অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: ‘প্রিয়’ নক্ষত্রের অভাবে বন্ধ হয়েছে দুর্গাপুজো। বিশালাকার দুর্গা মন্দিরের চাঙড় ভেঙে আজ ভগ্নদশা অবস্থা। এঁটেল মাটির উঠোনে সচরাচর পা পড়ে না কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্বের। ফলে বিনা সংঘাতে উঠোনের ইতিউতি আপন মনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে দূর্বাদল।
একসময় দাশমুন্সী বাড়ির দুর্গাপুজো হয়ে উঠত রাজনৈতিক মিলনক্ষেত্র। আজ যাঁরা উত্তর দিনাজপুর (Uttar Dinajpur) জেলায় রাজ্যের শাসকদলের প্রার্থী, তাঁরাই একসময় এই দাশমুন্সী বাড়ির উঠোনে চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতেন প্রিয়দার রাজনৈতিক বাণী শোনার জন্য। কিন্তু এখন ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’, রবি ঠাকুরের লেখনিকে সার্থক রূপ দিতে আর এঁটেল মাটির উঠোনে পা রাখেন না তাঁর রাজনৈতিক শিষ্যরাও, তাঁরা এখন অন্য ফুলে ঘ্রাণ নিতে ব্যস্ত। ভোটের আবহে নিঃশব্দের আস্তরণে যেন বন্দি কালিয়াগঞ্জের শ্রীকলোনিপাড়ার প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর বাড়ি। বাড়ির বাইরের দেওয়ালে কংগ্রেস প্রার্থী গিরিধারী প্রামাণিকের উজ্জ্বল দেওয়াল লিখন যেন বাড়িটির রাজনৈতিক মান মর্যাদা ধারণ করেছে।


কিন্তু উত্তরবঙ্গের কংগ্রেসের এই আঁতুড়টি যেন রাজনৈতিকভাবে কোথাও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে প্রিয়রঞ্জনের মৃত্যুর প্রায় ৯ বছর পর। ‘শ্রী’ হারিয়েছে শ্রীকলোনি। তবে এমন পরিস্থিতিতে কালিয়াগঞ্জে কংগ্রেস প্রার্থীর একমাত্র জিয়নকাঠি প্রিয়রঞ্জন নামটিই। ভোট প্রচারের আঙিনায় প্রিয়রঞ্জনের অধরা স্বপ্ন উত্তরবঙ্গে এইমস, প্রসঙ্গ উঠলেই তিনি যেন বেঁচে ওঠেন জনমানসের হৃদয়কূলে। কালিয়াগঞ্জের কংগ্রেস নেতৃত্বের আফসোস, মৃত্যুর পর প্রিয়দার রত্নভাণ্ডার সম রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা রেখে গেলেও, প্রকৃত ধারকের অভাবে আজ তা অস্তমিত।
প্রিয়রঞ্জনের অবর্তমানে প্রিয় জায়া দীপা দাশমুন্সী বিশ্বাসের দাগ কাটার চেষ্টা করেছিলেন কালিয়াগঞ্জের জনমানসে৷ কিন্তু জেলায় প্রিয় আবেগ ধরে রাখতে প্রাক্তন সাংসদ দীপা ব্যর্থ হন অচিরেই৷ উলটে ‘পরিযায়ী নেত্রী’র তকমা জুটে যায়। ভোটের বাদ্যি বাজলে ‘ডুমুরের ফুলের’ মতো হঠাৎ নিজের জেলায় উদয় হন এআইসিসির অন্যতম সদস্যা দীপা। দু’-একটি জনসভা, গ্রাম বৈঠক, দলীয় কর্মী ও নেতৃত্বর সঙ্গে বৈঠক সারেন এবং ফের উড়ে যান দিল্লিতে। তবে প্রতিটি নির্বাচনে কালিয়াগঞ্জে নিজের ভোটকেন্দ্রে ছেলে মিছিলকে নিয়ে সাতসকালে ভোটারদের লাইনে দেখতে পাওয়া যায় তাঁকে। ব্যাস, ওইটুকুই।
ভোটের ডঙ্কা বেজেছে। যে কোনও সময়ে কালিয়াগঞ্জের বাড়িতে আসতে পারেন দীপা৷ এক সময়ের একান্নবর্তী দাশমুন্সী বাড়ি আজ কেয়ারটেকারের তত্ত্বাবধানে। দীপা আসতে পারেন বুঝতে পেরে তাই প্রতিদিনই অল্প অল্প করে বাড়ির জঙ্গল পরিষ্কার করছেন বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সঞ্জিত সিং। কবে বাড়িতে আসবেন দীপা দাশমুন্সী? প্রশ্ন শেষ হতেই সঞ্জিতের উত্তর, ‘সামান্য আদার ব্যবসায়ী হয়ে জাহাজের খবর আমি রাখি না বাবু।’ বোঝা গেল, নদীতে জল না থাকলেও বালুতে আজও স্রোতের দাগ স্পষ্ট।
কালিয়াগঞ্জ ব্লক কংগ্রেস সভাপতি সুজিত দত্ত বলছেন, ‘বৌদি কেরলে ভোটের দায়িত্বে রয়েছেন। খুব শীগ্রই কালিয়াগঞ্জে ভোট প্রচারে আসবেন৷ জেলাজুড়ে প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে নামবেন৷ বিশেষ করে উত্তর দিনাজপুরের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয়দার কথা ছাড়া রাজনৈতিক বক্তব্য কখনও সম্পন্ন হয় না।’

