নীহারিকা সরকার
আমাদের তথাকথিত ‘মূলস্রোতের’ ভারতীয়দের একটা অদ্ভুত এবং দুরারোগ্য অসুখ আছে। আমরা মুখে ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ বা ‘অখণ্ড ভারত’-এর বড়াই করি, জাতীয় সংহতি দিবসে বড় বড় গালভরা ভাষণ দিই, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমাদের দৈনন্দিন মানসিকতা চরম মাত্রায় বর্ণবিদ্বেষী। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পাহাড় থেকে আসা মানুষদের প্রতি আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, তা এক কথায় লজ্জাজনক। প্রাত্যহিক আড্ডার পরিসর হোক বা শহুরে অভিজাতদের বৈঠকখানা— সব জায়গাতেই এই দেশেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশের মানুষদের নিয়ে যে ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য অনায়াসে উড়ে বেড়ায়, তা শুনলে যে কোনও সভ্যসমাজের মাথা হেঁট হয়ে যাওয়ার কথা। গায়ের রং একটু ফর্সা, নাক খাঁদা আর চোখের গড়ন একটু আলাদা হলেই আমাদের জিভের ডগায় অবলীলায় চলে আসে ‘চিংকি’, ‘মোমো’, ‘চিনা’, ‘চাউমিন’ বা ‘বাহাদুর’-এর মতো চরম অপমানজনক শব্দবন্ধ। আমরা ভুলে যাই, এই শব্দগুলো নিছক কোনও রসিকতা নয়, এগুলো এক-একটা বিষাক্ত তির, যা আমাদেরই দেশের নাগরিকদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়— ‘তোমরা আমাদের কেউ নও।’
পাহাড় বা উত্তর-পূর্বের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের মনে যুগ যুগ ধরে কিছু অত্যন্ত নোংরা এবং ভিত্তিহীন স্টিরিওটাইপ গেঁথে আছে। এই অঞ্চলের কোনও অল্পবয়সি ছেলেকে দেখলেই মূলস্রোতের ভারতীয়দের একটা বড় অংশ অবচেতনভাবেই ধরে নেয় যে, ছেলেটি নির্ঘাত ড্রাগস অ্যাডিক্ট বা নেশাগ্রস্ত। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও ভয়ংকর, আরও কদর্য। উত্তর-পূর্বের মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তাঁদের আধুনিক জীবনযাত্রা এবং খোলামেলা স্বভাবকে আমরা আমাদের বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দিয়ে বিচার করি। আমাদের সমাজের একটা বড় অংশের ধারণা, ওই অঞ্চলের মেয়েরা ‘সহজলভ্য’। তাঁদের সঙ্গে সহজে যে কোনও ধরনের আপত্তিকর কথা বলা যায় বা তাঁদের গায়ে হাত দেওয়া যায়। তাঁদের আধুনিকতাকে আমরা অবলীলায় ‘চরিত্রহীনতা’ বলে দেগে দিই। ফলস্বরূপ, ভারতের বিভিন্ন মেট্রো শহরে পড়তে বা কাজ করতে আসা উত্তর-পূর্বের মেয়েদের প্রতিনিয়ত চরম যৌন হেনস্তা, কটূক্তি এবং অশালীন ইঙ্গিতের শিকার হতে হয়। রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে বা কর্মক্ষেত্রে তাঁদের দিকে ধেয়ে আসে লোলুপ দৃষ্টি। ভাড়াবাড়ির মালিক থেকে শুরু করে পাড়ার মুদি দোকানি— অনেকেই তাঁদের দিকে এমনভাবে তাকান যেন তাঁরা অন্য কোনও গ্রহের প্রাণী, যাঁদের আত্মমর্যাদা বলে কিছু থাকতে নেই।
অথচ বাস্তবের মাটিতে চোখ রাখলে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। আজ ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম— সর্বত্র স্বাস্থ্য পরিষেবা, হসপিটালিটি, রূপচর্চা থেকে শুরু করে বিমান পরিবহণ শিল্পে কান পাতলে উত্তর-পূর্বের এই ছেলেমেয়েদের নিঃশব্দ, অক্লান্ত পরিশ্রমের গল্প শোনা যাবে। আপনি দেশের যে কোনও নামীদামি হাসপাতালে যান, দেখবেন রোগীদের সেবায় দিনরাত এক করে দিচ্ছেন ওই অঞ্চলেরই নার্সরা। অত্যন্ত হাসিমুখে, চরম পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাঁরা এমনভাবে মুমূর্ষু রোগীর সেবা করেন, যা সত্যিই বিরল। ফাইভ স্টার হোটেলের রিসেপশন হোক বা বিমানের কেবিন ক্রু— তাঁদের ভদ্রতা, সততা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা আজ গোটা দেশের সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় ভরসা। যে মেয়েটিকে দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন বখাটে ছেলে নোংরা মন্তব্য ছুড়ে দেয়, সেই মেয়েটিই হয়তো কোনও হাসপাতালে আপনারই অসুস্থ আত্মীয়ের মুখে পরম মমতায় জল তুলে দিচ্ছেন, রাত জেগে তাঁর শুশ্রূষা করছেন। আমরা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তাঁদের দেওয়া পরিষেবাটুকু কড়ায় গন্ডায় ভোগ করি, কিন্তু তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে আমাদের যত অনীহা। তাঁদের আলাদা খাদ্যাভ্যাস, আলাদা পোশাক বা আলাদা সংস্কৃতি থাকতে পারে, সেটাই তো ভারতের আসল সৌন্দর্য। কিন্তু সেই ভিন্নতার অজুহাতে তাঁদের প্রতিনিয়ত হেনস্তা করাটা কোনও যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।
সাম্প্রতিক অতীতের দিকে তাকালে আমাদের এই ভণ্ডামির একাধিক জ্বলন্ত উদাহরণ চোখে পড়বে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, কোভিড অতিমারির শুরুতে যখন গোটা দেশ আতঙ্কে কাঁপছে, তখন এই উত্তর-পূর্বের নাগরিকদের রাস্তায় দেখে আমাদেরই মূলস্রোতের ‘শিক্ষিত’ মানুষজন তাঁদের গায়ে থুতু ছিটিয়েছে, তাঁদের ‘করোনা’ বলে দেগে দিয়েছে। ভাবখানা এমন, যেন ভাইরাসের জন্ম ওঁরাই দিয়েছেন! রাজধানী দিল্লির বুকে নিডো তানিয়ার মতো এক তরুণ ছাত্রকে শুধুমাত্র তাঁর চেহারার গড়নের জন্য প্রকাশ্য রাস্তায় পিটিয়ে মারার ঘটনা আজও দেশের বর্ণবিদ্বেষের ইতিহাসে এক দগদগে ক্ষতের মতো রয়ে গিয়েছে। বেঙ্গালুরু, পুনে বা চেন্নাইয়ের মতো আইটি হাবগুলোতে বারবার উত্তর-পূর্বের ছাত্রছাত্রী ও কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাড়িভাড়া নিতে গেলে তাঁদের হাজারো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, যেন তাঁরা এই দেশের নাগরিক নন, কোনও অনুপ্রবেশকারী। পুলিশ প্রশাসনের কাছে গিয়েও যে তাঁরা খুব একটা সুবিচার পান, এমনটাও নয়। সেখানেও তাঁদের দিকেই সন্দেহের তির ছুড়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এগুলো আমাদের মজ্জায় মিশে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক বর্ণবিদ্বেষের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ।
আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়শই খুব বিজ্ঞের মতো আলোচনা করি— উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে এত বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব কেন? কেন সেখানকার মানুষজন কথায় কথায় ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হতে চান? কিন্তু আমরা একবারও নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করি না যে, এই বিচ্ছিন্নতাবাদের বীজটা আসলে কারা বুনছে? আমরা যদি দেশের এক বিশাল অংশের মানুষকে প্রতিনিয়ত বুঝিয়ে দিই যে তাঁরা ‘বহিরাগত’, যদি তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে আমরা অসম্মান করি, তাঁদের মেয়েদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাই, আর তাঁদের ছেলেদের অপরাধী সাব্যস্ত করি, তবে কোন জাদুবলে তাঁরা আমাদের আপন করে নেবেন? নিজের দেশের মাটিতে, নিজের দেশের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে যদি কোনও তরুণীকে বারবার তাঁর জাতীয়তা প্রমাণ করতে হয়, তবে তাঁর মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে কীভাবে? মূলস্রোতের ভারতীয় হিসেবে আমরা যতদিন না তাঁদের আমাদের সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছি, ততদিন আমাদের কোনও নৈতিক অধিকার নেই তাঁদের বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে সমালোচনা করার। দেশপ্রেম কোনও একতরফা চুক্তি নয়। আপনি কাউকে দিনের পর দিন নিজভূমে পরবাসী করে রাখবেন, আর তাঁর কাছ থেকে অন্ধ দেশপ্রেম আশা করবেন— এই চরম দ্বিচারিতা আর চলতে পারে না।
সময় এসেছে এই বিষাক্ত মানসিকতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার। পরিবর্তনটা কোনও সরকারি আইন বা পুলিশের লাঠি দিয়ে হবে না, পরিবর্তনটা আনতে হবে আমাদের নিজেদের মগজে। আমাদের বুঝতে হবে যে, ভারতের মানচিত্রটা শুধু গঙ্গা-যমুনা বা বিন্ধ্য পর্বতেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্রহ্মপুত্র বা তিস্তার পাড়ে থাকা মানুষগুলোরও এই দেশের ওপর ঠিক ততটাই অধিকার আছে, যতটা অধিকার একজন বাঙালি, মারাঠি বা পঞ্জাবির আছে। উত্তর-পূর্বের মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলানোর দরকার নেই, দরকার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বদল। তাঁদের চোখের গড়ন নিয়ে ব্যঙ্গ করার আগে আমাদের নিজেদের মনের অন্ধত্ব ঘোচানো জরুরি। বৈচিত্র্যকে শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আটকে না রেখে, তাকে উদযাপনের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যতদিন না আমরা একজন উত্তর-পূর্বের নাগরিককে দেখে অবচেতনভাবেই তাঁকে ‘অন্য কেউ’ ভাবা বন্ধ করছি, ততদিন আমাদের ‘মহান ভারতীয়’ হওয়ার গর্ব স্রেফ একটা ফাঁকা আওয়াজ হয়েই থেকে যাবে।
(লেখক সমাজতত্ত্ববিদ)



