রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬

রংতুলিতে ভারতীয় শিল্পের চিরবসন্ত

শেষ আপডেট:

পঙ্কজকুমার ঝা

ভারতীয় সংস্কৃতিতে বসন্ত কেবল ঋতুরাজ নয়, বরং প্রেম ও শিল্পের ঋতু। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এই সময়ে মানুষের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা আমাদের মনকে সৃজনশীল ও সংবেদনশীল করে তোলে। এই উৎসবের আবহে মনে পড়ে যায় সেই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী রাজা রবি বর্মার (Raja Ravi Varma) কথা। ১৮৯৬ সাল নাগাদ তাঁর আঁকা দেবী সরস্বতীর সেই অসামান্য চিত্রটিই আজ আমাদের প্রতিটি ঘর ও বিদ্যালয়ের আরাধনার মূল প্রেরণা।

কিলিমানুর থেকে বিশ্বজয়

১৮৪৮ সালের ২৯ এপ্রিল কেরলের কিলিমানুর রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাজা রবি বর্মা। শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির আবহে বড় হওয়া রবি বর্মার আঁকার হাত সকলকে চমকে দিয়েছিল। রাজপরিবারের অনুরাগী পরিবেশে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটে দ্রুত। প্রথমে দেশীয় রীতির পাঠ নিলেও পরে তিনি ইউরোপীয় বাস্তবধর্মী চিত্রকলার নিপুণ কৌশল আয়ত্ত করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হল ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যের প্রাচীন কাহিনীগুলোকে পাশ্চাত্য ঘরানার তেলরঙের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা। আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম কারুকার্য আর মানবদেহের নিখুঁত গঠন তাঁর সৃষ্টিকে দেবত্বের পাশাপাশি এক অনন্য মানবিক পূর্ণতা দান করেছিল।

মহাকাব্যের চরিত্র ও অনন্য সৃষ্টি

রবি বর্মার তুলিতে রামায়ণ ও মহাভারতের চরিত্রগুলো কেবল পৌরাণিক থাকেনি, বরং রক্ত-মাংসের আবেগপ্রবণ মানুষ হিসেবে ধরা দিয়েছে। তাঁর আঁকা ‘শকুন্তলা’র দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকা প্রেম ও সংকোচ আজও দর্শককে মুগ্ধ করে। ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’ চিত্রে তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা আর ‘সীতার বনবাসে’র করুণ আর্তি নারীজীবনের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে রয়েছে। একইভাবে ‘নল ও দময়ন্তী’ কিংবা ‘হংসদূত’ ছবিতে প্রকৃতি ও রোমান্টিকতার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তিনি। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর যে শান্ত ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত রূপ তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভারতীয় শিল্প ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী মানদণ্ড তৈরি করে দিয়েছে।

শিল্পকে সাধারণের দ্বারে পৌঁছে দেওয়া

রাজা রবি বর্মা কেবল উঁচু স্তরের শিল্প সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি চেয়েছিলেন শিল্পকে সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে পৌঁছে দিতে। এই মহৎ উদ্দেশ্যেই তিনি লিথোগ্রাফিক প্রেস স্থাপন করেন এবং নিজের আঁকা ছবির সাশ্রয়ী ছাপা সংস্করণ তৈরি শুরু করেন। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রথমবার নিজেদের ঠাকুরঘরে দেব-দেবীর নান্দনিক চিত্র রাখার সুযোগ পায়। ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে এটি ছিল এক বিপ্লব। তাঁর এই অভূতপূর্ব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯০৪ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯০৬ সালে মহাপ্রয়াণের আগে পর্যন্ত তিনি ভারতীয় চিত্রকলার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গিয়েছিলেন।

অমর শিল্পীর শাশ্বত উত্তরাধিকার

আজকের দিনে আমরা যখন বিদ্যালয়ে বা ঘরে দেবীর বীণাপাণি রূপের সামনে মাথা নত করি, তখন অজান্তেই শ্রদ্ধা জানাই রাজা রবি বর্মার শিল্পীসত্তাকে। তিনি রঙের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি, জ্ঞান ও সৌন্দর্যকে নথিবদ্ধ করে গিয়েছেন। বসন্ত ঋতু যেমন প্রতি বছর মানুষের মনে নতুন প্রাণের জোয়ার আনে, রবি বর্মার কালজয়ী চিত্রকর্মগুলোও তেমনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমাদের সৌন্দর্যবোধকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তিনি ছিলেন ভারতীয় শিল্পের এক অপরাজেয় বসন্ত, যাঁর সৃজনের রং সময়ের প্রলেপে কখনও ফিকে হওয়ার নয়।

(লেখক শিক্ষক। শিলিগুড়ির বাসিন্দা।)

Uttarbanga Sambad
Uttarbanga Sambadhttps://uttarbangasambad.com/
Uttarbanga Sambad was started on 19 May 1980 in a small letterpress in Siliguri. Due to its huge popularity, in 1981 web offset press was installed. Computerized typesetting was introduced in the year 1985.

Share post:

Popular

More like this
Related

অমানবিকতার ভিড়েও মানবিকতার আশা

অজিত ঘোষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, মানবতার (Humanity) সেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম...

ধর্ম, সত্য-অসত্য ও সোশ্যাল মিডিয়া!

রূপায়ণ ভট্টাচার্য এই বাংলা আর ওই বাংলা একটা জায়গায় এসে...

মসনদের লক্ষ্যে নিঃশব্দে এগোচ্ছেন অভিষেক

(২০২৬-এর আগে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার রাশ নিঃশব্দে হাতবদল হচ্ছে,...

যন্ত্রের জয়জয়কারে ফিকে অকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি?

(কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি মানুষের সৃজনশীল মেধা ও সংবেদনশীলতার বিকল্প...