Tuesday, July 23, 2024
Homeসম্পাদকীয়উত্তর সম্পাদকীয়এভাবে চললে বহু স্কুলে তালা ঝুলবে

এভাবে চললে বহু স্কুলে তালা ঝুলবে

 

  • কৃষ্ণ দেব

ক্লাস চালানোর মতো শিক্ষক সংখ্যা এখন আর স্কুলে নেই। সংস্কৃতের শিক্ষক অঙ্কের ক্লাসে যাচ্ছেন! ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে গল্পগুজব করে ফিরে আসছেন! গোঁজামিল দিয়ে ক্লাস চালাতে বাধ্য হচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। গ্রামের স্কুলগুলি ফাঁকা, শিক্ষকদের বড় অংশই উৎসশ্রীর সুযোগে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। তাই গ্রামের পড়ুয়ারা শহরমুখী হচ্ছে, কারণ শহরের স্কুলগুলিতে ক্লাস চালানোর মতো কিছু হলেও শিক্ষক আছেন।

মামলা মোকদ্দমা, নিয়োগ দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে নতুন করে আর শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হয়নি, ফলে গ্রামীণ স্কুলে পঠনপাঠন তলানিতে! বিভিন্ন স্কুলে ছাত্রসংখ্যা দ্রুত কমছে। একটা সময় দেখেছি এলিট শ্রেণির অভিভাবকরাও শহরের বাংলামাধ্যম স্কুলেই তাঁদের সন্তানদের ভর্তি করতেন। নতুন প্রজন্মের বাবা-মায়েরা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ইংরেজি স্কুলমুখী হয়েছেন। যে কোনও জনপদের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষও ছেলেমেয়েদের ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে ভর্তি করতে উদ্গ্রীব। অর্থাৎ ইংরেজিমাধ্যম স্কুল এখন আর শুধুমাত্র  উচ্চবিত্ত শ্রেণির নয়, এখন সবাই এই দৌড়ে শামিল! জেলা শহরগুলির বহু স্কুলে ছাত্রসংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে বহু স্কুলে তালা ঝুলবে!

গ্রামের স্কুলগুলিতে যে পড়ুয়া সংখ্যা আছে, তার দশ শতাংশেরও স্কুলে উপস্থিতি নেই। যদিও এই চিত্র নতুন নয়। আলুর মরশুমে পড়ুয়ারা মাঠে যায় আলু তুলতে, কাঁচা পয়সা হাতে আসে। আবার এখন এই বর্ষার মরশুমে সবাই রোয়ার জন্য জমিতে যায়, তাই তারা স্কুলে যায় না। প্রতিটি এলাকায় স্কুলের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে কোচিং সেন্টার। এখানে বিভিন্ন ব্যাচের বিভিন্ন সময়ে ছাত্রছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক পড়ার সুযোগ রয়েছে। এমনকি স্কুল চলাকালীন সময়েও কোথাও কোথাও কোচিং সেন্টার রমরমিয়ে চলে!

২০০২ সালে আমি শালবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে যখন প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগ দিই, তখন পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল ৩৪০০। শুধুমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতেই ছয়শো ছাত্রছাত্রী ছিল। আজ এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা কমবেশি দাঁড়িয়েছে ১৪০০। ছাত্রসংখ্যা এত কমার কারণ, বেশ কিছু জুনিয়ার হাইস্কুল, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং মাধ্যমিক স্কুল উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছে। এই স্কুলগুলিও নামমাত্র ছাত্রসংখ্যা নিয়ে চলছে। হুহু করে বাড়ছে ড্রপআউটের সংখ্যা।  ‘পড়াশোনা করে চাকরি নেই’ এই প্রচারটা সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে, তাই তারা অষ্টম-নবমেই স্কুল ছেড়ে হয় কৃষিজমিতে কাজ করছে, না হয় গ্যারাজে কাজ শিখছে অথবা ভিনরাজ্যে  চলে যাচ্ছে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে।

একবার স্কুলে পড়ুয়াদের উপস্থিতি বাড়াতে কৌশল নিয়েছিলাম। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করেছিলাম ‘সোমবার টাকার ফর্ম দেওয়া হবে। যারা এদিন স্কুলে আসবে না তাদেরকে টাকার ফর্ম দেওয়া হবে না, ছাত্রছাত্রীদের বলা হচ্ছে অভিভাবককে নিয়ে স্কুলে উপস্থিত হতে।’ ওইদিন স্কুল শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের উপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের চত্বর যেন হয়ে উঠল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড! কেন এত ভিড়, বুঝতেই পারছেন, শুধুমাত্র টাকার ফর্মটা নেওয়ার জন্য! আজ মিড-ডে মিল, বই, ব্যাগ, জুতো, সাইকেল, ট্যাব, কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী দিয়েও পড়ুয়াদের স্কুলে উপস্থিতিটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না!

সবকিছু মিলিয়ে স্কুল এখন হয়ে উঠেছে ‘বিতরণ কেন্দ্র’! আবার এক অর্থে দূরশিক্ষণ কেন্দ্রও বটে, কারণ ফর্ম ফিলআপ, পরীক্ষায় বসা আর হরেক কিসিমের সরকারি উপঢৌকন পাওয়া ছাড়া আর তো স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না!

মেয়েদের নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে মুখ্যমন্ত্রী কন্যাশ্রী চালু করেছিলেন। এর আর একটা দিক ছিল নাবালিকা বিয়ে রুখে দেওয়া। সরকারি পরিসংখ্যান কী বলে জানি না, তবে নাবালিকা বিয়ের সংখ্যা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। বহু কন্যাশ্রীর স্কুলে থাকতেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

কোচবিহার শহরের একজন শিক্ষক প্রসঙ্গক্রমে বলছিলেন তাঁদের স্কুলের মাধ্যমিক উত্তীর্ণ মেধাবী ছাত্ররা অন্য স্কুলে ভর্তি হতে চলে যাচ্ছে দেখে, তাঁদের নিজের স্কুলের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি  হতে বলা হয়। এ কথা বলাতে তারা শর্ত আরোপ করেছিল ‘স্যর ভর্তি হতে পারি কিন্তু স্কুলে আসতে পারব না’! একমাত্র প্র্যাকটিকাল ক্লাস ছাড়া তারা স্কুলমুখী কিছুতেই হতে চায় না, চার-পাঁচজন শিক্ষকের কাছে টিউশন নিতেই তাদের সময় চলে যায়, এরা স্কুলে এসে সময় নষ্ট করবে কেন!

আমরা স্কুলের  চারপাশের গ্রামগুলো চিনতাম, বহু অভিভাবককে চিনতাম, তাঁদের অনেকের বাড়িতেও  গিয়েছি। তাঁরা দারুণভাবে আপ্যায়নও করতেন। একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল অভিভাবকদের সঙ্গে, পড়ুয়াদের সঙ্গে। আজ কোথায় হারিয়ে গেল সেই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক! হারিয়ে গেল অভিভাবক-শিক্ষক সম্পর্ক। একসময় স্কুলে কোনও ছাত্রছাত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে সেটাকে গর্হিত অন্যায় বলে মনে করা হত, অভিভাবককে ডেকে পাঠিয়ে, তাঁদের বলা হত, কেন সন্তানকে মোবাইল কিনে দিয়েছেন!

আজ স্যর, ম্যাডামদের পাশাপাশি ছাত্রদের হাতে হাতে ঘোরে মোবাইল ফোন। এখন স্কুলের যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় অনলাইনে। স্কুলের নোটিশ দেওয়ার প্রথার অবলুপ্তি ঘটেছে প্রায়! পরীক্ষা, ফর্ম ফিলআপ, টাকার ফর্ম সবকিছুর কথাই এখন বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দিয়ে দেওয়া হয়। নতুন আসা শিক্ষকদের নামও ঠিকমতো বলতেও পারে না পড়ুয়ারা! আগে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল প্রকাশের পর নম্বর পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ ওঠেনি, কারণ তখন খুব অভিজ্ঞ শিক্ষকরা খাতা দেখতেন। পরীক্ষকদের খাতা দেখাকে কেন্দ্র করে আজ থেকে দশ-পনেরো বছর আগেও ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা ছিল, এখন আর ওই বালাই নেই!

তখন প্রধান পরীক্ষক হতেন প্রধান শিক্ষক, কলেজের অধ্যাপক অথবা নিদেনপক্ষে দশ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষকরা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে দেড়- দু’বছর অভিজ্ঞতা হলেই নাকি প্রধান পরীক্ষক হওয়া যায়! অবশ্যই সবটা অলিখিতভাবে! যার ফলে এবার হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর নম্বর পরিবর্তন হয়েছে! আগে এমনটা হয়েছে বলে আমার জানা নেই! শুধু তাই নয়, শিক্ষা দপ্তরের জারি করা নির্দেশিকাও ঘনঘন বদল হচ্ছে! যা আমরা দেখিনি! বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ইতি ঘটেছে বহু পূর্বে! অনেক ক্ষেত্রেই অযোগ্য কিছু মানুষ স্কুল পরিচালনায় আসছে, যাদের বিদ্যালয় পরিচালনায় দূরদৃষ্টির অভাব।

এখন সরকারি বই, খাতা দেওয়া হচ্ছে পড়ুয়াদের হাতে হাতে। নতুন বইয়ের ঘ্রাণটাই আলাদা। আগে এখনকার মতো চটজলদি পাঠক্রম পরিবর্তন হত না। তাই পুরোনো বই কেনার  চল ছিল। ডিসেম্বর মাসে ফল প্রকাশের বেশ আগেই এলাকার মেধাবী ছাত্রের বই বুক করে রাখা হত, ভালো ছেলেরা বইয়ের ভালো যত্ন নেয়, নতুন বই কিনে ব্রাউন পেপার অথবা খবরের কাগজ দিয়ে বইয়ের মলাট দিয়ে রাখে। এদের কাছে বই থাকে খুব যত্নে, তাই সবাই চেষ্টা করত ওইসব ভালো ছেলেমেয়েদের বইগুলো বুক করতে। অর্ধেক দামে এই বই পাওয়া যেত। একই সঙ্গে ‘মানে বই’ অর্থাৎ অর্থ বই, ছাত্রবন্ধু এগুলোও পাওয়া যেত অর্ধেক দামে।

সে সময় টুকলি বা নকল করে ধরা পড়াটা খুব অসম্মানের ছিল। অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হত। আর এ যুগে মুষ্টিমেয় পড়ুয়া ছাড়া টোকাটাই এখন রেওয়াজে পরিণত! শুধু রেওয়াজ নয়, নকল করাটা এখন অধিকার। যে স্যর নকল ধরেন না, বা দেখেও কিছু বলেন না, সেই স্যর, ছেলেমেয়েদের কাছে ‘ভালো স্যরের’ খেতাব অর্জন করেন। আর যে স্যর এই বেয়াদবি সহ্য করেন না, তিনি ভিলেন ছাড়া আর কি হতে পারেন! এখন অবশ্য সব  স্যরই  ‘ভালো স্যরের’ খেতাব অর্জন করেছেন। পরীক্ষায় মাল্টিপল চয়েজ চালু হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। এখন ‘পরের ছেলে পরমানন্দ, যত উচ্ছন্নে যায় ততই আনন্দ’ নীতিই অনুসরণ করে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন অনেকেই!

এখন পঁচিশে বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, নেতাজির জন্ম দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস নিছক ছুটির দিনে পরিণত। গল্প, উপন্যাস পড়ার পাট চুকে গিয়েছে। এখন ধ্যানজ্ঞান শয়নে স্বপনে মোবাইল ফোন!

ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের শিক্ষা পদ্ধতি থেকে আমরা বেশ কিছুটা দূরেই ছিলাম। কোভিডকালের ভয়ানক ঝাঁকুনিতে ‘অপ্রস্তুত’ আমরা রাতারাতি ‘সাহেব’ হয়ে গেলাম! কিন্তু আদৌ কি আমরা সাহেব হতে পেরেছি? হ্যাঁ হয়েছি, তবে তা নীলবর্ণ শৃগালের মতো।

(লেখক ধূপগুড়ির বাসিন্দা। সাহিত্যিক ও শিক্ষক)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.
RELATED ARTICLES
- Advertisment -
- Advertisment -spot_img

LATEST POSTS

Gangarampur-Bhawan

Gangarampur Bhawan | প্রতিশ্রুতির ৩০ বছরেও হয়নি গঙ্গারামপুর ভবন

0
বিপ্লব হালদার, গঙ্গারামপুর: ভোটের প্রচারে প্রতিশ্রুতি ছিল, কলকাতায় গড়ে তোলা হবে গঙ্গারামপুর ভবন (Gangarampur Bhawan)। পুরভোটের পর বোর্ড গঠন হওয়া দু’বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু...

Cricket corruption | টি২০ বিশ্বকাপে ক্রিকেট দুর্নীতি! তিন সদস্যের রিভিউ কমিটি গড়ল আইসিসি

0
কলম্বো: অভিযোগ বিস্তর। আর সেই অভিযোগ নিয়ে অবশেষে চাপে পড়ে নড়েচড়ে বসল ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসি। কলম্বোয় আজই শেষ হওয়া ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার বোর্ড...

Ritika Hooda | ছেলেদের সঙ্গে অনুশীলন, অলিম্পিকে পদক জিতে বিশ্বকে নিজের জাত চেনাতে চান...

0
প্যারিস: হরিয়ানার সোনেপতে রায়পুর রেসলিং অ্যাকাডেমি খুব জনপ্রিয়। এখানে পুরুষ ও মহিলাদের আলাদাভাবে কুস্তি অনুশীলনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এখানেই একটি মেয়ে নিয়মিত পুরুষদের বিরুদ্ধে...

Imran Khan | ‘খাঁচায় রাখা জঙ্গির মতো আছি’, জেলজীবন নিয়ে বিস্ফোরক ইমরান

0
ইসলামাবাদ: জেল তো নয়, যেন মৃত্যুকুঠুরি। ৭-৮ ফুটের কক্ষ। হাঁফছাড়া যায় না। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে এমনই এক কক্ষে তাঁকে রাখা হয়েছে, সম্প্রতি এক ব্রিটিশ...

Gangarampur | সবজির দামের সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী গাঁদা, গৃহদেবতাকে পুজো দিতে হিমসিম খাচ্ছেন গৃহস্থরা

0
গঙ্গারামপুর: শুধু সবজির বাজার আগুন নয়। সবজির দামের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে গাঁদা ফুল। গঙ্গারামপুর (Gangarampur) বাজারে প্রায় ৩০০ টাকা কিলো দরে বিক্রি হচ্ছে...

Most Popular