- অরবিন্দ ভট্টাচার্য
আমার খুব ছোটবেলায় দিদির বন্ধু ধুন্দা দিদিদের বাড়িতে একবার চুরি হয়েছিল। সদ্য উদ্বাস্তু হয়ে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত ধুন্দাদিদের ছিল দরমার বেড়া দেওয়া দু’তিনটি টিনের ঘর, কাঁচা মেঝে। সিঁধ কেটে চোরটা ঢুকেছিল ওদের রান্নাঘরে। কাঁসার বাসনকোসন হাঁড়ি কড়াই হাতা খুন্তি, পেতলের ল্যাম্পো বোঁচকায় ভরে পালাতে গিয়ে ভোররাতে পাশের বাড়ির রমণীকাকার হাঁকডাকে পাড়ার লোকের হাতে ধরা পড়ে যায় চোরটা। জীবনে সেই প্রথম চোর দেখলাম! সারা গায়ে কালিঝুলি মাখা হাড় জিরজিরে তৈলাক্ত লোকটাকে ঘরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। যে যার মতো এসে হাতের সুখ করে যাচ্ছে। চিৎকার করতে করতে এক সময় সংজ্ঞা হারিয়ে ঘাড়টা নেতিয়ে পড়েছিল ওর। তার মধ্যেই পাড়ার বয়স্ক মানুষ অনেকেই গালাগাল মিশ্রিত জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে, ‘হালার পো হালা, কাজ কইরা খাইতে পারোস না। পরের বাড়ি চুরি করস, লজ্জা করে না।’
এরপর কোনও এক দশমীর দিন বিসর্জনের ঘাটে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে পাড়ার ঝুমপুরিদির গলা থেকে সোনার চেন চুরি হয়ে গেল। সেই খবর পাড়ায় বয়ে নিয়ে এলেন, বনমালীকাকু। দিদিদের সাবধান করে বলে গেলেন, সোনার হার, দুল এ সব পরে কখনও ভিড়ের মধ্যে যাবি না। গ্রামগঞ্জে গোরু চুরিটা আগে থেকেই চলত। এখনও চলে। কখনো-কখনো গভীর রাতে সংগঠিত চোরের দল আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত হয়ে পিকআপ ভ্যান নিয়ে এসে গৃহস্থের গোয়াল ফাঁকা করে দেয়। তারপর নদীপথে অথবা কাঁটাতারহীন সীমান্ত পেরিয়ে ভোররাতে বাংলাদেশ পাচার হয়ে যায় সেই গোরু। সব ক্ষেত্রেই লোকাল ক্যাচ থাকে। কোনওদিন কোনও গোরু চোর পুলিশ ধরেছে বলে জানতে পারিনি। গোনাপড়া করত তান্ত্রিক ল্যাংড়া সাধু। তার কাছে চুরি হয়ে যাওয়া গোরুর খবর জানতে গেলে, চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে মন্ত্রতন্ত্র পড়ে নির্দ্বিধায় বলে দিত, “তোমার গোরু সোজা দক্ষিণ দিক ধরি চলি গেইচে। ওটি আর পাওয়া যাইবে না।” আসলে দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশ এটা ল্যাংড়া সাধু বিলক্ষণ জানত!
তখন বাজারে ভিড়ে অথবা চলতি বাসে দু’একটি পকেটমারির ঘটনা ভেসে আসত। ধরা পড়লে তুমুল ধোলাই। আর গ্রামগঞ্জে ধরা পড়লে বাঁশডলা ছিল প্রাথমিক শাস্তি, তারপর থানাপুলিশ। মাঝেমধ্যে মব লিঞ্চিংও হত। এরপর শুরু হল সাইকেল চুরি। সামনে পেছনে দুটো তালা লাগিয়েও সাইকেল রক্ষা করা যেত না বাজারহাট থেকে। আমার নিজেরও দু’বার সাইকেল চুরি হয়েছে। একবার অনেক দামে কেনা ডায়নামো লাইট লাগানো ফুল চেনকভারওয়ালা বিএসএ সাইকেল। ডাইরি ফাইরি করে কখনও পাওয়া যেত না। পুলিশ বলত বাংলাদেশে পাচার হয়ে গেছে। তারপর বেশ কিছুদিন গাড়ি চুরি, বাইক চুরি এসব চলল। এখনও মাঝেমধ্যে বাইক চুরির ঘটনা গোচরে আসে। শুনি সে সবের ইঞ্জিন দিয়ে নাকি প্রতিবেশী দেশে মোটরবোট চলে। একবার কোচবিহার থেকে চুরি হয়ে যাওয়া অ্যাম্বাসাডর গাড়ি রুনুদা (কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডেপুটি কমিশনার রুনু গুহনিয়োগী) চোর সহ কলকাতার তালতলা থেকে উদ্ধার করে দিয়েছিলেন।
আট/নয়ের দশকে রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে গাড়ি/মোটর সাইকেল থামিয়ে ডাকাতির ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটত। বিশেষ করে, চিলাপাতা বনাঞ্চলে এবং আলিপুরদুয়ার-হাসিমারা হাইওয়েতে পরবস্তি, গরমবস্তি আর নিমতির কাছে। মাঝেমধ্যে মানুষ খুনও হয়ে যেতেন এইসব ডাকাতির ঘটনায়। ট্রেনে বাসে অসংখ্য ডাকাতির ঘটনা ঘটত। এখন সেসব নেই বললেই চলে। এক সময় জেলাজুড়ে গ্রামগঞ্জে অসংখ্য ডাকাতির ঘটনা ঘটত। লাঠি–বন্দুক–রামদা নিয়ে ডাকাতরা গৃহস্থের বাড়ি বিশেষ করে তখনকার দিনের ধনীদের বাড়িতে চড়াও হত। মারধর করে বাড়ির মানুষজনের হাত-পা বেঁধে চোখের সামনে দিয়ে সমস্ত টাকা, গয়নাগাটি ডাকাতি করে নিয়ে যেত ডাকাত সর্দাররা। ডাকাত মোকাবিলায় গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠল গ্রাম রক্ষীবাহিনী (আরজি পার্টি)। একসময় ডাকাত ধরলেই পিটিয়ে মেরে ফেলা হত। তারপর শুরু হয়ে গেল, চোখ তুলে নেওয়ার পালা। সে এক বীভৎস কাণ্ড! ডাকাতি এমনকি ছোটখাটো চুরির অভিযোগেও গ্রামগঞ্জে খেজুর কাঁটা কখনও বা বড়শি দিয়ে চোখ তুলে নিয়ে রক্তাক্ত চোখের কোটরে চুন ঢেলে দিয়ে চিরতরে অভিযুক্তের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়ার এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে উঠল গোটা জেলা। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চূড়ান্ত শিক্ষা দিতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের কাছে একসময় এটা একটা হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। আটের দশকে তুফানগঞ্জের ফলিমারি গ্রামের কংগ্রেস সমর্থক দরিদ্র কৃষক চাঁদমোহন সাহার চক্ষু উৎপাটনের ঘটনা এরকম নিষ্ঠুরতার জ্বলন্ত ইতিহাস হয়ে আছে। দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে বাকি জীবনটা ছোট্ট মেয়ের হাত ধরে ভিক্ষা করেই কাটিয়ে দিতে হয়েছে হতদরিদ্র চাঁদমোহনকে। এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে। বাম আমলে ১৯৮২ সালের জুন মাসে তুফানগঞ্জের জোড়াই-রামপুরে ডাকাতির অভিযোগে একদিনে ১১ জন মানুষকে খুন করে ফেলার ঘটনা স্মরণীয় হয়ে আছে এই জেলায়। এঁদের মধ্যে অন্তত দুজন, শ্রীনাথ বর্মন আর মিনত বর্মন ছিলেন কংগ্রেস সমর্থক। মায়ের শ্রাদ্ধের আসর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা হয়েছিল তাঁদের। পুলিশের খাতায় তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও চুরি ডাকাতির অভিযোগ ছিল না।
আজকাল অপরাধের ধরন আমূল পালটে গেছে। গ্রামগঞ্জে চুরি ডাকাতি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে মানুষের হাতে টাকাপয়সা আসছে। উন্নয়নের টাকা হাতে হাতে ঘুরছে। গ্রামীণ রাজনীতিতেও ‘প্রফেশনালিজম’ চলে আসাতে গ্রামের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। সম্ভবত তাই অপরাধের ধরনও বদলেছে। আগে বালি চুরি, পাথর চুরি, ল্যান্ড মাফিয়া, সরকারি খাল, বিল, নদীর চর চুরি করে বেচে দেওয়া, পাহাড় বনাঞ্চল আর চা বাগানের জমি দখল করে বেচে দেওয়া, ছক কেটে সোনার দোকানে ডাকাতি, কয়লা চুরি, বাইরে থেকে শুটার নিয়ে এসে সুপারি দেওয়া এইসবের কথা আমরা কখনও শুনিনি, দেখিওনি। এখন আর তাসফাস নিয়ে কেউ জুয়া খেলে না। জুয়ার জায়গা দখল করে নিয়েছে বেটিং নামক ছন্দোময় ইংরেজি শব্দ। সবকিছুই যেন ওয়েল অর্গানাইজড!



