শুভঙ্কর চক্রবর্তী
খাতায়-কলমে তিনি ফেরার, সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) তাঁর জামিন বাতিল করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে জারি আছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তবুও পুলিশ তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না। অথচ পুলিশের নাকের ডগায় মঙ্গলবার সকালে মাটিগাড়ার শিবমন্দির বাজারে ঘুরতে দেখা গিয়েছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের প্রধান আসামি ‘বিডিও’ প্রশান্ত বর্মনকে (Prasanta Barman)। শিবমন্দির রেললাইন লাগোয়া মাছ বাজারে দরদাম করে মাছও কিনেছেন তিনি। প্রশান্তকে প্রকাশ্যে ঘুরতে দেখে অবাক হয়ে যান ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষজন। সব জেনেও ইচ্ছে করেই প্রশান্তকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না বলেই অভিযোগ উঠেছে। নির্বিঘ্নে নির্বাচনের প্রয়োজনে সন্ধ্যা ৬টার পর বাইক নিয়ে চলাচলেও বিধিনিষেধ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন। সেই পরিস্থিতিতে প্রশান্তর মতন একজন প্রভাবশালী খুনের আসামিকে গ্রেপ্তার না করায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন কমিশনের কর্তারা। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ বা প্রশাসনের কোনও আধিকারিকই মন্তব্য করতে চাননি।


এক সঙ্গীকে নিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ শিবমন্দির বাজারে যান প্রশান্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সবজি বাজার ঘুরে মাছের দোকানে গিয়ে দরদাম করে মাছ কেনেন। তারপর হেঁটে বাজার থেকে বেরিয়ে যান। শিবমন্দির বাজারের ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই ঘটনায় বিস্মিত নন। এক ব্যবসায়ীর কথা, ‘বিডিও তো মাঝেমধ্যেই বাজারে আসেন, বাজার করেন। এটা তো নতুন ঘটনা নয়।’ যে মাছ ব্যবসায়ীর দোকানে এদিন প্রশান্তকে দেখা গিয়েছে তিনি অবশ্য ওই বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তাঁর কথা, ‘কত খদ্দেরই তো আসেন, সবাইকে চিনি না।’ সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমের দৌলতে প্রশান্তর মুখ এখন সকলেরই চেনা। অনেকেই এদিন বাজারে প্রশান্তকে দেখে চিনতে পারেন। অভ্যাসমতো প্রাতর্ভ্রমণ সেরে এদিন ব্যাগ হাতে বাজারে গিয়ে প্রশান্তকে দেখে অবাক হয়ে যান শিবমন্দিরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত এক অধ্যাপক। তাঁর কথা, ‘ওকে নিয়েই তো সবাই ফিশফাশ করছিল। এতকিছুর পরও কোন সাহসে ঘুরে বেড়াচ্ছে জানি না।’ প্রশান্তর কীর্তিকলাপ প্রকাশ্যে আসায় ভয়ে তাঁকে সমীহ করে চলেন সকলেই। এক সবজি বিক্রেতার গলায় শোনা গেল সেই আতঙ্কেরই সুর, ‘শুনেছি একজনকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনার আসামি ওই বিডিও। আমরা কিছু বললে আমাদেরও আবার তুলে নিয়ে যেতে পারে। ওসব বড় বড় লোকেদের ব্যাপারে নাক গলিয়ে লাভ নেই।’
শিবমন্দিরে প্রশান্তর দুটি বাড়ি রয়েছে। একটি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of North Bengal) ২ নম্বর গেটের উলটোদিকের গলিতে, অন্যটি মাটিগাড়া বিডিও অফিস সংলগ্ন এসপি মুখার্জি রোডে। দুটি বাড়ির কোনও একটিতেই প্রশান্ত থাকছেন বলেই ধারণা স্থানীয়দের। যদিও এদিন সকালে এসপি মুখার্জি রোডের বাড়ির সদর দরজায় তালা ঝোলানো ছিল। ২ নম্বর গেটের উলটোদিকের বাড়ির দরজায় তালা ছিল না ঠিকই, তবে ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া মেলেনি। সন্ধ্যায় এসপি মুখার্জি রোডের বাড়ি অন্ধকার থাকলেও আলো জ্বলতে দেখা গিয়েছে প্রশান্তর অন্য বাড়িতে। স্থানীয়দের দাবি থেকে এটা স্পষ্ট যে, প্রশান্ত কোথাও পালিয়ে যাননি, তিনি রাজার হালেই দিন কাটাচ্ছেন। ২ নম্বর গেটের উলটোদিকের গলির বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই জানিয়েছেন, মাঝেমধ্যেই রাতে নীলবাতি লাগানো দামি গাড়ি এসে ঢোকে প্রশান্তর বাড়িতে। তাতে কারা আসেন, কেন আসেন সেসব অবশ্য জানাতে পারেননি স্থানীয়রা। প্রশান্তর এক প্রতিবেশীর কথা, ‘বিডিও’র কুকীর্তির জন্য আমাদের বদনাম হচ্ছে। এসপি মুখার্জি রোডে বাড়ি সেকথা লজ্জায় লোককে বলতে পারি না। বললেই জানতে চায় প্রশান্তর বাড়ির পাশে বাড়ি কি না? ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ করা দরকার।’

