রাভা সংস্কৃতি ও রন্তুকপুজোর ঐতিহ্য

শেষ আপডেট:

মনোমিতা চক্রবর্তী

উত্তরবঙ্গের আদিম ও বৈচিত্র্যময় জনজাতিগুলির মধ্যে রাভারা অন্যতম। মূলত অসম, মেঘালয় এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলায় এঁদের মূল জনবসতি। রাভাদের স্বতন্ত্র মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নিজস্ব ভাষা ও কৃষ্টির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হল ‘রন্তুকপুজো’। এটি মূলত রাভা পরিবারগুলির প্রধান গৃহদেবীর পুজো। এখানে কোনও পাথুরে বিগ্রহ বা মাটির মূর্তির আরাধনা করা হয় না, বরং প্রকৃতি ও তত্ত্বে বিশ্বাসী রাভারা চিরকালই বিশ্বাসী নিরাকার উপাসনায়। তাঁদের মূল উপাস্য যোগমায়া এবং মহাকাল। প্রতিটি রাভা গৃহেই এই পুজো হয়ে থাকে।

চালের পাতিল ও শাস্ত্রীয় আচার

একটি চালভর্তি মাটির পাতিলকে কেন্দ্র করেই সমস্ত শাস্ত্রীয় বিধি আবর্তিত হয়। পাতিলের গায়ে যাত্রাশী পাতা, জবা ফুল ও সলতের মালা জড়িয়ে তিনটি সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া হয়। উপরে বসানো থাকে সিঁদুরমাখানো একটি আস্ত মুরগির ডিম। চালভর্তি এই সুসজ্জিত পাতিলটিই রাভাদের কাছে ‘দেবী রন্তুক’ বা যোগমায়ার প্রতিভূ। আলিপুরদুয়ার জেলার কামাখ্যাগুড়ির প্রবীণ ‘দেওসী’ (রাভা পুরোহিত) ঝুলোমণি রাভার মতে, এই পুজোয় কোনও বাহ্যিক জৌলুস বা মূর্তির প্রয়োজন হয় না, অকৃত্রিম ভক্তি ও ঐতিহ্যের সাজেই দেবী এখানে জীবন্ত। অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করা হয় ফলমূল, মিষ্টি এবং বাধ্যতামূলকভাবে ‘নিজ হাতে বানানো সুরা’। লোকবিশ্বাস বলে, সুরা অর্পণ না করলে দেবী অসন্তুষ্ট হন এবং সংসারের অমঙ্গল ঘটে।

লোকবাদ্য ও বলিদান প্রথা

সারাবছর ঘরে ঘরে নিত্যপুজো হলেও গ্রামের কারও বিয়ে বা বড় কোনও সামাজিক অনুষ্ঠান হলে রন্তুকপুজো বিশাল গণউৎসবে রূপ নেয়। তখন মুরগি, শুয়োর বলি দেওয়া রীতি রয়েছে। একদিকে চলতে থাকে মন্ত্রোচ্চারণ, অন্যদিকে রাভারা তাঁদের নিজস্ব প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র— দামসি, কালবাঁশি (গোরুর শিং দিয়ে তৈরি), গাংকক বা ডিংডং বাজিয়ে সারারাত নাচ-গানে মেতে ওঠেন। পুজো চলাকালীন দেওসী আবেগভরে উচ্চারণ করেন : ‘উ আমায় জোগো ঋষি / আমায় তাঙ্গাম আওয়া / তাঙ্গাম সেই আমায় জোগো / তেপায় দিনায় চকত মুছি / চকত আভং লাওয়া আমায় / চকত আভং লাওয়া।’ অর্থাৎ, ‘হে জগৎ ঋষি, আমায় শক্তি দাও, আমায় জাগ্রত করো। তোমার চরণে মাথা নোয়াই, আমাদের ভক্তিপূর্ণ অর্ঘ্য তুমি গ্রহণ করো।’

আধুনিকতার গ্রাস ও অস্তিত্বের লড়াই

রন্তুকপুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি রাভা সম্প্রদায়ের নাচ, গান, ভাষা ও পোশাকের এক সম্মিলিত প্রদর্শনী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খ্রিস্টান ধর্মের প্রভাব এবং আধুনিক জীবনযাত্রার অভিঘাতে এই শাশ্বত ঐতিহ্য আজ ফিকে হতে বসেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে কালবাঁশির মতো দুর্লভ বাদ্যযন্ত্রের সুর। নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজস্ব ঐতিহ্য শেখার অনীহা দেখে আক্ষেপ ঝরে পড়ে অভিজ্ঞ ঝুলোমণি রাভার কণ্ঠে। রাভাদের একদিকে যেমন পরিচয় হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে নিজস্ব শিকড়কে আঁকড়ে ধরার আপ্রাণ লড়াই। এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতি রক্ষা করাই এখন রাভা সমাজের উত্তরসূরিদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

(লেখক শিক্ষক ও অক্ষরকর্মী। জলপাইগুড়ির বাসিন্দা।)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

খাতা-ভাতার গোলকধাঁধায় বন্দি বাংলার শিক্ষা

সনাতন পাল আজকের দিনে আমাদের দেশে এবং বিশেষ করে এই...

নেপালের শিক্ষাবিপ্লব : ভারতের সামনে নতুন দিগন্ত

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী হিমালয়ের কোলে আজ এক নিঃশব্দ কিন্তু প্রলয়ংকরী...

নিরপেক্ষতার প্রতীক এক সাহসী প্রশাসক

ভোটারদের অধিকার সুরক্ষায় এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রথম নির্বাচন...

হে নূতন দেখা দিল আলোক-লগনে

বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ বহু অমৃতের সন্ধান দিল। মৌলবাদীদের সক্রিয়তার...