শুভঙ্কর চক্রবর্তী
ভোট ঘোষণার পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের অন্যরূপ দেখতে পাচ্ছে বাংলা। রাজ্যজুড়ে শয়ে-শয়ে আমলা, পুলিশের কর্তাদের বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শাস্তির খাঁড়া নেমে আসছে অনেকের ওপর। দাগি আসামি, নির্বাচনে প্রভাব খাটাতে পারেন এমন ব্যক্তিদের বেছে বেছে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। রাজ্যজুড়ে কয়েকশো নামের তালিকা তৈরি হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া আসামিদের গ্রেপ্তার করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে পুলিশ। চায়ের দোকান থেকে ড্রয়িংরুম, খবরের কাগজের প্রথম পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দা, সর্বত্র কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এক কথা, ‘কমিশন এবার বড্ড কড়া’। কিন্তু ‘কড়া’ কমিশনের রাডারে ধরা পড়ছে না রাজগঞ্জের একসময়ের বিডিও প্রশান্ত বর্মন (Prasanta Barman)। ভোটের ৪৮ ঘণ্টা বাকি, অথচ স্বর্ণ কারিগর স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ করে পিটিয়ে খুনের ঘটনার প্রধান আসামি, অত্যন্ত প্রভাবশালী প্রশান্ত দিব্যি বহালতবিয়তে আইনের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।


নির্বাচন কমিশনও কেন প্রশান্তর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে না এই প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্রই। তবে প্রশ্ন উঠলেও উত্তর মিলছে না। জেলা বা রাজ্য স্তরে কমিশনের কোনও আধিকারিকই প্রশান্তর বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ। কেউ বলছেন, ‘বিষয়টি জানা নেই’, কারও অনুরোধ, ‘চাপে আছি। ওইসব বিতর্কিত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন না।’ একধাপ এগিয়ে এক আধিকারিকের বক্তব্য, ‘এমসিসি চালু আছে। আমার নামে কোনও বক্তব্য প্রকাশ করবেন না।’ প্রশান্তর নাম শুনেই ফোন কেটে দিচ্ছেন অনেক পুলিশ আধিকারিক।
২০২৫-এর ২২ ডিসেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট প্রশান্তর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয় এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্টও তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ করে ফিরিয়ে দিয়েছে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করায় ২৬ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও। তারপর থেকেই রাজ্যের পুলিশ এবং প্রশাসনের খাতায় প্রশান্ত পলাতক। পুলিশ তাঁর টিকি ছুঁতে পারছে না। মজার এবং একইসঙ্গে আতঙ্কের বিষয় হল, যে আসামির হদিস পুলিশ পাচ্ছে না, সেই প্রশান্তকে কিন্তু ক’দিন আগেই দিব্যি নীলবাতির গাড়ি হাঁকিয়ে রাজগঞ্জের বিডিও অফিসে ঢুকতে দেখেছেন স্থানীয় মানুষজন। কার্সিয়াং পাহাড়ে, শিলিগুড়ি শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা শিবমন্দিরের বাজারেও প্রশান্তর দর্শন মিলেছে। যেন কোনও এক অদৃশ্য জাদুবলে তিনি সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যমান, কিন্তু পুলিশের চোখে একেবারে ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর প্রশান্তকে রাজগঞ্জের বিডিওর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে দায় সেরেছে রাজ্য প্রশাসন। কিন্তু রাজ্য প্রশাসনে প্রশান্তর বর্তমান অবস্থান কী, তিনি কী পদে আছেন তা কেউ বলতে পারছেন না। প্রশান্তর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে কি না তারও কোনও উত্তর মিলছে না। একজন আধিকারিক মাসের পর মাস পলাতক থাকলেও রাজ্য প্রশাসনের তরফে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। আর হয়ে থাকলেও বারবার জিজ্ঞাসা করার পরেও নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণে সেকথা এখন পর্যন্ত জানাননি প্রশাসনের কর্তারা। প্রশান্তকে সাসপেন্ড করা হয়নি। তাহলে জনগণের করের টাকায় পলাতক আসামিকে কি এখনও বেতন দেওয়া হচ্ছে? উত্তর মেলেনি সে প্রশ্নেরও। অপহরণ ও খুনে অভিযুক্ত একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী সরকারি আধিকারিক ভোটে প্রভাব খাটাবেন না, ব্যালট বা ইভিএমের বোতামে তাঁর ছায়া পড়বে না, এই গ্যারান্টি কে দেবে? গণতন্ত্রের ‘উৎসব’-এ যেখানে প্রতিটি ভোটারের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার কথা কমিশনের, সেখানে এমন একজন আসামিকে বাইরে অবাধে ঘুরতে দেওয়ায় সাধারণ ভোটারদের মনে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আইন আর তার প্রয়োগ কি তাহলে শুধু দুর্বল আর ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষের জন্যই বরাদ্দ? বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একজন খুন ও অপহরণের আসামি যখন ক্ষমতার অলিন্দে নীলবাতি জ্বালিয়ে দম্ভের সঙ্গে ঘোরেন, তখন সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
‘বিডিও প্রশান্তকে কি তাহলে কেউ গ্রেপ্তার করতে পারবে না?’ কাতর সুরে প্রশ্ন তোলেন স্বপন কামিল্যার স্ত্রী মমতা। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ২৩ এপ্রিল পশ্চিম মেদিনীপুরেও ভোট হবে। জেলার মোহনপুর থানার দিলমাটিয়া গ্রামের বুথে ভোট দেবেন খুন হওয়া স্বর্ণ কারিগরের পরিবারের সদস্যরা। তার আগে মমতার প্রশ্ন কমিশনের কর্তাদের কানে আদৌ পৌঁছাবে কি না সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ, ক্ষমতাবান প্রশান্তর জন্য রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি কমিশনের দরজাতেও বোধহয় অলিখিতভাবে লেখা আছে ‘সব খুন মাফ’।

