রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

নীরব কেন মোদি

শেষ আপডেট:

তৃণমূল বাদে বাকি বিরোধীরা যখন লোকসভার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে উদ্গ্রীব, তখন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধির সাংসদ পদ খারিজ করানোর জন্য তৎপর বিজেপি। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে ভারতমাতাকে বিক্রি করে দিয়েছে বলে ভারত সরকারের সমালোচনা করায় রাহুলকে এই শাস্তি দেওয়ার উদ্যোগ।

রাহুলের অভিযোগ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের কাছে নতজানু হয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই অভিযোগ অবশ্য করেছেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, এই চুক্তিতে মার্কিন কৃষকরা লাভবান হবেন, ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ভারতীয় চাষিরা। এই অভিযোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট কোনও বক্তব্য জানা নেই।

বস্তুত দ্বিতীয় এনডিএ জমানায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ সম্পর্কেই মুখ খুলতে দেখা যায়নি মোদিকে। শুরু থেকে সাংবাদিককুলকে এড়িয়ে চলেন তিনি।‌ দেশের প্রধানমন্ত্রী কখনও সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন না। সংসদে ভাষণ দিলে মূল প্রসঙ্গে যত না বলেন, তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন নেহরু-গান্ধি পরিবারের সমালোচনায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে ভারতের প্রতি ট্রাম্পের বারবার ‘অসৌজন্যমূলক’ পদক্ষেপ সত্ত্বেও মোদি সমস্ত ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছেন।

এই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কাছে মাথা নত করার অভিযোগ তুলেছেন রাহুল। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সংঘর্ষ বিরতি তাঁর মধ্যস্থতায় হয়েছে বলে এখনও মাঝেমধ্যে দাবি করেন ট্রাম্প।‌ মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই ‘কৃতিত্ব’ দাবি করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের আশায় ছিলেন। পুরস্কারটি তাঁর জোটেনি ঠিকই, তবে ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ বিরতি নিয়ে বহু পরে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান।

একইরকম রহস্য ঘনীভূত হয়েছে ভারত-মার্কিন অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে।‌ বিরোধীদের অভিযোগ, বাণিজ্য চুক্তির দরুন পথে বসতে চলেছেন ভারতের কৃষকরা।‌ কারণ, মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য এই চুক্তিতে ভারতের দরজা হাট করে খুলে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা সহ বিভিন্ন কারণে আমেরিকা প্রথমে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক চাপিয়েছিল। পরে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।‌ কিন্তু সংশোধিত চুক্তিতে খাদ্যশস্য ও ডাল নেই।

রাহুলের বক্তব্য, গত বছর পর্যন্ত ভারতের ওপর যেখানে শুল্ক হার ছিল ৩ শতাংশ, সেখানে সেই হার ৬ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ শতাংশে। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয়, বেশকিছু কাল ধরে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক কোনও বোঝাপড়া বা চুক্তির খবর প্রথম ঘোষণা হচ্ছে ওয়াশিংটন থেকে। ভারত-পাক সংঘর্ষ বিরতির খবরও সর্বপ্রথম ঘোষণা করেছিল আমেরিকাই।‌

রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার খবরও প্রথম ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। কেন্দ্রীয় সরকার নীরবই ছিল।‌ অন্তর্বর্তী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে সেই একই মার্কিন দাদাগিরির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।‌ ভারতের জনগণের মনে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, আমেরিকা এত অসম্মান করলেও ভৌগোলিক আয়তন এবং জনসংখ্যা- দুটি দিক থেকেই ভারতের মতো বিশাল দেশের প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্বিকার, নীরব ভূমিকা কেন?

গ্রিনল্যান্ডের মতো ছোট্ট দেশও মহাশক্তিধর আমেরিকার অন্যায় আবদার, দাদাগিরির প্রতিবাদে সোচ্চার। অথচ আজ পর্যন্ত কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চটজলদি প্রত্যুত্তর কিংবা অন্য কোনও প্রতিক্রিয়া দেশবাসী পাননি। জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধি, মোরারজি দেশাই, বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, এইচডি দেবেগৌড়া, মনমোহন সিং, এমনকি অটলবিহারী বাজপেয়ীও এমন নীরব, নির্বিকার ভূমিকা নিতেন না কখনও।

দেশবাসী কিন্তু বিতর্কিত সব বিষয়ে সরাসরি নরেন্দ্র মোদির মুখ থেকে তাঁর মতামত, বক্তব্য জানতে আগ্রহী। কৃষক হোক বা ছোট ব্যবসায়ী, সকলের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব তো প্রধানমন্ত্রীরই। তিনি নির্বিকার থাকলে তাঁদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে কীভাবে?

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

সর্বগ্রাসী নীতি

বিহারের রাজনীতিতে (Bihar Politics) গত দুই দশকের সমীকরণ এক...

জনতার আদালতে

সুপ্রিম কোর্টে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) (SIR)...

মুখেই শান্তির বাণী

হিংসা বনাম শান্তির মধ্যে কখনও ভোটাভুটি হলে শান্তির জয়...

অশান্তির পৃথিবী

জীবন যেন প্রযুক্তির দাস। মানুষ খুন করতে এখন আর...