দীপ সাহা
কলঙ্কের দাগটা শেষমেশ লেগেই গেল।


রক্তপাতহীন, হিংসাহীন, মৃত্যুহীন যে ভোটের স্বপ্ন দেখিয়েছিল প্রথম দফা, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হল দ্বিতীয় দফা শুরুর আগে। আর সেইসঙ্গে বাংলার আকাশে নতুন করে মেঘ জমল ভোট পরবর্তী হিংসারও (Post Poll Violence Threats Bengal)।
যে নির্বাচন কমিশন দু’দিন আগেই বঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভোটের কৃতিত্ব নিয়ে নিজেদের পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল, সেই পিঠেই এখন রক্তের ছিটেফোঁটা। প্রধানমন্ত্রীর শেষ নির্বাচনি সভার ঠিক আগে রবিবার জগদ্দলে বোমাবাজিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। চলে গুলিও। জখম হন সিআইএসএফ জওয়ান। মঙ্গলবার আরামবাগে তৃণমূল-বিজেপি (TMC-BJP) সংঘর্ষে আক্রান্ত হন খোদ সাংসদ মিতালি বাগ। ভাঙচুর হয় তাঁর গাড়ি। বুধবার বসিরহাটের হিঙ্গলগঞ্জে আবার দুই বিজেপি কর্মীর বাড়িতে সাদা থান, জবা ফুল পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে হুমকি বার্তা। কালো কালিতে লেখা, ‘এবার বলো হরি, হরি বোল করে দেব’। ফলতায় ঝামেলা পাকানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠছে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বিরুদ্ধে। সেখানে পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে কমিশন নিয়ে এসেছে উত্তরপ্রদেশের ‘সিংহম’ অফিসার অজয় পাল শর্মাকে। আর তার পর থেকে আরও চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এলাকায়।
আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলিকে বিক্ষিপ্ত মনে হলেও হিংসার সলতেতে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে একটু একটু করে। আর সেই আগুন ছারখার করে দিতে পারে গোটা বাংলাকে। কিন্তু কেন?
এবারের ভোট আসলে মরণবাঁচনের লড়াই। একদিকে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা। অন্যদিকে বঙ্গদখলের মরিয়া স্বপ্নে বুঁদ বিজেপির মরণকামড়। হয় এসপার, নয় ওসপার। একুশে পরিবর্তনের ডাক উঠলেও সেটা ছাব্বিশের কাছে অনেকটাই ফিকে। ফলে যে দলই এবার ক্ষমতায় বসুক না কেন, দোর্দণ্ডপ্রতাপ হয়ে উঠবেন নেতা-মন্ত্রীরা, তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই।
টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে তৃণমূলের কিছু নেতা যেমন দুর্নীতিপরায়ণ হয়েছেন, তেমনই বেড়েছে পেশিশক্তির আস্ফালন। উত্তর থেকে দক্ষিণ, সর্বত্রই এক ছবি।
দিনহাটার উদয়ন গুহর কথাই ধরা যাক। কমল গুহর পুত্র ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে তৃণমূলে আসতেই হয়ে উঠেছেন দিনহাটার বেতাজ বাদশা। তাঁর নামে নাকি বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খায়, অন্তত রাজনীতির নিন্দুকেরা তাই বলেন। একুশের ভোটে বিপুল আসন নিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর দিনহাটা সহ কোচবিহারের বহু এলাকায় বিজেপি নেতা-কর্মীরা ঘরছাড়া ছিলেন। বিজেপির বাহুবলী নেতা নিশীথ প্রামাণিকের তখন টিকিটি পাওয়া যায়নি। অগত্যা পদ্ম কর্মীদের আশ্রয় নিতে হয়েছিল অসমে। এবারও তৃণমূল যদি ক্ষমতায় থেকে যায়, পরিস্থিতি একইরকম তো বটেই আরও ভয়ংকরও হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজেপির নীচুতলার কর্মীরা।
কেন? ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির এক বিজেপি কর্মীর কথায়, ‘এখানে তো আমরা জিতে যাব। রাজ্যেও ক্ষমতায় আসার প্রবল সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দক্ষিণে ফল যদি এদিক থেকে ওদিক হয়, তাহলে বিপদ। যতই জিতি, তৃণমূল এখানে আমাদের টিকতে দেবে না।’
বিজেপি কর্মীর আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ মিলতে শুরু করেছে একটু একটু করে। কোচবিহারের সাংসদ জগদীশ বর্মা বসুনিয়া যেমন ক’দিন আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) লিখেছিলেন, ‘২৩ মে পোস্ট পোল ভায়োলেন্স-এর তারিখ শেষ হবে তারপর ডিজে বাজিয়ে বিজেপি বিসর্জন হবে’। তাঁর পোস্টের বাক্য এলোমেলো, অগোছাল হলেও হুমকিটা স্পষ্ট। অথচ এই জগদীশই একুশের ফল ঘোষণার আগে ভয়ে আত্মগোপন করেছিলেন। ফলে এবারেও ফল ওলটপালট হলে হয় তাঁকে লুকোতে হবে নয়তো তাঁর ভয়ে অন্যদের গ্রামছাড়া হতে হবে।
ময়নাগুড়ির এক তৃণমূল নেতার বৌও প্রথম দফার ভোটের আগে ফেসবুকে ভিডিও ছেড়ে হুমকি দিয়েছিলেন। তাঁর নিশানাতেও ছিলেন মূলত বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। ‘পদ্মচিহ্নে ভোট দিলে ৪ তারিখের পর দেখে নেব’ মার্কা ভিডিও ভাইরাল হতেই ঢোঁক গেলেন নেতা ও তাঁর স্ত্রী।
৪ তারিখের পর দেখে নেব কিংবা ডিজে বাজিয়ে বিজেপির বিসর্জন হবে- আপাত নিরীহ এই বাক্যবন্ধগুলোই এখন ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে তৃণমূল ও বিজেপি উভয় দলেরই কর্মী-সমর্থকদের। সেই অর্থে দল করেন না, আবার প্রকাশ্য সমর্থকও নন, এমন অনেককেই এবার ভোটের দিন দেখা গিয়েছে বিজেপির ক্যাম্পে। আরএসএস-এর কৌশল মেনে বিজেপির এই ‘সাইলেন্ট ভোটার’রাই এবার ভোট করিয়েছেন নিঃশব্দে। পাড়াপড়শিদের ডেকে ডেকে ভোট দিতে নিয়ে যাওয়া, হালকা চালে ‘বিজেপিই তো জিতবে’ মার্কা বার্তা দেওয়া, এসব করেই ভোট গেরুয়া ঝুলিতে টানার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। এই প্রচেষ্টায় সফল কি না তা তো সময় বলবে। কিন্তু বিজেপির এই ‘সাইলেন্ট’ কর্মীরা মার্ক হয়ে গিয়েছেন তৃণমূলের কাছে। ফল ওলটপালট হলেই তাঁদের হুমকির মুখে পড়তে হতে পারে বলে প্রমাদ গুনছেন।
এ তো গেল মুদ্রার এপিঠ। ওপিঠও আছে। ‘আব কি বার, ২০০ পার’ স্লোগান ফিকে হলেও বিজেপি এবার ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী। দিল্লির এক নেতা ভোটের আগেই বলছিলেন, ‘হাম কর লেঙ্গে। ইসবার কোই গলতি নেহি। য্যায়সে ভি হো, বঙ্গাল চাহিয়ে।’ এটা শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, আস্ফালনও। আর এই আস্ফালনই বুঝিয়ে দেয়, বিজেপি ক্ষমতায় এলে তৃণমূলের নেতাদেরও ঘোর বিপদ। বাংলায় ভোট প্রচারে এসে একাধিক জায়গায় নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘চুন চুনকে হিসাব হোগা’। গুন্ডারাজ খতমের কথাও শোনা গিয়েছে নমোর গলায়। মোদিিজর মুখে এমন কথা শুনে টগবগিয়ে ফুটছেন বিজেপির বহু ‘বাহুবলী’ই। তৃণমূলের মার, অত্যাচার কড়ায় গন্ডায় বুঝিয়ে দিতে তাঁরা শুধু দিন নয়, মিনিট-সেকেন্ডও গুনছেন।
বাংলার নেতা সুকান্ত মজুমদার, নিশীথ প্রামাণিক, অর্জুন সিং, হালে জেলছাড়া রাকেশ সিং-রা কম যান কীসে! তাঁদের মুখেও তো প্রায়ই শোনা যায় বদলার হুমকি। একবার রাজ্যে ক্ষমতার স্বাদ পেলে তাঁরা কি আর চুপ করে বসে থাকবেন! ভয়টা আসলে এখানেই।
বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী, সাঁজোয়া গাড়ি দিয়ে ভোট হয়েছে প্রথম দফায়। ফলে ট্যাঁ-ফোঁ করার সাহস পায়নি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা দুষ্কৃতীরা। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনী কতদিন! সেটা বেশ জানেন ক্ষমতার কেষ্টবিষ্টুরা। আর তাই সময়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁরা। পুলিশ অবশ্য ক্ষমতার দাস। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, পুলিশকে তার পক্ষ নিতেই হবে। ফলে ভোট পরবর্তী হিংসা আটকানোর সহজ কোনও পথ নেই।
কিন্তু যে পথেই হোক না কেন, হিংসাকে আটকানো দরকার। রুখে দেওয়া দরকার সমস্ত অপশক্তিকে। যেভাবে বাহিনী, কমিশনের যৌথ চেষ্টায় রাজনৈতিক দলগুলির শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নেতাদের যৌথ প্রয়াসে লাশহীন প্রথম দফার ভোট হয়েছে, ঠিক সেভাবেই আগামীর পথও তৈরি করতে হবে। তাহলেই নতুন ভোর দেখবে বাংলা। ক্ষমতার প্রত্যাবর্তন হোক বা পরিবর্তন, আমার পড়শি পড়শিই থাকবে- হতে পারে তিনি বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থক। সব দলের নীচুতলার কর্মী, সমর্থকরা যত তাড়াতাড়ি এটা বুঝবেন ততই মঙ্গল।

