বৃহস্পতিবার, রাত তখন ২টো ২৫। শিলিগুড়ির তিনবাত্তি মোড় যেন জনহীন প্রেতপুরী। হেডলাইটের তীব্র আলোয় মাঝেমধ্যে বুলেটের গতিতে ছুটে যাচ্ছে দানবীয় ট্রাক। সেই ধুলো আর আলো-আঁধারির মাঝে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে এক অসহায় বাবা এবং তাঁর কোলের একরত্তি মেয়ে। মশার যন্ত্রণায় কেউই এক জায়গায় স্থির থাকতে পারছেন না। ‘মা এখনও আসছে না কেন?’ থেকে থেকেই বাবাকে কাতর সুরে জিজ্ঞাসা করছে মেয়ে। বাবার চোখে তখন একদিকে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে তীব্র ক্রোধ। ঘরে আগলে রাখার কেউ নেই, তাই গভীর রাতে কোলের শিশুকে বাইকে চাপিয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া গতি নেই। কারণ, তাঁর স্ত্রী ভারতের ‘মহা-গণতন্ত্র’-এর যজ্ঞে শামিল হয়েছেন। তিনি পোলিং অফিসার। নির্বাচন কমিশন তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেবে না। সে দায় ভোটকর্মীর নিজেদের। অগত্যা অসহায় পরিবারের লোকেদেরই নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে রাস্তায় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
রাত ৩টে ৪৫। ধুলো উড়িয়ে একটি গাড়ি থামল। হাতে ব্যাগ আর কাঁধে বেডরোল ঝুলিয়ে ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়া মা নামতেই মেয়েটি ছুটে গিয়ে তাঁকে জাপটে ধরল। মায়ের চোখে তখন জল। সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে না পারলে হয়তো যন্ত্রণা বুঝতাম না। এই দৃশ্যের পিছনের সত্যটি বীভৎস। ডিসিআরসি-তে ইভিএম ও নথিপত্র জমা দেওয়া হয়ে গেলে কমিশনের কাছে ভোটকর্মীরা বোঝা হয়ে যান। মাঝরাস্তায় একজন মহিলা ভোটকর্মীকে কার্যত ছুড়ে ফেলে দিয়েই তাদের ‘পবিত্র দায়িত্ব’ শেষ করেছে কমিশন। নিঝুম রাতে, একাকী একজন নারী কীভাবে বাড়ি পৌঁছাবেন, তাঁর জীবনের বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা আছে কি না, তা নিয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা কমিশন কর্মকর্তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই।
গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হওয়া এই মানুষগুলো কি কেবলই ব্যবহারের পণ্য? কমিশনের এই চরম অসংবেদনশীলতা কবে শেষ হবে? যাঁরা অন্যের ভোট সুনিশ্চিত করেন, তাঁদের নিজের জীবনের ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও কি দিতে পারে না এই রাষ্ট্রযন্ত্র? তিনবাত্তির ওই দৃশ্য কোনও উৎসবের হতে পারে না, সেটাকে নির্বাচন কমিশনের চরম প্রশাসনিক দেউলিয়াপনার নগ্ন দলিল বলা যেতে পারে।
সেই রাতে ঘণ্টাদুয়েক তিনবাত্তি মোড়ে দাঁড়িয়ে কমিশনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা চাক্ষুষ করছিলাম। শুধু মহিলা ভোটকর্মীরাই নন, বহু পুরষ ভোটকর্মীও মধ্যরাতে অসহায়ের মতো কেউ হেঁটেই বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছিলেন, কেউ নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনের উদ্দেশে। কেউ আবার ক্লান্ত শরীরে ফুটপাথেই বসে পড়েছিলেন। নিরপেক্ষভাবে ভোট পরিচালনা করতে গেলে কারও না কারও চক্ষুশূল হতেই হয়। ফলে ভোটকর্মীদের প্রতি আক্রোশ থাকে অনেকেরই। নিঝুম রাতে নির্জন রাস্তায় সেই আক্রোশ মেটাতে দুষ্কৃতীরা হামলা চালালে, জীবনহানি ঘটলে দায়ভার কার? অঘটন ঘটলে কমিশন যে হাত গুটিয়ে নেবে তা ২০১৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন ইটাহারের সোনাপুর জুনিয়ার বেসিক স্কুলের ৮৪ নম্বর বুথের প্রিসাইডিং অফিসার রাজকুমার রায়।
গণতন্ত্রের মহোৎসবে যখন সাফল্যের রোশনাই ছড়ায়, তখন প্রদীপের তলার নিকষ অন্ধকারটুকু চিরকাল অলক্ষ্যেই থেকে যায়। রাজ্যে সদ্যসমাপ্ত প্রথম দফার ভোটগ্রহণ পর্বটি আপাতত রক্তপাতহীন এবং কার্যত হিংসামুক্ত। বুথের বাইরে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের হাসিমুখ এবং ভোটদানের পর কালির দাগ লাগা আঙুলের ছবি, এই সফল কোলাজেই আপাতত তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে প্রশাসন। আর এই অভাবনীয় সাফল্যের কৃতিত্বের সিংহভাগটাই অবলীলায় নিজেদের ঝুলিতে পুরে নিয়েছে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী। বাকি যেটুকু পড়ে ছিল, তা নির্বাচন কমিশনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দপ্তরে বসা বড় কর্তারা নিজেদের মধ্যে পরম তৃপ্তিতে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। কিন্তু এই গোটা প্রক্রিয়ায়, উৎসবের এই আড়ম্বরপূর্ণ মঞ্চের ঠিক পেছনে, চিরকালের মতো এবারও পর্দার আড়ালেই থেকে গেলেন গণতন্ত্র রক্ষার আসল ও অদৃশ্য কারিগররা, আমাদের ভোটকর্মীরা।
সাফল্যের ঝকঝকে শংসাপত্রে তাঁদের নাম কোথাও লেখা নেই, ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট তাঁদের ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত মুখগুলোকে এড়িয়ে গিয়েছে পরম সন্তর্পণে। কোনও জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় না। এর পিছনে থাকে হাজার হাজার সাধারণ সরকারি কর্মচারীর অমানুষিক পরিশ্রম, বিনিদ্ররজনী এবং বুকচাপা আতঙ্ক। পোলিং অফিসার থেকে শুরু করে প্রিসাইডিং, সেক্টর বা অবজার্ভার, সমস্ত স্তরের এই ভোটকর্মী বা ভোট ম্যানেজাররা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, সুখ ও প্রয়োজনকে দূরে সরিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় কর্তব্যে ব্রতী হন। ভোটের কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয় তাঁদের অন্তহীন দৌড়। ধূলিমলিন ডিসিআরসি থেকে ভারী ইভিএম, ভিভিপ্যাট এবং বস্তাভর্তি নির্বাচনি সামগ্রী নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে তাঁরা পাড়ি জমান সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা গন্তব্যে। কোথাও কোথাও কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে পৌঁছাতে হয় প্রত্যন্ত গ্রামের বুথে, যেখানে হয়তো পানীয় জলের ন্যূনতম সংস্থানটুকুও নেই। বুথের ভাঙা বেঞ্চে পিঠ ঠেকিয়ে মশার কামড় সহ্য করে রাত জাগা, অস্বাস্থ্যকর শৌচাগার ব্যবহার করা, এই চরম প্রতিকূলতাগুলোর সঙ্গে আপস করেই তাঁরা হাসিমুখে কাজ করে যান। হাজারো কষ্ট উপেক্ষা করে, অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁরা প্রতিটি ভোটারের অধিকার সুনিশ্চিত করেন। তবুও, দিনের শেষে তাঁরা থেকে যান চরম উপেক্ষিত। তাঁদের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটি শুকনো ধন্যবাদ দেওয়ার মতো সৌজন্যটুকু দেখানোরও কেউ থাকে না।
ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে শুরু হওয়া প্রবল মানসিক চাপ আর শারীরিক পরিশ্রমের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও অমানবিক দৃশ্যটি দেখা যায় ভোট শেষের রাতে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর, সমস্ত আইনি জটিলতা ও নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, যখন একজন ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ভোটকর্মী ডিসিআরসি-তে ফিরে ইভিএম জমা করেন, তখন চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শরীর আর বইতে চাইছে না, চোখ বুজে আসছে ঘুমে। তখন কমিশন তাঁদের কার্যত ভাগ্যের হাতে, অথবা বলা ভালো, ভগবানের নামে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। ইভিএম জমা নেওয়ার পর ওই মানুষগুলো কীভাবে নিজেদের বাড়ি ফিরবেন, এত রাতে তাঁদের জন্য ন্যূনতম কোনও পরিবহণের ব্যবস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসন থাকে নিশ্চুপ। যেন ইভিএম জমা পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভোটকর্মীদের আর কোনও মূল্য নেই রাষ্ট্রের কাছে! তাঁরা, নিরাপদে নিজের পরিজনদের কাছে পৌঁছাতে পারলেন কি না, সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম প্রয়োজনবোধটুকুও কেউ করে না।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হল, এই উপেক্ষিত ভোটকর্মীদের মধ্যে এখন একটি বিরাট অংশজুড়ে রয়েছেন মহিলারা। একজন নারী, যিনি সারাদিন রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পালন করলেন, মাঝরাতে তাঁকে কেন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে? কেন তাঁকে আতঙ্কে কাঁটা হয়ে, ছিনতাইবাজ বা দুষ্কৃতীদের ভয়ে সিঁটিয়ে থেকে বাড়ির পথ ধরতে হবে? শান্তিতে ভোট করানোর গালভরা দাবির আড়ালে নির্বাচন কমিশনের এই চরম অমানবিকতা এবং নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা কি আদৌ ক্ষমার যোগ্য?
কেউ কেউ বলছেন, ‘এভাবেই তো হয়ে আসছে, এ আর নতুন কী!’ কিন্তু এটা কি কোনও সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যুক্তি হতে পারে? বছরের পর বছর যে ভুল হয়ে আসছে, তাকে অযুক্তির মোড়কে প্রশ্রয় দেওয়াটা চূড়ান্ত মূর্খামি। ভোটকর্মীদের সামান্য ভুল হলে, পান থেকে চুন খসলে, নির্বাচন কমিশন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করে না। মিনিটের মধ্যে তাঁদের হাতে পৌঁছে যায় শোকজ নোটিশ, দেওয়া হয় সাসপেনশনের হুমকি। কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে ভোটকর্মীদের গর্দান নিতে যে কমিশন সদা প্রস্তুত, সেই একই কমিশন কেন নিজের কর্তব্যে এমন চরম অবহেলা করবে?
অথচ খুব সহজেই সমস্যার সমাধান করা যায়। ভোটকর্মীদের বাড়ি ফেরার প্রতিটি গাড়িতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তারক্ষী রাখা দরকার। তাঁদের কাছে একটি নির্দিষ্ট রেজিস্টার থাকবে। মাঝরাস্তায় নয়, প্রতিটি ভোটকর্মীকে নিরাপদে বাড়ি বা নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে রেজিস্টারে স্বাক্ষর করিয়ে নেবেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ফলে ভোটকর্মীর নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত হবে এবং তিনি নিরাপদে বাড়ি পৌঁছালেন কি না তাও নিশ্চিত করা যাবে।
নির্বাচন কমিশনের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। কমিশনের এই অন্ধকার দিকটিতে তীব্র আলো ফেলা জরুরি। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফায় যেন ভোটকর্মীদের বাড়ি ফিরে যাওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা উপেক্ষিত না থাকে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। যতদিন না সেই নিশ্চয়তা মিলছে, ততদিন ‘রক্তপাতহীন’ নির্বাচনের বড়াই করাটা নগ্ন পরিহাস হয়েই থেকে যাবে।



