সুখের খোঁজ

শেষ আপডেট:

কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী মান্না দে গেয়েছিলেন, ‘সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না।’ চূড়ান্ত শক্তিধর কিংবা চরম দুর্দশাগ্রস্ত যাই হোক না কেন, যে কোনও সরকার চায় দেশের নাগরিকরা যেন সুখেশান্তিতে থাকেন। সেই সুখ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রনেতারা নানা পরিকল্পনা করেন। তারপরও সবার ভাগ্যে সুখ সয় না। ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ইনডেক্স বা বিশ্ব সুখ সূচকে তা স্পষ্ট।

এবারের সূচকেও বিশ্বের সবথেকে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড। এই নিয়ে পরপর ৮ বার এই নর্ডিক দেশটি বিশ্ব সুখ সূচকের শীর্ষস্থানে থাকল। তার পড়শি ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইডেন প্রথম পাঁচে ঠাঁই পেয়েছে। ১৪৭টি দেশের মধ্যে ভারত ১১৮ নম্বরে। গতবছর ছিল ১২৬ নম্বরে। অর্থাৎ সুখের সন্ধানে খানিকটা হলেও এগিয়েছে ভারত। যদিও ভারতের তুলনায় সুখের নিরিখে এগিয়ে নেপাল (৯২) ও পাকিস্তান (১০৯)।

সুখের খোঁজ একেবারে অধরা শ্রীলঙ্কা (১৩৩) ও বাংলাদেশের (১৩৪)। চরম অসুখী দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তালিবান শাসিত আফগানিস্তান। সুখ জিনিসটা বড় অদ্ভুত। চাইলেই যে পাওয়া সম্ভব নয়, সেটা এই তালিকায় চোখ বোলালে বোঝা যায়। প্রচুর ধনসম্পত্তি এবং সামরিক শক্তির অধিকারী হলেও যে সুখ নিশ্চিত নয়, সেটা তালিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে স্পষ্ট। সুখ সূচকে প্রথম কুড়িটি রাষ্ট্রের মধ্যেও ট্রাম্পের দেশ ঠাঁই পায়নি। এই প্রথম আমেরিকার ঠাঁই ২৪ নম্বরে।

বরং আমেরিকার ঠিক ওপরে একদা বিশ্বের বিরাট অংশে ছড়ি ঘোরানো গ্রেট ব্রিটেন। যদিও ২০১৭ সালের পর এই প্রথম সূচকে এতটা নীচে নেমেছে ব্রিটেন। সামাজিক সহায়তা, ব্যক্তিপিছু জিডিপি, গড় আয়ু, স্বাধীনতা, উদারতা এবং দুর্নীতি- এই ৬টি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে বিশ্ব সুখ সূচক। ভারত সামাজিক সহায়তা সূচকে অন্যবারের তুলনায় এবার ভালো করলেও স্বাধীনতা সূচকে অনেক দুর্বল বলে এরকম পিছিয়ে থাকছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলির তুলনায় ভারত অন্য অনেক বিষয়ে এগিয়ে থাকলেও ভারতবাসীর কপালে সুখ সূচক খুব বেশি উঠছে না। এর অন্যতম প্রধান কারণ, ভারতে সামাজিক কাঠামোগত বৈষম্যের বৃদ্ধি। ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের অধিকারও ক্রমশ নিম্নগামী। একই ছবি আমেরিকাতেও। সেখানে সুখ ক্রমশ ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ বিত্তবৈভবের প্রাচুর্য ও সামরিক শক্তি, কোনওটিই কম নয় মার্কিন মুলুকে। তারপরও মার্কিন নাগরিকদের ছেঁকে ধরছে হতাশা ও একাকিত্ব।

অথচ ইউক্রেন বা প্যালেস্তাইনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আমেরিকার তুলনায় অনেক সুখী। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেনের মতো নর্ডিক দেশগুলিতে জীবনধারণের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সুখে থাকার চাবিকাঠি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে অনেক আগেই নাম লিখিয়েছে। ফলে ধীরেসুস্থে, হেলেদুলে জীবনযাপনের সময় আর নেই। তাতে ছোট ছোট অনুভূতিগুলি ভারতীয়দের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

রুজিরুটির জন্য লড়াই মানুষের জীবনে আগেও ছিল, এখনও আছে, আগামীদিনেও থাকবে। কিন্তু ভারতীয়রা যে অসুস্থ দৌড়ে আছেন, তাতে জীবন থেকে সুখ-শান্তি দুটোই উধাও। প্রচুর টাকা উপার্জন করলেও সুখ-শান্তি অধরা থেকে যাচ্ছে। জীবন যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে ভারতীয়দের কাছে ছোট ছোট সুখানুভূতিগুলি হারিয়ে যাচ্ছে।

সময় বদলাচ্ছে। তাই তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলা নিশ্চয়ই বুদ্ধিমানের কাজ। একদম ঠিক কথা। কিন্তু সেজন্য নিজেদের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়াগুলিকে হেলায় উড়িয়ে দেওয়া মোটেই উচিত নয়। সবথেকে বড় কথা, যে দেশগুলি সবথেকে সুখী দেশের তালিকায় রয়েছে, সেখানে আর্থিক বৈষম্য নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, যে দেশগুলি তালিকার পিছনের দিকে, সেই দেশগুলিতে আর্থিক বৈষম্য প্রবল। তাই বছরের পর বছর ফিনল্যান্ড সবথেকে সুখী দেশের তকমা পায় আর ভারত পিছনের সারিতে পড়ে থাকে।

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

More like this
Related

গভীর অন্ধকার

ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কিত ঘটনা হিসেবে...

আগে চাই চাকরি

নগদ নারায়ণ পাইয়ে দেওয়া। সরকারি ডোল। যা একসময় নরেন্দ্র...

কংগ্রেসে সমস্যা

গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও কংগ্রেস কার্যত সমার্থক। স্বাধীনতা অর্জনের আগে থেকে...

সঙ্গী চাই!

ভাগ্যের পরিহাস। ইতিহাসের পরিহাসও বটে। নতুন সঙ্গী খুঁজতে হচ্ছে...