি পালন সম্ভব কিন্তু সেই ভোট বেশ কয়েকটি দলের মধ্যে ভাগ করে দিলে সেই প্রতিশ্রুতিও খণ্ডিত হয়ে যাবে৷ অর্থাৎ সেদিন তাঁর বার্তা ছিল- জোট রাজনীতি কখনো-কখনো প্রতিশ্রুতি পালনে অন্তরায় হতে পারে৷ জোটসঙ্গীদের চাপে অনেক সময় বড় শরিককে ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করা থেকে পিছিয়ে আসতে হয়৷
কিন্তু আবার বিরোধী থাকাকালীন কোনও দল ক্ষমতার থাকা সরকারের বিরুদ্ধে যেসব বিষয়ে সরব হয়েছিল সেই দলটিই পরবর্তীকালে ক্ষমতায় এসে আগের শাসকদলের মতোই একই আচরণ করলে সেটা অবশ্যই মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়৷ মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে তাঁর দলকে আধার কার্ড নিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করতে দেখা যেত৷ অথচ ক্ষমতায় এসে এই মোদি সরকার উলটে যেভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণকে আধার সংযোগ করতে চাপ দিয়েছে তা নজিরবিহীন৷ কিংবা রান্নার গ্যাসের দাম নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারের চরম বিরোধিতা করে নিজের আমলে মোদি যেভাবে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছেন তা হতাশজনক৷ ফলে এইসব দেখে মনে হতেই পারে প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব নয় জেনেও নির্বাচনি বৈতরণি পার হতে মিথ্যার আশ্রয় নেয় রাজনৈতিক দল৷
রাজনৈতিক দলগুলির নীতিতেও সময়ের সঙ্গে প্রতিশ্রুতির বিষয় বদলও খুবই স্বাভাবিক ঘটনা৷ একটা সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা রকম ভাতা দেওয়ার জন্য অন্য রাজনৈতিক দলগুলি সমলোচনা করলেও যখন উপলব্ধি করল ওই ভাতা তৃণমূলকে ভোটের ময়দানে সুবিধা করে দিচ্ছে তখন অন্য দলগুলিও সেই রকম ভাতা আরও বেশি করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া শুরু করে৷
যে কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইস্তাহার হল সেই দলের উদ্দেশ্য এবং প্রতিশ্রুতির রূপরেখার গুরুত্বপূর্ণ নথি। ক্ষমতায় এলে সাধারণত ওই দল সেই রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ করতে চায়৷ সেক্ষেত্রে নীতিগতভাবে এটা মেনে নিতেই হয় ইস্তাহার প্রণয়ন রাজনৈতিক দলগুলির অধিকার৷ কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য এমন কিছু প্রতিশ্রুতি বা প্রস্তাবের অবাঞ্ছিত প্রভাবকেও উপেক্ষা করা যায় না।
বিশেষত রাজনৈতিক দলগুলির ভাবা উচিত বিনামূল্যে কিছু দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যেন সস্তার জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য ফাঁকা আওয়াজ না হয়ে যায়৷ এই ধরনের প্রতিশ্রুতি পালনের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রভাব কেমন হবে এবং সেই সংক্রান্ত অর্থায়নের পরিকল্পনার বিশদ বিবরণ ভোটারদের সামনে তুলে ধরা একান্ত জরুরি৷ অথচ সেভাবে তথ্য তুলে ধরতে কতটা সক্রিয় দলগুলি? ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দলগুলিকে আরও বেশি করে দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার৷ রাজনৈতিক দলগুলিকে বুঝতে হবে- শুধুমাত্র জয়প্রিয়তার স্বার্থে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে তা গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিকৃত করতে পারে৷ শুধুমাত্র সেই প্রতিশ্রুতির উপর ভোটারদের আস্থা চাওয়া উচিত যা পূরণ করা সম্ভব৷
রাজনীতিবিদদের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নেওয়ার প্রধান কারণ হল তাঁরা দায়িত্বে থাকাকালীন প্রতিশ্রুতি পালনের বিষয়ে কোনও রকম ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ করতে বসেন না। তাছাড়া দেখা যায় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলি যখন বাস্তবতা, ইতিহাস এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তাদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে৷
রাজনীতিবিদরা হয়তো ভাবতেই পারেন, ভুয়ো খবরের যুগে জনগণ সচেতন থেকে প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য যা বোঝার বুঝে নেবে৷ বিশেষত বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি তথা ইন্টারনেটের যুগে সত্য-মিথ্যা যাচাই করাও তাদের জন্য তেমন কঠিন কাজ হবে না। আবার এটাও ঠিক বেশ কিছুদিন ধরে রাজনৈতিক দল এবং নেতাদের আচরণ দেখে জনগণ কখনোই আশা করে না রাজনীতিবিদরা সম্পূর্ণরূপে নিষ্কলঙ্ক এবং সত্যবাদী হবেন৷ কিন্তু তাই বলে তাঁদের কাছ থেকে একেবারে নির্জলা ডাহা মিথ্যাও বোধহয় এখনও তারা আশা করে না? তবে আজ না হলেও আগামীদিনে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের সম্পর্কে জনগণ ততটা আশাহত হলে সেটা গণতন্ত্রের পক্ষেও খুব একটা ভালো লক্ষণ হবে না৷
(লেখক সাংবাদিক)



